মাথায়, হাত ও পিঠে ছুরিকাঘাত : আনা হয়েছে ঢাকায়

ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা, আটক ১

ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা, আটক ১

করতোয়া ডেস্ক : প্রগতিশীল লেখক বুদ্ধিজীবী এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বর্তমান শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা হয়েছে। তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা হয়েছে। ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তার চিকিৎসায় ৫ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।তার মাথা, হাত ও পিঠে ছুরিকাঘাতের একাধিক জখম রয়েছে।তার উপর হামলাকারী এক সন্ত্রাসীকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়েছে। তাকে গণপিটুনি দিয়ে প্রথমে পুলিশ ও পরে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, সিপিবি ও গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠন এ সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা এ ঘটনার নেপথ্য নায়কদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে।এ ঘটনার প্রতিবাদে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর শাহবাগ এবং তার নিজ জেলা নেত্রকোনায় তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল বিকাল ৫টায় শাবিপ্রবির একটি অনুষ্ঠানে পেছন থেকে তার মাথায় ছুরি দিয়ে আঘাত করা হলে তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার পর তাকে দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, হামলার পর হাসপাতালে নেওয়ার সময় মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হলেও কথা বলছিলেন ৬৪ বছর বয়সী এই শিক্ষক। জঙ্গিদের হামলার অন্যতম লক্ষ্য জাফর ইকবাল কয়েক বছর ধরে পুলিশ পাহারা পেয়ে আসছেন সেই পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই এই হামলা হলো। ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ফেস্টিভ্যাল চলছিল ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক জাফর ইকবাল; সেখানেই তার উপর হামলা হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী বলেন, বিকাল ৫টায় মঞ্চে ওঠার সময় পেছন থেকে তার মাথায় ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, মঞ্চের পেছন থেকে এসে এক ছেলে ছুরি মারে গলা, বুক ও মুখের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশসহ অন্যরা তাকে আটক করে। ওই তরুণকে বেদম পেটানোর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-২ এ আটকে রাখা হয়েছে। হালকা দাড়িধারী এই তরুণের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি     বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস জানিয়েছেন। কী কারণে জাফর ইকবালের উপর এই হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে দুটি বিষয় ঘুরে-ফিরে আসছে শিক্ষার্থীদের আলোচনায়। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন জাফর ইকবাল। র‌্যাগিংয়ের দায়ে পাঁচ ছাত্রের শাস্তি দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, এদের শাস্তির পরিমাণ কম হয়েছে, তাদের পুলিশে দেওয়া উচিৎ। এতে জঙ্গিদের হাত থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। জাফর ইকবাল বরাবরই জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। কয়েক বছর আগে লেখক, অধ্যাপক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের উপর জঙ্গি হামলার সময় জাফর ইকবালও হুমকি পাচ্ছিলেন। তখন তার পাহারায় পুলিশ মোতায়েন করে সরকার। হামলার পর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। জালালাবাদ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম স্বপন বলেন, উত্তপ্ত অবস্থায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভাঙচুর করেছে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মাথায় চার আঘাত, হাত-পিঠে ছুরির জখম
নিজের ক্যাম্পাসে পুলিশি পাহারার মধ্যে আক্রান্ত অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের মাথায় চারটি আঘাতের ক্ষত পেয়েছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া তার বাঁ হাত ও পিঠে ছুরিকাঘাতের জখম হয়েছে। হামলার পরপরই তাকে সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসার পর রাতে তাকে ঢাকায় আনা হয়েছে। ওসমানি মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুল হক সাংবাদিকদের বলেন, উনার মাথায় চারটি আঘাত করা হয়েছে। এগুলো রডের আঘাত বলে মনে হচ্ছে। এছাড়া তার বাঁ হাত ও পিঠে ছুরিকাঘাতের জখম রয়েছে। জাফর ইকবালের শরীরে ২৫ থেকে ২৬টি সেলাই পড়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন উনি শঙ্কামুক্ত। এদিকে, ঢাকায় আনার উদ্দেশে রাত পৌনে ১০টার দিকে ওসমানি মেডিকেল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে জাফর ইকবালকে সিলেট বিমানবন্দরে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ঢাকায় আনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জাফর ইকবালকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হবে বলে তার প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানিয়েছেন।
