ডালমিয়ার ১৯ বছর পর মহারাজ সৌরভ!

ডালমিয়ার ১৯ বছর পর মহারাজ সৌরভ!

ঠিক ১৯ বছর আগের কথা। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের নেতৃত্বে যেদিন সৌরভ গাঙ্গুলির ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেছিল টাইগাররা, সেই ঐতিহাসিক দিনে ভারতের এক নামী বাংলা দৈনিকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। লেখার উপজীব্য ছিল, ‘বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, মানে যে মাঠে টেস্ট অভিষেক হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের, সেই মাঠে জাগমোহন ডালমিয়ার একটি স্তম্ভ তৈরি করা উচিৎ ছিল।’

সেই লেখার ধরণ ও পরিবেশনায় তৈরি হয়েছিল বড় ধরনের বিতর্ক। যত বন্ধু আর ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কই থাকুক না কেন, একটি দেশের মূল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে (তখন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটও হতো) ভিন্ন আরেক দেশের ক্রিকেট বোর্ড প্রধানের স্তম্ভ স্থাপন অনেকটাই অযাচিত দাবি। তাই ওই লিখনী সে সময় বড় ধরনের বিতর্ক ছড়িয়েছিল।


 


ADVERTISEMENT
সে সময়ের বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পক্ষ থেকে ওই ভারতীয় রিপোর্টারের কাছে তার লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে প্রতিবাদ জানানোও হয়েছিল।

তার লেখার ভাষা, পরিবেশনা ও শিরোনাম- বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তবে মূল ভাবটা কিন্তু মোটেই অমুলক ছিল না। ওই লেখক বোঝাতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের টেস্ট খেলুড়ে দেশের মর্যাদা লাভ, দেশের মাটিতে ক্রীড়াকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে টেস্ট অভিষেকের সুযোগ পাওয়া এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে টেস্ট যাত্রার শুরুতেই জিম্বাবুয়ের মত ছোট-খাট দল নয়, একদম ভারতের মত বিশ্ব শক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়া- এ সব কিছুতেই জগমোহন ডালমিয়ার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও বিরাট অবদান।

এ কথাকে ভুল, মিথ্যে ও বানোয়াট ভাবার কোনোই কারণ নেই। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে জগমোহান ডালমিয়া বিসিসিআই ও আইসিসির প্রেসিডেন্ট না থাকলে বাংলাদেশের ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া কঠিন ছিল। দেশের মাটিতে অভিষেক টেস্ট খেলার সুযোগ এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারতকে পাওয়াও হয়তো সম্ভব হতো না।


 
এখনকার প্রজন্মের কাছে বিষয়টি হয়ত অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে; কিন্তু এটা ঐতিহাসিক সত্য যে বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা লাভ, দেশের মাটিতে দেশের ক্রীড়াকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াসে অভিষেক টেস্ট ম্যাচ ভারতের সাথে খেলার সাথে একজন ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের নাম অঙ্গাঅঙ্গি ও নীবিঢ়ভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি হলেন জগমোহন ডালমিয়া।


বাংলাদেশ যখন টেস্ট স্ট্যাটাস পায় এবং ২০০০ সালের নভেম্বরে (১০-১৪ নভেম্বর) ভারতের সাথে অভিষেক টেস্ট ম্যাচ খেলে, তখন ভারতীয় ক্রিকেটের এ সর্বময় কর্তা বিসিসিআইয়ের পাশাপাশি যে আইসিসিরও কর্ণধার! তার ব্যক্তিগত ইচ্ছে, আন্তরিকতার কারণেই বাংলাদেশ ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পেয়েছিল।

শুধু তাই নয়, জগমোহন ডালমিয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টায় অভিষেক টেস্ট ম্যাচে প্রতিপক্ষ দল হিসেবে পেয়েছিল ভারতকে। সন্দেহ নেই বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির প্রসঙ্গ উঠলেই দুটি নাম, দু’জন সংগঠক ও ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ মানুষের ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে।


 
একজন বর্তমান সরকারি দলের সাংসদ ও বিসিবির সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এবং অন্যজন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ও নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেট সংগঠক, এশীয় ক্রিকেট কাউন্সিল এসিসির সাবেক প্রধান নির্বাহী সৈয়দ আশরাফুল হক।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সাবের হোসেন চৌধুরী তখন বিসিবি প্রধান। আর সৈয়দ আশরাফুল হক সে সময় বিসিবির সাধারণ সম্পাদক। সন্দেহ নেই, প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে পাকিস্তানকে হারিয়ে হই চই ফেলে দেয়া ছিল টেস্ট মর্যাদা লাভের প্রথম পূর্বশর্ত।

