ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলোর অবিনাশী আবাহন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  আলোর অবিনাশী আবাহন

ফিদা হাসান রিসলু : কিছু কিছু দিন থাকে, বছর থাকে- থাকে তার পেখমিত প্রাংগণ; অনলস পরিব্রাজকের মত অনুভূতির অদমনীয় পা ফেলে ফেলে পরিভ্রমণ করে- হৃদয়ের অংগন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর প্রতিবাদের প্রথম স্ফূলিংগ হয়ে জ্বলে ওঠা প্রতিষ্ঠানের নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সমবেত হাজার-হাজার ছাত্র-ছাত্রীর গগণবিদারী শ্লোগানে কম্পিত মিছিল যখন শিক্ষাভবন অভিমুখী; পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে নিহত তখন- জয়নাল, জাফর, ওয়াজেদ, দিপালী সাহা, কাঞ্চনসহ আরোজন। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্যে লালিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ শহীদের রক্ত ছুঁয়ে- সেদিন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তারই দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে- আমরা নবাগত সহস্রাধিক ক্যাম্পাসে পা রাখি, ’৮৪ সালের এপ্রিল শেষের কোন একদিন। নব অন্নে- হবে নবান্নের সেই দিনটিতে কলাভবনের চারতলায় লোকপ্রশাসন বিভাগের সেমিনার কক্ষে আমরা অর্ধশতাধিক ছাত্র-ছাত্রী পূর্ণ জীবনের পরশ নিতে একে -অপরের পরিচয় শেষে মহৎ সান্নিধ্যের সুযোগ পেলাম- বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ মিয়ার সাহচার্যে।

 জ্ঞানের দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়বে নিতান্তই সাধারণ বেশভূষার এই ধীমান শিক্ষক সকলের সাথে পরিচয়ের শেষে বললেন যেসব কথা, তার সারমর্মটা ছিল এরকম- বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে মুক্ত জ্ঞানচর্চার সীমাহীন প্রান্তর। চিন্তার প্রসারিত উদ্দামতা দিয়ে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির এই আঙিনায় যেমন নির্দিষ্ট পাঠ্য দিয়ে সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার গড়ে তোলা যাবে, একইভাবে সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতির চাওয়ার সাথে না-পাওয়াগুলোকেও চেতনার স্তরে স্তরে সপ্ত সিন্ধুজলের মত ধ্বনিত করা যাবে। তিনি নির্দেশনার আকারে বললেন, কলাভবনের নিচতলা থেকে এই চারতলা পর্যন্ত চোখের ডানে-বায়ে যেসব দেওয়াল লিখন দৃশ্যমান আছে, সেগুলির পর্যবেক্ষণ শেষে নিজস্ব বিশ্লেষণ মাঝেই নিহিত হবে শিক্ষা, পর্যবেক্ষণ আর নিম্নমানের ধ্রুপদি বাণী। স্যারের এই মহতি ধ্বনির প্রতিধ্বনি মাঝেই আজো খুুঁজে ফিরি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ৭ বছরের শিক্ষাজীবন।

ভালোবাসার পাশেই শুয়ে থাকা অসুখের মত করে কিউ এস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংয়ের যে তালিকা দেয়া হয়েছে, সেখানে বিশ্বের ৭০০টির তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এশিয়ার সেরা ৩০০টির মধ্যে ২৪৩ নম্বরে জায়গা পেয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই অঞ্চলে চীন আর ভারতের আধিপত্য মাঝে আমাদের অবস্থান হচ্ছে শ্রীলংকা আর পাকিস্তানের নিচে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই বেহাল দশার পিছনে অনেক-অনেক কারণ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা না-থাকলেও আত্মপ্রসাদে বিগলিত হয়ে আজো আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভিহিত করে থাকি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে। কবে, কখন, কার দ্বারা এই নামকরণ করা হয়েছিল- সেটি অজানা থাকলেও সমাজ-সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রেক্ষিত বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অক্সফোর্ডের সাথে তুলনা করা যায়না। বৃটেনের শিল্প বিপ্লবের ছন্দময় গতি কিংবা ফরাসি বিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার যে শ্বাশতবাণী ইউরোপীয় জীবনকে প্রভাবান্বিত করতে সক্ষম হয়েছিল, অন্ধকারাচ্ছন্ন এই জনপদ মাঝে সেটি তেমন করে প্রতিভাত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের মত বিশাল এক মহাকাব্যের সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পৃক্ততা থাকলেও পরবর্তি সময়ে বিবিধ কারণে সেই ঘটনার অভিঘাত সুদূরপ্রসারী হয়নি। উনবিংশ শতাব্দির বাঙালি রেঁনেসা একজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা একজন রাজা রামমোহন রায়ের মত শিরদাঁড়া সম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মনীষীদের মঞ্জুরিত করতে সক্ষম হলেও দেবেন ঠাকুর, কেশব সেন কিংবা বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখেরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুনরুজ্জীবনে সবিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।

