টেকসই উন্নয়নে দক্ষ শ্রমশক্তির অবদান

টেকসই উন্নয়নে দক্ষ শ্রমশক্তির অবদান

আব্দুল হাই রঞ্জু  : বেকারত্ব দুরিকরণে প্রয়োজন কর্মসংস্থান। সরকারি কিম্বা বেসরকারি যে কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি কিম্বা বেসরকারি বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্ব  রয়েই গেছে। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। যাদের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের দ্বার খুবই সংকুচিত।
ফলে শিক্ষা অর্জন শেষে সনদ নিয়ে ঠাঁই বসে থাকতে হচ্ছে। যারা মূলত সরকারি চাকুরির আশায় ধরনা দিয়ে থাকেন। বেসরকারি খাতে কাজের আগ্রহ উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে একেবারেই কম। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১৬ লাখ কর্মক্ষম মানবসম্পদ শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও যাদের ভাগ্যে চাকুরি যেন ‘সোনার হরিণ’। যদিও দেশের অর্থনীতি তুলনামূলক সমৃদ্ধ অর্থাৎ আগের চেয়ে এখন দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা। তবুও কেন কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে না? এমন প্রশ্ন অনেকেরই। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রবাসী রেমিট্যান্স, তৈরি পোশাক খাত, বস্ত্র খাত, চামড়া খাত ও ঔষুধ শিল্পের রফতানি আয়ের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়ছে।

আবার বিদেশি ঋণ, বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তা, দেশীয়ভাবে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের কারণে সরকারি কোষাগার অনেকটাই সচ্ছল। ফলে দেশে নানা খাতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়স হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে যা দেখে মনে হয়, দেশ এখন অর্থনীতিতে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা না বাড়লে এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা না আসলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সচ্ছলতা থাকলে প্রকৃত অর্থে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছে, এ কথা বলা সঠিক হবে না। দেশের শুটিকতক মানুষের হাতে প্রচুর পরিমাণ অর্থ মজুদ আছে, যা সত্য। খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফে স্বীকার করা হচ্ছে, কোটি টাকা আমানতকারীর সংখ্যা এখন প্রায় ৫৯ হাজার। এ সংখ্যায় প্রমাণ করে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়েনি। একটু খেয়াল করুন, মফস্বল শহর, নগর, মহা-নগরে এখন থরে থরে জৌলুসে ভরা বিপণি বিতান কিম্বা দোকানে দোকানে পণ্যের সম্ভার সাজিয়ে ব্যবসায়ীরা বসে আছেন, কিন্তু বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলক কম। দোকানদারদের হাঁক ডাকেও ক্রেতার সন্ধান মেলা ভার। অর্থাৎ যে হারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারিত হয়েছে, সে হারে ক্রেতার সংখ্যা বাড়েনি। অর্থাৎ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা যে বাড়েনি, এগুলোই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। অথচ কর্মসংস্থান উপযোগী বিনিয়োগ বাড়লে বেকারত্বের  সংখ্যা কমে আসতো। আর বেকারত্ব কমলে আয়বর্ধক মানুষের সংখ্যাও বাড়তো। অর্থাৎ ক্রয় ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।


২০১৫-১৬ অর্থ বছরের পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা এখন ২৬ লাখ। আবার বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশে প্রতি বছর নুতন করে ২২ লাখ কর্মক্ষম শিক্ষিত মানুষ শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে। এদের মধ্যে কাজ পায় ৭ লাখ, বাকি ১৫ লাখ বেকারই থেকে যায় অর্থাৎ প্রতিবছরই বিপুল সংখ্যক মানুষ বেকারই থেকে যায়। আবার বিশ^ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এ হিসাবে বেকারের সংখ্যা ২ কোটি ২ লাখ। বেকারত্বের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০১৫ সালে এক গবেষণা চালায়। সে গবেষণায় সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। তাদের মতে, গোটা বিশে^ বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছে এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। হয়ত বাংলাদেশে বেকারত্বের সংখ্যা নিয়ে মতদ্বৈততা থাকতে পারে, বাস্তবে যে বাংলাদেশে প্রতিবছরই বেকারত্বের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, তা স্বীকার করতেই হবে।

খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেকারত্বের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। এর মধ্যে শিক্ষিত বেকার হচ্ছে দুই কোটি ২০ লাখ। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, প্রতিবছর দেশে প্রায় ২০ লাখ কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে দক্ষ মানুষ হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২০০ জন। বাকি সবাই অদক্ষ। তাদের মধ্যে ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি থাকলেও কারিগরি দক্ষতা নেই। ফলে তারা চাকুরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না। অর্থাৎ সীমিত সংখ্যক দক্ষ জনশক্তির কাজের সুযোগ সৃষ্টি হলেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষিতরা থেকে যাচ্ছে বেকারের তালিকায়। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ শিক্ষায় সনদ প্রাপ্তরা শিল্পের উৎপাদন বিপণন পর্যায়ে চাকুরির চেয়ে টেবিল চেয়ারে সরকারি কিম্বা ব্যাংকে চাকুরি করতে বেশি আগ্রহী। কিন্তু চাকুরির বাজারের চিত্র বলতে গেলে সম্পূর্ণটাই ভিন্ন। যেমন একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে যদি ১০ জন কর্মকর্তার প্রয়োজন হয়, পক্ষান্তরে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন পড়ে ৯০ জনের। অথচ আমাদের দেশে দক্ষ জনবলের খুবই সংকট।