এর সাথে সাবের হোসেন চৌধুরী আর সৈয়দ আশরাফুল হকের ক্রিকেট কুটনীতি, আইসিসি, বিসিসিআই, পিসিবি, লঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড এবং অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকান বোর্ডের সাথে সু-সম্পর্ক সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।


 
তারপরও বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা লাভের পিছনের এবং মূল সহায়ক শক্তিই জগমোহন ডালমিয়া। আইসিসির চূড়ান্ত অনুমোদনে জগমোহন ডালমিয়ার ভূমিকা ছিল অপরীসিম। তার অবদানও ছিল প্রচুর।

মোটা দাগে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে দু’দলের ১১+১১ = ২২ ক্রিকেটারের পাশাপাশি আরও একটি নাম উচ্চারিত হয়েছে, সেটা জগমোহন ডালমিয়ার। আর এবার ১৯ বছর পর ভারতের কলকাতার ইডেন গার্ডেনে মুমিনুল হকের বাংলাদেশের সাথে বিরাট কোহলির ভারতের ঐতিহাসিক টেস্টের আগে উচ্চারিত হচ্ছে সৌরভ গাঙ্গুলির নামও।

কারণ একটাই, জগমোহন ডালমিয়া বাংলাদেশের টেস্ট খেলার পথ সুগম করে দিয়েছিলেন। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড প্রধান আর বিশ্ব ক্রিকেটের অধিপতি হিসেবে নিজের ক্ষমতা ও সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে জনমত তৈরি অন্য টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট যাত্রার সূচনায় রেখেছিলেন অবিনস্মরনীয় অবদান।

এবার কলকাতার আরেক নামী ও বরেণ্য ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব সৌরভ গাঙ্গুলি বিসিসিআইয়ের নতুন প্রধান হয়ে তার নিজ শহর কলকাতার ইডেন গার্ডেনে টাইগারদের সাথে ভারতীয়দের প্রথম টেস্টকে স্মরণীয় করে রাখার সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করেছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি দু’দেশের ক্রিকেট হর্তা-কর্তাদের আমন্ত্রণ এবং এ ম্যাচকে বর্ণিল করতে দিবা-রাত্রির গোলাপি বলে খেলা অনুষ্ঠানেরও উদ্যোক্তা সৌরভ গাঙ্গুলি। মোটকথা, কলকাতায় আগামী ২২ নভেম্বর থেকে অনুষ্ঠেয় টেস্টের আকর্ষণ বাড়াতে যা যা করা প্রয়োজন, সৌরভ গাঙ্গুলি তাই করছেন।


 
মুমিনুল হক, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহীম, রোহিত শর্মা চেতেশ্বর পুজারা, মায়াঙ্ক আগরওয়াল, আজিঙ্কা রাহানেদের পাশাপাশি কলকাতা টেস্টের আগে সৌরভ গাঙ্গুলির নামও সবার মুখে মুখে।

ডালমিয়া বাংলাদেশে কেমন অভিন্দনে সিক্ত হয়েছিলেন, বাংলাদেশের বন্ধু ও অতিথিপ্রবণ মানুষ ডালমিয়াকে কেমন কৃতজ্ঞাতায় বেঁধে রেখেছিলেন, তা তিনি খুব ভাল দেখেছেন, জানেন। কারণ, বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০০০ সালে নভেম্বরে অভিষেক টেস্টে ভারতের অধিনায়ক ছিলেন মহারাজ সৌরভ গাঙ্গুলি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগি-ভক্তরা ডালমিয়াকে ভালবাসায় সিক্ত করার পাশাপাশি কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন।

এবার ওপার বাংলার ক্রিকেটের কর্ণধার হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটের অধিপতি হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ইডেন টেস্টকে সাদা-কালো থেকে রঙ্গিন করতে পারলে তার প্রতিও বাংলাদেশের মানুষের অন্যরকম ভালবাসা জন্মাবে।

বাঙ্গালী হিসেবে একটা ভাললাগা, ভালবাসাতো আছেই। এর বাইরে একজন বিশ্বমানের সফল উইলোবাজ আর সাহসী অধিনায়ক হিসেবেও বাংলাদেশের ক্রিকেট সমাঝদাররা মহারাজ সৌরভকে অন্য পাল্লায় মাপেন। তার কদর করেন। এর বাইরে এবার বিসিসিআইয়ের প্রধান হয়েও বাংলাদেশের মানুষের এবং ক্রিকেট অনুরাগিদের কাছেও একটা অন্যরকম ইমেজ তৈরি করতে আগ্রহী সৌরভ। এ আয়োজন সফল হলে ডালমিয়ার মতো তার নামটিও জাগরুক থাকবে এ দেশের ক্রিকেট সমর্থকদের হৃদয়ে।

সে লক্ষ্যেই কি এমন আপ্রাণ প্রচেষ্টা বিসিসিআই চেয়ারম্যান সৌরভের?