তার আদর্শ বেঁচে থাকবে অনন্তকাল

তার আদর্শ বেঁচে থাকবে  অনন্তকাল

মাশরাফী হিরো : তার নামের পূর্বে বিশেষ কোনো বিশেষণ ব্যবহৃত হত না। কখনও জননেতা, কখনও আলহাজ্ব, কখনও বীর মুক্তিযোদ্ধা এসব বিশেষণেই তাকে বিশেষায়িত করা হত। বগুড়ার প্রতিকূল রাজনীতির কারণে তিনি কখনও জনপ্রতিনিধি হতে পারেননি। ৭৫ পরবর্তী সময়ে যখন আওয়ামী লীগ করা মানেই ছিল পাপ তখন তিনি শক্ত হাতে হাল ধরে ছিলেন। নৌকার সেই দক্ষ মাঝি শুধুমাত্র করতোয়ার মত নদীই পাড়ি দেননি বরং খর¯্রােতা যমুনাতেও পাড়ি দিতে হয়েছে অসংখ্য পথ। সাধারণ এক মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। পিতার পরিচয় তার রাজনীতিতে কখনও কাজে আসেনি। নিজের যোগ্যতায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। করতোয়া বিধৌত শাখারিয়ার কদিমপাড়ায় তার জন্ম। তিনি বলতেন তার বয়স ৭৮ বছর। সেই হিসেবে ১৯৪১ সালের ১৫ জুন তার জন্ম তারিখ ধরা হয়। সুঠাম এবং বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী এই ব্যক্তিটি মন-মানসিকতার দিক থেকে ঠিক সম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। গ্রামের সেই প্রকৃতির নিরন্তর ¯িœগ্ধতা তাকে সমস্ত মানবীয় গুণাবলির অধিকারী করে তৈরি করতে সহযোগিতা করেছিল। বগুড়ার করোনেশন স্কুল থেকে তার শিক্ষাজীবনের শুরু। অতঃপর ষাটের দশক থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাজনীতির হাতে খড়ি। ৬৬’র ৬ দফায় যা প্রস্ফুটিত হয়েছিল। এলো ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে তখন আজিজুল হক কলেজের ছাত্র। সারাদিন সারারাত ছাত্র রাজনীতি শেষে খর¯্রােতা নদীতে নৌকায় পাড়ি জমিয়ে কদিমপাড়ার বাড়িতে পৌঁছা ছিল নিত্যদিনের বিষয়। রাত্রি দ্বি-প্রহর ছাড়া তিনি কখনই বাড়ি ফিরতে পারেননি। বাবা-মার শত নিষেধ তাকে দমাতে পারেনি। অজানা এক আশঙ্কায় বাবা-মা সবসময় চিন্তিত থাকতেন। তারপরও তিনি চলেছেন দুর্দমনীয় গতিতে। কৈশোর ও যৌবনের সেই যোদ্ধা জীবনযুদ্ধে কখনও পরাজিত হননি। রণাঙ্গণে যুদ্ধ করেছেন অবলীলায়। বগুড়ার সমস্ত পথপ্রান্তর তার চেনা। বগুড়ার সাতমাথা তার সবচেয়ে বড় বন্ধু। রাজনৈতিক সমস্ত কর্মকাে র এই কর্মস্থল এখন কিছুটা শূন্য শূন্য মনে হয়। মনে হয় এই বুঝি তিনি এলেন। আবারও মিছিলে দাঁড়িয়ে যাবেন। তার দরাজ কণ্ঠ শুনে অনেকেই ভয়ে তটস্থ হবেন।

 এইতো বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনার কথা উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করবেন। কারণ বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনা বলতে তিনি ছিলেন পাগল। আর প্রাণপ্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগ ছিল তার পরিবার। ¯েœহ, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার এক সমন্বয়ে এক নিবেদিত প্রাণ মানুষ ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ভারতে গিয়েছিলেন ট্রেনিং নেওয়ার জন্য। ফিরে এসে শুরু করলেন মাতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু তার যুদ্ধ চলল মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত। বগুড়ায় আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করার যুদ্ধ। যুদ্ধে গিয়েছিলেন জীবনকে তুচ্ছ করে। বাঁচার ভাবনা নিয়ে যুদ্ধ করেননি। মৃত্যুর কথা বললেই তিনি বলতেন ’৭১ই মারা যেতে পারতাম। এখন পর্যন্ত বেঁচে আছি বোনাস নিয়ে। যুদ্ধে যেমন ইন্ডিয়ায় গিয়েছিলেন তেমনি মৃত্যুর আগেও ইন্ডিয়ায় গিয়েছিলেন। তার এই যাওয়া এবং কথার মধ্যে প্রচন্ড মিল। তিনি কখনও মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় গুণ অপরকে সম্মান করা। তিনি একজন পুলিশ কনস্্টেবলকেও সালাম দিতেন। অনেক সময় ছোট ছোট রাজনৈতিক কর্মিরাও তার কাছে সালাম পেতেন। তিনি যেমন কর্মিদের বকাঝকা করতেন তেমনি আদরও করতেন। বকাঝকা করা নিয়ে তার মনের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ছিল।

 প্রায় প্রায়ই বলতেন আমার রাগের কারণে আমি ডাক্তারকেও দেখিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ডাক্তার বলেছিলেন এটা আপনার জেনেটিকগত ব্যাপার। তারপর নিজেই গর্ব অনুভব করে বলতেন আমি কর্মিদের বকাঝকা করলেও তারা আমাকে ভালোবাসে, সম্মান করে। অন্যকেউ তাদেরকে বকাঝকা করলে প্রতিবাদ করে। কিন্তু আমি করলে তা মাথা পেতে নেয়। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। ৬৯’র সেই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে জেলে গিয়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে মায়ের চোখ প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জেল থেকে ফিরে এসে মায়ের বারণ তাকে দমাতে পারেনি। হয়েছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি, সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক। আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে যুক্ত হয়েছিল তার নাম। দেশ উত্তাল, চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। এমনি এক সময় ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে হাজারো জনতা উপস্থিত। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত বগুড়া। পুড়িয়ে দেওয়া হলো পাকিস্তানের পতাকা। বগুড়ায় প্রথম উত্তোলন করা হলো দেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। দড়ি টানছেন আর পতাকা উপরে উঠছে। হাজারো জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ছে। আর পতাকা উত্তোলনকারী পতাকার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি আর কেউ নন বগুড়ার রাজনীতির প্রাণপুরুষ, বগুড়ার আওয়ামী লীগ পরিবারের অকৃত্রিম অভিভাবক, তৎকালীন সময়ের ছাত্র নেতা মমতাজ উদ্দিন। যিনি এই বগুড়ায় বেঁচে থাকবেন হাজারও বছর। তার আদর্শ বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।
লেখক : উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ।
০১৭১১-৯৪৪৮০৫