‘আমি ওকে আছি’
খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ছুরিকাহত হওয়ার পর তাকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ২৭ মিনিটে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ড. জাফর ইকবালকে দেখতে জড়ো হওয়াদের মধ্যে এক শিক্ষার্থী জানান, হামলার পরপরই তিনি স্যারের সঙ্গে কথা বলেছেন। স্যার জানিয়েছেন, তিনি ওকে আছেন। নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন।প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানান, স্যার মুক্তমঞ্চে বসেছিলেন। সামনে একটি রোবট প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। হঠাৎ এক যুবক এসে স্যারের মাথার পেছনে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্যারের শরীর রক্তে ভিজে যায়।তিনি আশঙ্কামুক্তস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. এহতেশামুল হক দুলাল বলেন, অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে সেলাই করা হয়েছে। জখম ততটা গভীর নয়। আমি নিশ্চিত করছি যে, তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত। ঢাকা থেকে সার্বক্ষণিক তার চিকিৎসার খোঁজ খবর নেয়া হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের মহাসচিব দুলাল।
হামলাকারী ধরা  
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলাকারী তরুণ ধরা পড়েছেন। গতকাল শনিবার বিকালে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে এই হামলার পরপরই ওই তরুণকে ধরে ফেলা হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। ওই তরুণকে বেদম পেটানোর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-২ এ আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় নড়েচড়ে বসে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)। ঘটনার পরপরই ছাত্রদের সহযোগিতায় হামলাকারী একজনকে আটক করা হয়। ক্যাম্পাসজুড়ে নেয়া হয় নিñিদ্র নিরাপত্তা।প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক-ছাত্রদের অভিযোগ, খোদ পুলিশের উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটে। যদিও হামলাকারীকে গ্রেফতার করা গেছে কিন্তু হামলার ঘটনা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে এসএমপির অতিরিক্ত অতিরিক্ত কমিশনার পরিতোষ ঘোষ জানান ড. জাফর ইকবালের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সহযোগিতা করছে। ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হামলাকারীকে ছাত্রদের সহযোগিতায় আটক করা হয়েছে। কেন কি কারণে কাদের ইন্ধনে হামলা করা হয়েছে তা জানার জন্য ওই হামলাকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
‘শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত’
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল আমাদের শিক্ষা পরিবারের একজন অনন্য সদস্য। তার ওপর আঘাত মানে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়া হচ্ছে।ছুরিকাঘাতে আহত অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে দেখতে গিয়ে শনিবার রাতে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলায় জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শাস্তি দাবি কাদেরের
সিলেট শাহজালাল (র.) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, খ্যাতনামা লেখক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যার উদ্দেশ্যে কাপুরুষোচিতভাবে ছুরিকাঘাত করার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ড. জাফর ইকবালের মতো সকলের শ্রদ্ধাভাজন দেশবরেণ্য শিক্ষকের উপর এই ধরনের হামলা দেশে অশুভ শক্তির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ইঙ্গিত বহন করে। তিনি গ্রেফতারকৃত যুবকসহ এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নেপথ্যে জড়িত সকলের মুখোশ উন্মোচন এবং অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাথে কথা বলেন।
বিএনপির নিন্দা
অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাকে একটি চক্রান্ত বলে এর নিন্দা জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই নিন্দা জানান। তিনি বলেন, তার (অধ্যাপক জাফর ইকবাল) ওপর হামলার ঘটনায় আমরা তীব্র ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা কখনোই এই ধরনের সন্ত্রাসের পক্ষে নই। আমরা মনে করি যে, এটা আরেকটা চক্রান্ত। যারা দেশে এই ধরনের ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায় এটা তাদেরই চক্রান্ত।
সিপিবির নিন্দা
সিঅধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম। গতকাল এক বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একজন শিক্ষাবিদের ওপর এ ধরনের হামলা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাজুকতাকে তুলে ধরেছে। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
জাসদের নিন্দা
ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জাসদ (একাংশ) সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে তারা বলেন, জাফর ইকবালের উপর হামলার ঘটনায় ইতিমধ্যে আটক হামলাকারীকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং হামলাকারীর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।