জয়নাবের ঘটনায় বদলাচ্ছে পাকিস্তানের লজ্জার সংস্কৃতি

জয়নাবের ঘটনায় বদলাচ্ছে পাকিস্তানের লজ্জার সংস্কৃতি

করতোয়া ডেস্ক : জানুয়ারির ৪ তারিখে সেকেন্ড গ্রেডের এক বাড়ির কাজের খাতায় জয়নাব আমিন লিখেছিলো, আমি একটি মেয়ে। বয়স সাত বছর। আমি কাসুরে বাস করি এবং আম খেতে পছন্দ করি। পরদিন সকালে এক আন্টির বাসায় কোরআন পড়তে যাওয়ার সময়ই নিখোঁজ হয় জয়নাব। পাঁচদিন পরে ময়লার ভাগাড়ে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার শরীরে লেগে থাকা মাটি, আঘাতের চিহ্ন আর রক্ত থেকে ধারণা করা হয় তাকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে। জয়নাব নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার আগেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে অসংখ্যবার। তাই পাকিস্তানের এই শহরটি শিশু নির্যাতনের রাজধানী হিসেবেও পরিচিত অনেকের কাছে। পাকিস্তানের সমাজ খুবই রক্ষণশীল একটি মুসলিম সমাজ। কিন্তু সেখানে শিশু নির্যাতন খুবই সাধারণ ঘটনা।

এবং কখনোই কেউ সেই বিষয়গুলো সামনে আসেনি। পাকিস্তানের গ্রাম্য সালিশে বেশিরভাগ সময়ই ধর্ষণের শিকার নারীকেই জেল জরিমানা করা হয়। এবং যতক্ষণ না খবরের কাগজে সংবাদটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় ততক্ষণ সেটা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না কর্তৃপক্ষ। এর আগে চলমান মি টু ক্যাম্পেইনের মতো জয়নাবের ঘটনাও সবাইকে নাড়া দিয়ে গেছে। খবরের কাগজে সংবাদ প্রকাশিত হয়, পাকিস্তানের লজ্জা নামে। এমনকি জাস্টিস ফর জয়নাব হ্যাশট্যাগও ভাইরাল হয় ইন্টারনেট দুনিয়ায়। কিন্তু পাকিস্তানের সরকারি স্কুলগুলোতেও যৌন শিক্ষা দেওয়ার বিষয়ে বিতর্ক চলছে এখনও। তবে জয়নাবের ঘটনায় এখন বদলাচ্ছে ইতিহাস, বদলাচ্ছে পাকিস্তানের লজ্জার সংস্কৃতি। বয়স্ক মানুষদের হাতে যৌনভাবে হেনস্তা হওয়ার গল্প তুলে ধরছেন পাকিস্তানের অনেক সেলিব্রেটি।

 ফলে জয়নাবের মামলা নিয়ে নড়েচড়ে বসছেন কর্তাব্যক্তিরা। এই প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়েছে, কাসুরের পুলিশ প্রধানকে চাকরি থেকে বহিস্কার করা হয়েছে এবং অপরাধীর ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারলে ১০ মিলিয়ন রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ফ্রিয়েহা আলতাফ নামে এক জনসংযোগ তারকা টুইটারে বলেন, কোনো নির্যাতনের শিকার হওয়াটা লজ্জার নয়। ৬ বছর বয়সে বাসার রাধুনির দ্বারা নির্যাতনের শিকার হই আমি। আর সেটাই আমাকে সারাজীবন ভয়ে রেখেছে। পরিবারের চাপেই নির্যাতনের শিকার অনেকে চুপ হয়ে যান বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফ্যাশন ডিজাইনার মাহিম খানও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বলেন, তাকে কোরআন পড়াতে আসতো এমন এক মুসলিম ব্যক্তির দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন তিনি। দিনের পর দিন আমি ভয়ে অস্থির হয়ে ছিলাম। তিনি সবাইকে আহ্বান জানান, সমাজ হয়ে নির্যাতনের শিকার শিশুটির দিকে তাকান। বাবা মায়ের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, সন্তানের কথা শুনুন, তাদের শেখান, সচেতন করুন, খোলামেলা তাদের সঙ্গে কথা বলুন- কোনটা ঠিক আর কোনটা নয়। জয়নাবের মৃত্যুর পরই ফুঁসে উঠেছে পাকিস্তানের কাসুর। তবে এমন ঘটনা এই প্রথম নয়, এর আগেও এই ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটেছে। পাকিস্তানের অন্তত ৩০০ জন শিশুকে পর্ন ভিডিওতে ব্যবহার করেছে একটি চক্র। কিন্তু এই বিষয়ক মামলাগুলোর বেশিরভাগেরই কোনো ফলাফল আসেনি। দুস্কৃতিকারীরা বার বার মুক্তি পেয়ে যায়, আবার শুরু করে অপকর্ম।

 সেখানকার মানবাধিকার কর্মীরা বরাবরই দায়িত্বরতদের অবহেলার অভিযোগ তুলে আসছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা তথ্য দিতে রাজি হয় না, পুলিশকে কোনো তদন্ত করতে অনুৎসাহিত করা হয় এবং নির্যাতনকারীদের মুক্ত করে দেওয়া হয় এমন অভিযোগ তাদের। সারাদেশই জয়নাবের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, শুধুমাত্র শাস্তিই পারে এসবের পুনরাবৃত্তি কমাতে। একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মানিজেহ বানো। তার দলটি শিশু নির্যাতন নিয়েই কাজ করে। জয়নাবের আগেও আরো প্রায় ২৮০ শিশু পর্ন ভিডিওতে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই কোনো অভিযোগ তোলেনি। তারপরও অন্তত ১০০ শিশু অভিযোগ নিয়ে আসে। কিন্তু কাসুরে একটি শক্তিশালী দল নির্যাতনকারীদের এই শক্তিশালী চক্রটিকে প্রতিরক্ষা করে চলেছে। সেই চক্রটা না ভাঙলে এই সমস্যার সমাধান আনা খুব কঠিন হবে বলে জানান তিনি। তবে জয়নাবের ঘটনায় এখনো নিরাপত্তা বাহিনীর অবহেলার অভিযোগ উঠেই যাচ্ছে। শিশুটি হারিয়ে যাওয়ার পরও তাকে খোঁজার ব্যাপারে কোনো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া লোকটির চেহারা দেখেও তাকে গ্রেফতারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এসব ঘটনায় সমাজ প্যানিক হয়ে উঠছে, মানুষ অনিরাপদ বোধ করছে, শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিষয়টি তাই হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগই নাই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।