বৃটিশ বেনিয়াদের সাহচার্যে তৎকালিন হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশ আধুনিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত থেকেও জাত-কুল-ধর্ম রক্ষায় ছিলেন সমান তৎপর। অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষার সুবিধা বঞ্চিত বাঙালি মুসলিম মানস আধুনিক চিন্তা হতে দূরে থেকেও ধর্মীয় ব্যাপারে ছিলেন দারুনভাবে উদাসীন। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে আধুনিক সাহিত্যের পাঠকসংখ্যা সীমিত হলেও মুসলিম পুঁথি সাহিত্যের পাঠক এবং শ্রোতা একেবারে কম ছিল না। দেখা গেছে, বঙ্কিমের একেকটি উপন্যাসের দুই-আড়াইশ কপির বিপরীতে বটতলার পূঁথি মুদ্রিত হয়েছে হাজার-হাজার। বঙ্কিমের বিষয়বস্তুর সাথে পুঁথির তুলনা করলেও দেখতে পাই, পুঁথির বিষয়বস্তু সেক্যুলার বা ইহজাগতিক হলেও চিন্তার পদ্ধতি মধ্যযুগীয় অন্যদিকে বঙ্কিমের চিন্তা আধুনিক হলেও বিষয়বস্তু ধর্মীয়। মূলত: উনবিংশ শতাব্দির পুরোটা জুড়েই রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বহুদূরের মুসলিম মানস প্রথমবারের মত নিজেদের দিকে তাকানোর সুযোগ খুঁজে পায়- ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে। প্রায় একই সময়ে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা তাদের রাজনৈতিক সাহচার্যের ভরসা হয়। কিন্তু ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের পর হাতে আসা ক্ষমতার খড়কুঁটো বঞ্চিত মুসলিম মানস, তার চিন্তা-চেতনায় নবতর দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটায়।

 এমনতর ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্থিত এক জাগরণের আউটপুট হিসাবে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। কাজেই মুক্তবুদ্ধি এবং মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির যে চিরায়ত ধারণা বিশ্ববিদ্যালয় ধারনার সাথে একাকার হয়ে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এবং তৎপরবর্তী ঘটনা প্রবাহে সেটা তেমন করে বিকশিত হতে পারেনি। তবে যা পেরেছিল, সেটা হচ্ছে- জাতিগত কিংবা সমষ্টির ঐক্যতানকে অটুট রাখা। শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন, যাঁরা জ্ঞানচর্চ্চার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার বিকশিত বিভা তেমন করে পরিস্ফূট হতে দেখা যায়নি। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্যবর্তি সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রও ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি; যেটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। ঐতিহাসিক কারণেই জাতিগত এবং সমষ্টিগত মুক্তির বিষয়টিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। মনীষা লেখক আহমদ ছফা যথার্থই লিখেছেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি প্রধান অবদানের একটি হল পাকিস্তান আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ভিতটি তৈরি করা। দ্বিতীয় অবদান বাংলা ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বদান একং তৃতীয় অবদান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংকল্প ও কর্মপন্থার দিকনির্দেশনা।