সে সংকট মোকাবিলা করতে শিল্প উদ্যোক্তারা বাড়তি বেতনে বিদেশিদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সংগত কারণে সাধারণ শিক্ষা অর্জন করে সহসাই চাকুরি মিলছে না। ফলে প্রতিনিয়তই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলা করতে হলে দেশীয়ভাবে স্থাপিত শিল্প সহায়ক শিক্ষা অর্জন করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। এজন্য টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ হাতে কলমে কারিগরি শিক্ষার দ্বার আরো সম্প্রসারিত করতে হবে। সরকারিভাবে এমন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যেন শিক্ষার্থীরা বৃত্তি সহ নানা সহায়তার কারণে সাধারণ শিক্ষা গ্রহণের চেয়ে কারিগরি শিক্ষার দিকে বেশি করে ঝুঁকে। শুধু দেশের বাজারেই নয়, বিদেশেও চাকুরির দ্বারকে প্রসারিত করে বেশি রেমিট্যান্স আহরণ করতে হলে দক্ষ মানবশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। শত প্রতিকুলতার মাঝেও সরকারিভাবে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হলেও প্রকৃত অর্থে এখনও শিক্ষা খাতের বরাদ্দ তুলনামূলক বেশি নয়। আবার শিক্ষা অর্জনে বৈষম্য একটি প্রকট সমস্যা। শিক্ষার উপকরণ, শিক্ষা গ্রহণের খরচও এখন অনেক বেশি। যদিও সরকার প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনামুল্যের বই বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। এটিকে আরো উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্প্রাসারিত করতে হবে অর্থাৎ বিনামূল্যে বই বিতরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়তি টিউশন ফিয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষা বিমুখ না হয়, সে দিকটিকেও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মাঝে সন্তোষজনক বৃত্তি প্রদান, বিনামূল্যের বই ও উপকরণ বিতরণের মতো কর্মক্ষেত্রকে আরো বিকশিত করতে হবে।


স্মরণ রাখতে হবে, ছোট্ট ভূ-খন্ডের বাংলাদেশে বিপুল জনশক্তিই আমাদের মানবসম্পদ। এই মানবসম্পদকে দক্ষ মানবশক্তিতে রূপ দেয়া সম্ভব হলে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা কঠিন হবে না। কারণ আমাদের দেশের শিক্ষিত, আধা শিক্ষিত, কর্মক্ষম হাতগুলো চায় শুধু কাজ আর কাজ। সে কাজ দেশের মাটিতে না হয়ে বিদেশেও হলে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে হলেও পাড়ি জমাতে চান। যারা বিদেশেও যাচ্ছেন, কিন্তু দক্ষতার অভাবে ভাল মানের বাড়তি বেতনের কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে পারছেন না। ফলে বিদেশে কর্মি যাওয়ার সংখ্যা বাড়লেও আশানুরূপ রেমিট্যান্স দেশে আসছে না। এতে প্রবাসীদের পরিবার ও দেশ উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে হাতে কলমে কারিগরি শিক্ষার দ্বারকে প্রসারিত করতেই হবে। আগেই বলেছি, আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষিতরা চেয়ার টেবিলে বসে চাকুরী করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অথচ সরকারিভাবে বিপুল পরিমাণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর চাকুরীর সুযোগ খুবই সীমিত। স্বস্তির খবর, সরকারের তরফে সরকারিভাবে খালি থাকা প্রায় সাড়ে তিন লাখ শূন্য পদে জনবল নিয়োগ দেয়া হবে মর্মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেন। অবশ্যই সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাতে হবে। দেরিতে হলেও সরকার শূন্যপদে বিপুল সংখ্যক জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের কারণে কিছুটা হলেও উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকার মাঝে মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধি করে। যেখানে দেশে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত জনশক্তি বেকার বসে থাকে, সেখানে সরকারি চাকরির বয়সসীমা কোনভাবেই বাড়ানো উচিৎ নয় বলে আমরা মনে করি। উল্টো উচ্চ শিক্ষিত মেধাবীদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দিলে কাজের গতি বাড়বে, এতে দেশের মানুষের সেবার ক্ষেত্রগুলোও প্রসারিত হবে।

উপসংহারে শুধু এটুকুই বলতে চাই, বেকারত্ব আমাদের দেশে বড় ধরনের অভিশাপ। এ অভিশাপকে মোচন করতে হলে কর্মসংস্থানের দ্বারকে প্রসারিত করতে হবে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি ভাবে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্প কল-কারখানা গড়ে উঠলে উচ্চ শিক্ষিত, আধা শিক্ষিত, নর-নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বেকারত্ব দুরিকরণ করতে না পারলে বাহ্যিকভাবে হয়ত দেশে জৌলুস বাড়ানো যাবে সত্য, কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষের আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে না।  
 লেখক : প্রাবন্ধিক   
০১৯২২-৬৯৮৮২৮