ঠাকুরগাঁওয়ে তানজিনার বিয়ের দিন ঠিক করা হলো না

ঠাকুরগাঁওয়ে তানজিনার বিয়ের দিন ঠিক  করা হলো না

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি : বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হলো না তানজিনার। ২০ জুন তানজিনার বিয়ের দিন ঠিক হওয়ার কথা ছিল। এ জন্য সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয় সে। যাওয়ার কথা ছিল নিজ কর্মস্থল সদর উপজেলার তেলীপাড়ায় ঠাকুরগাঁও গ্রামীণ চক্ষু      হাসপাতালে। তার আগে বাবা আব্দুল হামিদকে বলেছিল, যৌতুক দিয়ে বিয়ে করবে না সে। শুভ দিনের তারিখ নির্ধারণ করার আগেই প্রাণ কেড়ে নিলো জীবন নামে এক বখাটে। তানজিনার অপরাধ ছিল যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করা। ৭ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ২৭ জুন সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মাদ্রাসাপাড়ার আব্দুল হামিদের মেয়ে তানজিনা আক্তার।

সে গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতালের সেবিকা হিসাবে কর্মরত ছিল। ২০১৭ সালে বগুড়া গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতাল থেকে বদলি হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে যোগদান করেন। ভাই বোনদের মধ্যে ছোট হওয়ায় সকলের আদরের ছিল তানজিনা। বাড়িতে নামাজ ও ধর্মীয় বই পড়া আর গৃহের কাজে মাকে সহযোগিতা করতো তানজিনা। সদর উপজেলার    সালন্দর মাদ্রাসাপাড়ার তানজিনার বাড়িটি এখন নীবর নিঃস্তব্দ। আর পুরো এলাকা শুনশান। তানজিনার ঘরে ঢুকেই ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে তার বাবা আব্দুল হামিদ। যে ঘরে শুয়ে থাকত তানজিনা, তার বিছানায় পড়ে আছে নামাজ পড়া জায়নামাজটি আর ধর্মীয় গ্রন্থ। কম্পিউটারের টেবিলও যেন পাথর হয়ে আছে। যে মেয়েটি বাড়িটিকে সব সময় আগলে রাখতো, এখন তার অবর্তমানে নীরব, শুনশান। ২০ জুন বাড়ি থেকে বের হয়ে কর্মস্থল গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতালে যাচ্ছিল তানজিনা। ওই দিন তার বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হওয়ার কথা ছিল। চক্ষু হাসপাতালের এক ইঞ্জিনিয়ার ছিল তার বিয়ের ঘটক। কথাবার্তাও প্রায় শেষ করেছে। ওই ইঞ্জিনিয়ারের স্বজনের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা তার। এতে পরিবারের সবার সম্মতিও ছিল। ডিউটি পালন ও বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক ঠাক করতে রওনা হয় কর্মস্থলে। কিন্তু বখাটে আরমান হোসেন জীবন পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাত, বুক ও পিঠে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। হাত, বুক, পিঠ ও পেটের একাধিক স্থানে ক্ষত হয়। এতেই ওই বখাটে ক্ষান্ত থাকেনি। ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে রক্তাক্ত কাপড় পরিবর্তন করে পুনরায় ঘটনাস্থলেই আসে সে। এরপর মাটিতে পড়ে থাকা রক্ত পানিতে ধুয়ে ফেলারও পরামর্শ দেন বলে জানায় স্থানীয়রা।
এদিকে রক্তাক্ত তানজিনাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে পরদিন ২১ জুন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ ৭ দিন মৃত্যু যন্ত্রণায় ভুগে অবশেষে বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) মারা যান তানজিনা। ওই দিন সন্ধ্যায় মরদেহ বাড়িতে আনলে হৃদয় বিদারক পরিবেশ বিরাজ করে। তার মৃত্যুতে ক্ষোভে ফুসে উঠেছে এলাকাবাসী। সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানান স্বজন, সহকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।তানজিনার বাবা আব্দুল হামিদ বলেন, এক সময় তার মেয়ে জীবনকে পড়াতো। জীবন এলাকার কয়েকজন স্কুলের মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতো। ওই মেয়েরা তার মেয়েকে বলেছে। তাই তানজিনা সতর্ক করে দেয়ার জন্য জীবনকে শাসন করেছে। এরই জেরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তানজিনাকে রক্তাক্ত করে। তানজিনার ভাই সোহেল রানা বলেন, জীবন নেশাও করতো। যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় তার বোনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার চাই।

উদীচী ঠাকুরগাঁও জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের না হলে এভাবেই ঝরে যাবে অনেক প্রাণ। তাই দ্রুত বিচার আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি। অন্যথায় সাধারণ মানুষকে নিয়ে বিচার দাবিতে রাস্তায় নামা হবে। এদিকে ২০ জুন এ ঘটনায় তানজিনার বাবা বাদী হয়ে হত্যার চেষ্টা মামলা দায়ের করলে ওই দিনই পুলিশ গ্রেফতার করে আরমান হোসেন জীবনকে। তানজিনার মৃত্যুর পর জীবনের অভিভাবকরাও বাড়িতে তালা লাগিয়ে গাঢাকা দিয়েছে। শুক্রবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঠাকুরগাঁও থানার এসআই জামান বলেন, আসামি আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে বলা সম্ভব হবে তানজিনা হত্যার আসল উদ্দেশ্য । অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার জীবনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে খুব দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে।