ঢাকায় অসহ্য যানজট এবং প্রস্তাবিত ভিআইপি লেন

ঢাকায় অসহ্য যানজট এবং প্রস্তাবিত ভিআইপি লেন

মীর আব্দুল আলীম:যানজটে আটকে থাকা রাজধানী ঢাকায় ভিআইপি লেন হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জরুরি সেবার যানবাহন এবং ভিআইপিদের জন্য ঢাকার রাস্তায় আলাদা লেন করার প্রস্তাব সড়ক বিভাগে পঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সহসা ভিআইপি লেন হয়েও যাবে। যানজটমুক্ত রাস্তায় সুখ করবে ভিআইপিগণ, আর ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থেকে গলদঘর্ম হবে গরিব। প্রশ্ন হলো ঢাকার এমন সরু রাস্তায় আলাদা ভিআইপি লেন কতটা যৌক্তিক? ঢাকাকে বলা হয় যানজটের শহর। বিশ্বের মেগাসিটিগুলোর মধ্যে ঢাকার মতো আর কোথাও বিরক্তিকর যানজটের আবির্ভাব হয় কিনা আমাদের জানা নেই। যানজটের কারণে ঢাকা আজ এক গুরুতর অসুস্থ নগরী। যাতায়াত দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে নিরবচ্ছিন্ন যানজটে। যানজট সমস্যার সমাধানের জন্য নগরীর বিভিন্ন জায়গায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। এত কিছুর পরও যানজট সমস্যার সমাধানের একমাত্র তেমন কার্যকর অগ্রগতি এখনও লক্ষ্য করা যায়নি। যানজট রাজধানী ঢাকার দেড় কোটি মানুষের মেগাসিটিকে স্থবির করে দিচ্ছে। প্রতিদিন যানজটে

লাখ মানুষের হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানী ক্রমান্বয়ে অচল নগরীতে পরিণত হচ্ছে। জনসংখ্যার তুলনায় রাস্তার স্বল্পতা এবং স্বল্পগতির অযান্ত্রিক যানবাহনের আধিক্যকে এ স্থবির অবস্থার জন্য দায়ী করা হয়। ট্রাফিক আইন না মানা, পরিকল্পনার অভাব, ফুটপাত দখল, প্রাইভেটকারের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়াও যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যানজটের কারণ হিসেবে ভাঙাচোরা রাস্তা এবং কারণে-অকারণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকেও দায়ী করা হচ্ছে। যেখানে-সেখানে পার্কিং, ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো ইত্যাকার সমস্যা তো বহু পুরনো। কিছুতেই রাজধানীর যানজট সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। যানজট পরিস্থিতি দিনই দিনই জটিল হচ্ছে। এরপরেও কি ভিআইপি লেন? আলাদা এ লেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হবে নাতো? রাজধানী ঢাকার রাস্তাতো করা হয়েছিলো ৫ লাখ লোকের বসতিকে লক্ষ্য করে। সেই শহরে আজ ২ কোটি লোক বাস করে। ফলে বিশ্বের অন্যতম যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। ঢাকার রাস্তায়তো এমনিতেই চলা দায়। এত সরু রাস্তায় আলাদা ভিআইপি লেন? এটা অসম্ভব। তা করা হলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। যানজটের নগরী পরিণত হবে যানজটের মহানগরীতে।

সংবিধান অনুযায়ী দেশের সকল নাগরিক সমান। পৃথিবীতে উন্নত অনেক দেশে নিজ চোখে দেখেছি  সেখানে ভিআইপিরা সাধারণ মানুষের সাথে চলাচল করেন। কে ভিআইপি কে সাধারণ নাগরিক বোঝার উপায় থাকে না। আমরা কি সেই দৃষ্টান্ত গ্রহণ করতে পারি না? পাঠক আপনাদের একটি তথ্য জানা জরুরি। রাজধানীতে যানজটের কারণে বছরে বাণিজ্যিক ক্ষতি ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিদিন এর পরিমাণ ৮৩ কোটি। এছাড়া প্রতি কর্মদিবসে নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা, যা একজন মানুষের একমাত্র তিন ঘণ্টা। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট থেকে রাজস্ব গচ্চা যাচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকা। যানজটের কারণে রাজধানীতে পরিবহন প্রবেশ করতে না পারায় প্রতিদিন বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আয় নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে যানজটের কারণে দিনে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা ১২ ঘণ্টায় রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনকে যানজটের কারণে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এর মধ্যে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নামছে প্রায় ২০০ বিভিন্ন ধরনের পরিবহন। আগামী ২০৩০ সালে ঢাকায় জনসংখ্যা হবে ৩০ কোটি। এই প্রেক্ষাপটে যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সময় এখনই। রাজধানী ঢাকাকে সবার জন্য বসবাসের উপযোগি করতে হলে যথাযথ সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।  

ঢাকা মহানগীর যানজট, পার্কিং সমস্যা, পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগের প্রেক্ষিতে আশু করণীয় হলো পার্কিং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, বিনামূল্যে পার্কিং বন্ধ করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করা, সর্বত্র জায়গা ও সময়ের মূল্যানুসারে পার্কিং ফি নেয়া, পার্কিং থেকে প্রাপ্ত অর্থ পাবলিক পরিবহনের মানোন্নয়নে ব্যয় করা। নগরের ব্যস্ততম এলাকায় প্রাইভেট গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে কনজেশন চার্জ গ্রহণ করা, প্রাইভেটকারের লাইসেন্স সীমিত করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে প্রাইভেট গাড়ির পরিবর্তে পাবলিক পরিবহনের ব্যবস্থা করা, প্রইভেট গাড়ি নির্ভর অবকাঠামো (ফ্লাইওভার, পার্কিংয়ের স্থান তৈরি) নির্মাণ না করা। পাবলিক পরিবহন, জ্বালানিমুক্ত যান ও পথচারীদের সুবিধা বৃদ্ধি করা। জায়গা ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ও প্রাইভেট গাড়ির পার্কিং সমস্যা সমাধানে পার্কিংয়ের জন্য সময় ও স্থান অনুসারে অর্থ গ্রহণই যুক্তিযুক্ত। যানজট রাজধানীর নগরজীবনকেই শুধু বিপর্যস্ত করে তুলছে তা নয়, ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য নগরী হিসেবেও পরিচিতি এনে দিয়েছে। যানজট সমস্যার সমাধানে আরও বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। এ নির্মাণ কাজের জন্য ব্যস্ত সড়কের একাংশ ব্যবহৃত হওয়ায় ধারে কাছের সব সড়কে যানজট অনিবার্য হয়ে উঠছে।

 নির্মাণ কাজের শম্বুকগতি মানুষের ভোগান্তি-কে দীর্ঘস্থায়ী করছে। যানজটে এমনই অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে যে, আধা ঘণ্টা দুরত্বের সড়ক অতিক্রম করতে গড়ে সাত-আটগুণ পর্যন্ত সময় লাগছে। রাজধানীর যানজটের জন্য প্রাইভেট কারের মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়। বলা হয়, রিকশার পাশাপাশি প্রাইভেট কারের আধিক্য অচলাবস্থার সৃষ্টি করছে। তবে অভিজ্ঞজনদের মন্তব্য, ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা যানজটের জন্য প্রধানত দায়ী। ঢাকার রাজপথের এক বড় অংশ অবৈধ দখলকারীদের দখলে চলে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অবৈধ দখলদারিত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক টাউট, পাড়া-মহল্লার মস্তান এবং পুলিশের সম্পর্ক থাকায় রাজধানীর সড়কগুলো দখলমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট উঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে যানজট এমনিতেই সহনীয় হয়ে উঠবে। এর পাশাপাশি কঠোরভাবে ট্রাফিক আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হলে যানজটের রাশ টেনে ধরা সম্ভব হবে। রাজধানীর যানজট সহনীয় মাত্রায় আনতে স্বল্প গতির যানবাহন ও প্রাইভেটকারের সংখ্যাধিক্যের দিকে নজর দেয়া দরকার। ট্রাফিক আইন যাতে সব ক্ষেত্রে কড়াকড়িভাবে মানা হয় সে ব্যাপারেও যতœবান হতে হবে। ফুটপাত থেকে দোকানপাট উঠিয়ে দেয়া, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং দিনের ব্যস্ত সময়ে প্রাইভেটকার চলাচল কমিয়ে আনার কথাও ভাবতে হবে। রাজধানীতে জনসংখ্যার তুলনায় সড়কের সংখ্যা এমনিতেই কম।

