জয়ের মিশন নিয়ে নির্বাচনী মহাপরিকল্পনা আওয়ামী লীগের

জয়ের মিশন নিয়ে নির্বাচনী মহাপরিকল্পনা আওয়ামী লীগের

মাহফুজ সাদি: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মিশন নিয়ে নির্বাচনী ‘মহাপরিকল্পনা’ চূড়ান্ত করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৮ সালেই নির্বাচন হওয়ার কথা সামনে আসায় সেপ্টেম্বর থেকেই পুরোদমে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু হবে। সেই সাথে নতুন বছরের শুরুতেই অর্ধ ডজন সিটি নির্বাচন থাকায় শেষ জানুয়ারি থেকে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নামবে দলটির সাংগঠনিক টিম। জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি নির্বাচনকে ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। আওয়ামী লীগের এতোধিক নেতা দৈনিক করতোয়াকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নেতৃত্বে প্রস্তাবনা আকারে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ শেষ করেছেন। এমন একটি প্রস্তাবনা দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও করা হয়েছিল। এবারের প্রস্তাবনাটি আগেরটার চেয়ে কিছুটা ভিন্নতর হচ্ছে। জানুয়ারির যে কোন সময় এটি দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপন করা হবে। তার নির্দেশনা অনুযায়ী মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হবে।

জানুয়ারিতেই মাঠে নামছে সাংগঠনিক টিম

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে সময়ের বিন্যাসে দুই ধাপে সাজানো হচ্ছে নির্বাচনী পরিকল্পনা। প্রথম ধাপে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় ধাপে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ধরা হয়েছে। প্রথম ধাপের ৮ মাসে দলকে নির্বাচন উপযোগী করে নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হবে। তৃণমূলে দলের ঐক্য ও নেতৃত্ব সুসংহত করে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা, বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন সফলতা তুলে ধরা, বিএনপি জোটের নেতিবাচক কর্মকান্ড তুলে ধরা, তৃণমূলের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে মতামত ও জরিপের ভিত্তিতে সম্ভাব্য প্রার্থীর পক্ষে জনমত গড়া হবে। এজন্য নতুন বছরের শুরু থেকেই সারাদেশে সাংগঠনিক সফর শুরু করবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাড়াও সভাপতিমন্ডলীর ১৫ সদস্যের নেতৃত্বে কমপক্ষে ১৫টি গ্রুপ তৃণমূল পর্যায়ে জনসংযোগে অংশ নেবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে কে কোথায় যাবেন, তার তালিকা দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর নেতারা নির্দিষ্ট জেলা ও উপজেলা সফরে যাবেন। রোববার শিল্পকলা একাডেমিতে ‘বিএনপি-জামায়াতের অগ্নি সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের খন্ডচিত্র প্রদশর্নী ও সেমিনারের আয়োজন করে দলের প্রচার ও প্রকশনা উপ-কমিটি। এতে আওয়ামী লীগের নেতাদের পাশাপাশি অগ্নিসন্ত্রাস ও নৈরাজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মাইশার মা ও নুরুজ্জামানের স্ত্রী মাফরুহা বেগম, ট্রাক ড্রাইভার পটল মিয়া, পুলিশ কনেস্টেবল মোর্শেদ আলম, আলু ব্যবসায়ী রেজাউল করিম, সেলসম্যান মোশাররফের স্ত্রী লাভলী আক্তারও কথা বলেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে এই প্রচার-প্রচারণা তুলে ধরতে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ও নেতাকর্মীদের আহ্বান জানান আওয়ামী লীগ নেতারা। সূত্রমতে, শিগগিরই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটিই নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করবে। সেই সঙ্গে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের উদ্যোগও থাকবে।

এছাড়া দেশজুড়ে পোলিং এজেন্টদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনামলে বিভিন্ন খাত ও দিকের মধ্যে তুলনা করে পোস্টার প্রকাশনারও চিন্তা রয়েছে। এদিকে নতুন বছরের প্রথম ভাগেই রাজধানী ঢাকার দুটিসহ অর্ধ ডজনের বেশি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে এই ভোটে জয় নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে চায় আওয়ামী লীগ। পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভাগীয় শহরগুলোতে সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তফসিল ঘোষণার পর যেহেতু আইনিভাবে তার সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই, তাই তফসিল ঘোষণার আগেই এই সফর শেষ করবেন তিনি। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয় বলে নিশ্চিত করেছেন বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এ সফর শুরু হবে। পাঁচ সিটিতে সফর শেষ করে এর বাইরে আরও তিন বিভাগীয় শহর রংপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহেও যাবেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে যেসব সিটি করপোরশনে ভোট হবে, যেসব এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের গণসংযোগ নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে কথা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে উপ-নির্বাচন নিয়েও। শেখ হাসিনা বলেন, তফসিল ঘোষণার পরে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবেন। তবে যাকে সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে সেই আতিকুল ইসলামকে মানুষের দরজায় দরজায় যেতে হবে।

২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট হয়। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই চার সিটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিক প্রার্থীরা জিতলেও আওয়ামী লীগ আমলের ভোটে হেরে যান দল সমর্থিত প্রার্থীরা। এরপর একই বছরের ৬ জুন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান থাকা গাজীপুরেও হেরে যান আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা আরও জানান, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি দল গোছানোর কাজও অব্যাহত রাখা হবে নতুন বছরে। বছরের শুরু থেকে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা বেরিয়ে পড়বেন সারাদেশ সফরে। এই সময়ে তারা দলের অনৈক্য দূর করা ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কন্নোয়নের প্রতি গুরুত্ব দেবেন। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী জানান, নতুন বছরে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সফরে যাবেন। তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেও জনগণের পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে যেসব জেলা এবং উপজেলায় যাননি, তার সফরের তালিকায় সেই সব জেলা ও উপজেলা প্রাধান্য পাবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, নতুন বছরে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য একটাই তাহলো নিরঙ্কুশ বিজয়। টানা তৃতীয়বার দলকে ক্ষমতায় আসীন করতে কাজ করবেন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে দলকে প্রস্তুত করাই আমাদের নতুন বছরের টার্গেট। এজন্য দলকে আরও জনসম্পৃক্ত করা হবে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন- সমৃদ্ধি জনগণের মাঝে তুলে ধরা, বিএনপি-জামায়াত জোটের সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা, লুটপাট-দুর্নীতি ও নেতিবাচক কর্মকান্ড জনগনের মধ্যে তুলে ধরাই হবে আওয়ামী লীগের নতুন বছরের টার্গেট।