তার কীর্তি চিরঅম্লান

তার  কীর্তি  চিরঅম্লান

মাশরাফী হিরো : অনেকেই তাঁকে নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু আমি মনে করি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় কর্মি হলেন তিনি। কারণ নেতারা অনেক সময় নিজের চাওয়া পাওয়াকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে দলের সাথে বেইমানী করতেও দ্বিধাগ্রস্থ হন না। কিন্তু কোন কর্মি দলের সাথে বেইমানী করেন না। এই কারণেই আওয়ামী লীগ সবসময় কর্মিদের গুরুত্ব দিয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, কর্মিরা অভিমানী হয় কিন্তু বেইমানী করে না। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সদ্যপ্রয়াত সভাপতি আলহাজ্ব মমতাজ উদ্দিন ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগের একজন আদর্শিক কর্মি ছিলেন। যিনি নিজেকে নেতা হিসেবে নয় বরং কর্মি হিসেবে ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আর তাঁর গুণের কারণেই বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগসহ বগুড়ার অগণিত মানুষ তাঁকে নেতার আসনে বসিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। যা যে কোন জাতীয় নেতার চাইতে কম নয়। তাঁর জীবনে তিনি কোন দিন দলের বাইরে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন নি। তা যদি তাঁর জন্য অপমানকর হয়ে থাকে তাও দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। বগুড়া করনেশন স্কুলে ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকে রাজনীতির হাতে খড়ি। বাংলাদেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু। কর্মি হয়ে শুরু হলেও সবার নজর কেড়ে ছিলেন তিনি। সততা, একাগ্রতা, মেধার কারণে তিনি অল্প দিনেই নেতা-কর্মিদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে ৬ মাস ৬ দিন জেল-কারাবাস ভোগ করেন। বের হওয়ার পর ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর পূর্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে বগুড়া আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর প্রথম ব্যাচ হিসেবে বগুড়ার কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।

 মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর সেই পদচারণা বগুড়ার মানুষের মুখে মুখে আজও ঘুরে ফেরে। যৌবনের সেই মমতাজ উদ্দিন মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যৌবনের রেশ নিয়েই চলেছেন। রণাঙ্গণের সেই যোদ্ধা সারাজীবন যুদ্ধ করেছেন অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হন তিনি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করেন। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। কিন্তু বদলে যাননি মমতাজ উদ্দিন। বহু নেতা দল বদল করলেও মমতাজ উদ্দিন থেকে গেছেন আওয়ামী লীগে। তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন বগুড়ার আওয়ামী লীগ। জন্ম দিয়েছেন হাজারও নেতা-কর্মির।  সৃষ্টি করেছেন আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। বগুড়ার সাতমাথা মানেই মমতাজ উদ্দিনের পদচারণা। হাজারও অত্যাচার-নির্যাতন তাঁকে দমাতে পারেনি। ১৯৮২ সাল থেকে মৃত্যুর আগদিন পর্যন্ত বগুড়ায় আওয়ামী লীগের দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনও সাধারণ সম্পাদক কখনও সভাপতি। এভাবেই চলেছে তাঁর সংগ্রাম। স্বৈরাচার এরশাদের সময় ৫ মাস ৫ দিন জেল খেটেছেন। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের সময়ে সাতমাথায় নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছেন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ২১ নভেম্বর বগুড়ার সাতমাথায় বিএনপি-জামায়াতের হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। ২০১৩ সালের ৩ মার্চ তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। অল্পের জন্য স্বপরিবারে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। তারপরও তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি। কত সঙ্গী-সাথী সামরিক শাসকদের কাছে মাথানত করে মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। কিন্তু মমতাজ উদ্দিন তা কোনদিন চিন্তাও করেননি। আওয়ামী লীগকে তিনি নিজের পরিবারের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। দলের নেতাকর্মিরা ছিল স্ত্রী এবং সন্তানদের চেয়ে বেশি আপন। ১৯৭২ সালে তখনও তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি। আসম আব্দুর রব এসেছিলেন তাঁর কাছে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিশন নিয়ে।

 তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলেছিলেন আমি বঙ্গবন্ধুর বাইরে রাজনীতি করব না। ১৯৮২ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসার পর উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিকে রংপুরে ডাকলেন। তখন সবাই আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ করছিলেন। রংপুরের সেই সভায় মমতাজ উদ্দিন বলেছিলেন আমরা সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতি করেছি আগামী দিনেও বঙ্গবন্ধুর রক্তের বাইরে যাব না। শেখ হাসিনা সেই দিন উজ্জিবীত হয়েছিলেন তাঁর সেই কথায়। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন কারারুদ্ধ তখন বহু নেতা মত এবং পথ পাল্টেছেন। কিন্তু মমতাজ উদ্দিন থেকে গেছেন শেখ হাসিনার অবিচল নেতৃত্বে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনিই প্রথম শেখ হাসিনার মুক্তি এজেন্ডাকে ৫ নম্বর থেকে ১ নম্বর এজেন্ডায় আনার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তারপর আওয়ামী লীগ সেই এজেন্ডা ১ নম্বরে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই ছিল তাঁর আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার প্রতি একাগ্রতা। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ২০তম কাউন্সিলে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সম্মেলনেও তিনি বক্তৃতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেখানেও তিনি বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে আগামী দিনে আওয়ামী লীগের হাল ধরার কথা বলেছিলেন। বগুড়ার সকল আন্দোলন সংগ্রামে ছিল তাঁর অনবদ্য ভূমিকা। শহীদ খোকন পার্ক প্রতিষ্ঠা, বগুড়ার দ্বিতীয় বাইপাস সড়ক নির্মাণ, বগুড়াকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা, সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণসহ বগুড়াবাসীর উন্নয়নে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। তাঁর রাজনৈতিক মেধা এবং প্রজ্ঞা বগুড়াকে সমৃদ্ধ করেছিল। তিনি ছিলেন বগুড়ার আওয়ামী লীগের অকৃত্রিম অভিভাবক। তাঁর এই অভিভাবকত্ব বরণ করে নিয়েছিল বগুড়ার আপামর জনতা। তাইতো আজ তিনি বগুড়ার সকল মানুষের অভিভাবক। তাঁর পদচিহ্ন আর বগুড়ার সাতমাথাকে সমৃদ্ধ করবে না। কোন মিছিল মিটিং এ আর তার দরাজ কণ্ঠ ভেসে আসবে না। তবুও মমতাজ উদ্দিনের স্মৃতি থেকে যাবে বগুড়ার সর্বত্র। বেঁচে থাকবেন হাজারও নেতা-কর্মির মাঝে। তাঁর শারীরিক মৃত্যু তাঁকে আরও অবিস্মরণীয় করে রাখবে।
লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক  
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ।
০১৭১১-৯৪৪৮০৫