শিক্ষা সুযোগ নয়-অধিকার- এই নিয়ে যার শুরু; অনেক আন্দোলন আর রক্তের শ্রোত বেয়ে-বেয়ে সেটি চেয়ে বসলো বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা। পাঁচটি মৌলিক চাওয়ার সাথে এটিও ছিল ছাত্র-সমাজের প্রাণের অতল থেকে উঠে আসা একটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সেই চাওয়াটার মর্যাদা দিয়েছে সাংবিধানিক আখরে। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্বশাসন অধ্যাদেশ সেই চাওয়ার পাওয়া হয়ে সর্বত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আপ্লুত করেছে অহং জাগানিয়া অনুভবে। কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করে জীবনের বিকাশ ঘটানোর মহতি এই আয়োজনে স্বাধীন দেশের ছাত্রসমাজ হোচট আক্রান্ত হয়ে পড়ে শুরু থেকেই। হতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে জ্বলে উঠা সেই আগুন বিবিধ রাজনৈতিক মোটিভেশনে আরো আরো আগুনের বার্তা নিয়ে হতে চেয়েছে অগ্নিশ্রাবী। তাইতো দেখি, ’৭৩এর পহেলা জানুয়ারি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবসে পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্র ইউনিয়ন কর্মি মতিউল-কাদেরের লাশকে সামনে রেখে ডাকসু ভিপি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চাইতেও বঙ্গবন্ধু মুজিবকেই বড় শত্রু জ্ঞান করে বসলেন। ঘোষণা দিলেন, ডাকসু থেকে বঙ্গবন্ধুর আজীবন সদস্যপদ বাতিলের। কমিউনিষ্ট পার্টির মধ্যস্থতায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হলে ক্রিয়ার বিপরীত প্রক্রিয়ায় নিঃশেষ ছাত্র ইউনিয়নের শবদেহের ওপর দাঁড়িয়ে ছাত্রলীগের বৈজ্ঞানিক-রব হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পিতার চামড়া দিয়ে এটা-সেটা বানাতে চাইলেন। মাতিয়ে রাখা কেউ আবার সেই চামড়া দিয়ে ঢোল বানিয়ে বাজাতে চাইলেন ডুগডুগি। যাঁর কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা এলো- বাঙালির উঠোন জুড়ে; তেমন একজন মহান নেতাকে নিয়ে এই যে রাজনৈতিক অসভ্যতা, তারই ধারাবাহিকতায় ঘটতে থাকে একের পর এক অনাহূত ঘটনা। সূর্যসেন হল থেকে সাতজন ছাত্রকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো মহসিন হলের করিডোরে। ব্যালটবাক্স লুট হয়ে তছনছ হয়ে গেল ডাকসু নির্বাচন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ধাবিত হতে চাইলো যেন নির্মলেন্দু গুণের কবিতার মত উল্টোরথে- স্বাধীনতা পেলে আমরা পরাধীন হতে ভালোবাসি।

যা হওয়ার নয়, তাই হলো; নিহত জনকের রক্তের ওপর দিয়ে, পরাধীনতার কলুষতা বেয়ে আবারো সামরিক এসে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন তাড়িয়ে দিলো। রাজনৈতিক চেতনার উদ্দিপ্ত আবাহন হয়ে একদিন যে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আলোকের আঙিনা; আলো ছায়ার উপর্যুপরি লড়াইয়ে পরাভূত হতে-হতে অবসাদিত ছায়ার নিচে সেটি যেন রূপ নিল- পর্যুদস্ত বনস্পতির। আন্দোলন-সংগ্রামের সুদীর্ঘ রক্তপথ বেয়ে-বেয়ে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, তবে কী আমাদের কিছুই দিলো না? এ প্রশ্নের বিশদে না-গিয়ে প্রাসংগিকভাবেই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই; অবাক হয়ে তখন বিস্মিত দেখি- মুক্তিযুদ্ধের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা কত কত বিস্ময় ব্যক্তিত্ব, তাঁদের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে অনেক-অসংখ্য মানুষের জীবনকে শুধু সমৃদ্ধই করেননি; আগামি প্রজন্ম মাঝেও জ্বালিয়ে রেখেছেন সেই আলোর অবিনাশী আবাহন। কে আগে, কে পরের বিচারে না গিয়ে আদ্যাক্ষর আগের এই সীমায়িত পরিসরে চলে আসাদের একজন হতে পারেন- আহমদ ছফা। জ্ঞানের গভীরতা বুকে বয়ে বেড়ানো এই মানুষটি যেন তার বইয়ের মতই ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস; শুরুতেই যেখানে লিখেছেন তিনি, বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না।

 সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে মেধাবী মননে এতো বেশি আলোড়ন তুলেছেন বলেই বোধহয়, সলিমুল্লাহ খাঁনের মত আরেক ধীমান, তাঁকে নিয়ে লিখতে পারেন- ছফা সঞ্জিবনী। যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের মত ব্যক্তিত্ব হতে পারেন সৌরভের সুরভিত কানন। ভাষাবিজ্ঞানের নির্মোহ দৃষ্টিতে লেখা তাঁর দুই খন্ডের বর্ণাঢ্য বিস্তার- ‘বাংলাভাষা’ জাতিগতভাবে বাঙালির মহৎ কীর্তি হিসাবে বিবেচিত হবে। বুদ্ধদেব বসুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলন রচনায় শত বছর পরেও তিনি থাকবেন স্মরণীয়। বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় খ্যাত এই প্রথাবিরোধী শুধু সাহিত্য সমালোচক হিসাবেই নন; আর্থ-সামাজিক রাজনীতির ক্ষুরধার বিশ্লেষণে সমালোচনাকে নিয়ে গেছেন শিল্পের সর্বোচ্চ শিখরে। বিশ্বসেরা পঞ্চাশজন চিত্রশিল্পীর একজন, ফ্রান্স প্রবাসী শাহাবুদ্দিন আহমেদ গতি আর ছন্দের অপরূপ উদ্ভাসে মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে ক্যানভাসে মেলে ধরেছেন; সেটা কেবল তাঁর মত রণাংগনের যোদ্ধার পক্ষেই সম্ভব।

যুদ্ধের গতি দিয়ে জীবনকে সাজানোর এমন বর্ণাঢ্য রং-তুলির কারিগর যে কোন জাতির জন্যই গর্বের ব্যাপার। নাট্যাচার্য সেলিম আলদীন হাজার বছরের বাংলা নাটকের মৌলিকত্বকে ধারন করে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের আদলে মঞ্চ নাটককে যেখানে নিয়ে গেছেন, উৎকর্ষ বিচারে তার তুলনা মেলা ভার। আধুনিক বাংলা কবিতার অমিয় সুধারসে কবি আবুল হাসান কিংবা নির্মলেন্দু গুণ তাঁদের আসনকে করেছেন চিরস্থায়ী। মুখাভিনয় আমাদের সমাজকে তেমন করে দোলায়িত করেনি। অভিনয় মাধ্যমের চূড়ায় অধিষ্ঠিতরাই কেবল এই মহৎ শিল্পের সাথে জড়িত থাকার সাহস রাখেন। ইউরোপীয় সমাজে দারুন জনপ্রিয় এই মুখাভিনয়কে বিশ্বমানে উপস্থাপন করে আমাদের পার্থ প্রতিম মজুমদার গর্বিত করেছেন বাংলাদেশকে। এরকম অনেক - অজস্র গর্বিত বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে আছে-গর্ভধারিণী বাংলাদেশ। অথচ আজ যখন সারা বিশ্বের সাতশোর মধ্যেও খুঁজে পাইনা আমার বিশ্ববিদ্যালয়; বিস্মিত হয়ে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বন্ধু-সহপাঠীদের মাঝে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে শুনতে পাই শংখ ঘোষের কবিতা- যতটুকু দেখে গেলে ততটুকু নয়/ আরো আছে; ভালোবাসা থেমে আছে/ আমারও আমূল অন্ধকারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৭৩১-৪৮২৮৮৭