 তারপরও রয়েছে স্বল্পগতির রিকশা ও প্রাইভেটকারের আধিক্য। ফুটপাত দখল করে দোকানপাট চালানো কিংবা রাস্তায় যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং এ মেগাসিটিতে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো প্রাইভেট গাড়ির অপরিকল্পিত পার্কিং। ঢাকার প্রায় সব সড়কেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে গাড়ি পার্কিং। ফলে সড়কে যানবাহন চলাচলের জায়গা কমে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। আবার পার্কিংয়ে কোথাও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহারে আরও উৎসাহিত হচ্ছে। গাড়ি বাড়ছে, বাড়ছে পার্কিং সমস্যাও। পার্কিং সমস্যা নিরসনে ইতিপূর্বে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও সমাধান মেলেনি। যানজট নিয়ন্ত্রণ, সম্পদ ও জায়গার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পার্কিং সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বের করা জরুরি। রাজধানীর যানজট নিরসনে সঠিক পরিকল্পনা এবং সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব দেখা যায়। পার্কিং সমস্যা নিরসনে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প কিছু নেই। ঢাকার রাস্তা, ফুটপাত, খেলার মাঠ, পার্ক সর্বত্রই প্রাইভেটকার পার্কিংয়ের জন্য নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে জায়গা বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া ভবনে আবশ্যিকভাবে কার পার্কিংয়ের জন্য জায়গা রাখা ও পার্কিংয়ের জন্য ভবন নির্মাণ করে শহরে প্রাইভেটকারকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। মতিঝিল এলাকায় নির্মিণাধীন সিটি সেন্টারে ৫০০ প্রাইভেটকার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে ১০টি ফ্লোর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় প্রতিটি ভবনে প্রাইভেটকারের পার্কিং সুবিধা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 যার ফলে ভবিষ্যতে প্রাইভেটকার বৃদ্ধি পাবে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব মতে মতিঝিল-দিলকুশা এলাকায় প্রতিদিন প্রায় চার হাজার  প্রাইভেটকার পার্কিং করা হয়। প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ না করা হলে এবং সেই সঙ্গে বিকল্প পরিবহন সুবিধা দিতে না পারলে শুধু পার্কিং সুবিধা বৃদ্ধি করে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জনসমাগম স্থলে গাড়ি পার্কিং করা হলে মানুষের চলাফেরা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নষ্ট হয়। আমরা চাইলেই ফুটপাত বা রাস্তায় ব্যক্তিগত জিনিস রাখতে পারি না। অথচ সর্বত্রই প্রাইভেট গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য রাস্তা এবং ফুটপাত ব্যবহার করা হচ্ছে। ফুটপাত ও রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করায় মানুষের চলাচল বিঘিœত হয়, আশপাশের ব্যবসা কেন্দ্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, জনসাধারণের অবাধ বিচরণের অধিকার খর্ব হয়।

যানজট নিরসনের কথা ভাবার আগে প্রশ্ন এসে যায়, রাজধানীতে কত মানুষের নাগরিক সুবিধা দেয়া সম্ভব? ঢাকা শহরের আয়তন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করতে পারে। অর্থাৎ এই শহরে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ মানুষকে নাগরিক সুবিধা দেয়া সম্ভব। তাহলে ঢাকায় জনসংখ্যা কত? এ নিয়ে আছে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ২০৩০ সালে রাজধানীতে জনসংখ্যা হবে দুই কোটি। ঢাকা সিটি করপোরেশন বলছে সোয়া কোটি। জাতিসংঘের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ২২ লাখ ২১ হাজার। বর্তমানে ঢাকায় লোকসংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখ। ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছয় শতাংশ। ১২ বছর পর ঢাকার জনসংখ্যা হবে প্রায় আড়াই কোটি। বিশ্বব্যাংকের মতে রাজধানীর বর্তমান পরিস্থিতিতে যানজট নিরসন অসম্ভব। তাহলে ঢাকাবাসীর কি হবে? যানজটেই আটকে থাকবে ঢাকাবাসী। এরপর ঢাকা নিরসন না করে ভিআইপিদের একটা গতিশীল লেন করার প্রস্তাব মোটেও যৌক্তিক নয়। এ ধরনের প্রস্তাব দেয়া মোটেই নৈতিক নয়। এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে।  সরকার এ বিষয়ে  ভেবে চিন্তে সঠিক সিদ্ধাত নেবেন- এটাই আমরা চাই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