জ্ঞানের ডানায় স্বপ্ন মেলো

জ্ঞানের ডানায় স্বপ্ন মেলো

আতাউর রহমান মিটন:বাংলাদেশের দুটো উপজেলা থেকে প্রায় এক হাজারের মত কৃতী শিক্ষার্থী যারা ২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উন্নীত হয়েছে তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে পোষ্টকার্ডে চিঠি লিখে তাদের স্বপ্নের কথা জানিয়েছে। অনেকগুলো জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকা গুরুত্বের সাথে সংবাদটি প্রকাশ করেছে। স্বেচ্ছাব্রতী যুব সংগঠন ইয়ূথ এগেইনস্ট হাঙ্গার আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল কর্মসূচিটি অনেক শিক্ষার্থীর মনে প্রেরণা যুগিয়েছে বলেই আমি আজ সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করছি।
আয়োজকদের মতে, আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে তা যেহেতু নির্ভর করে আজকের ছেলেমেয়েরা কি স্বপ্ন দেখছে তার উপর, তাই তাদের মনে স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা ও সেই স্বপ্ন জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ছেলেমেয়েরা আজকাল স্বপ্ন দেখতেও ভুলে গেছে। তারা স্বপ্ন দেখে না, কেবল নির্দেশ পালন করে। যে কোন শিক্ষার্থীকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও, তাহলে উত্তর দিবে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। এই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নটা সত্যিকার অর্থে তার নিজের নয়, এটা তার পরিবারের বাবা-মা বা অভিভাবকদের চাওয়া। অভিভাবকেরা যা চান তাই তারা তাদের সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেন। সন্তানেরা যেন তাদের ইচ্ছা পূরণের এক একটা মেশিন! আয়োজকরা চান এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখতে শিখুক। তারা ভাবুক তারা কি হতে চায়। একজন মৃত মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারে না। সেজন্য স্বপ্নহীন মানুষকে মৃত মানুষের সমান হিসেবে তুলনা করা হয়ে থাকে। মানুষের জন্য যেহেতু স্বপ্ন দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ তাই এই কৃতী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন কি, বড় হয়ে তারা কি হতে চায় সেটা তাদের মনে গেঁথে দেয়া দরকার।
স্বপ্ন দেখলেই কি স্বপ্ন পূরণ হয়? স্বপ্ন পূরণের পথে তো বাধা অনেক। আর সে কারণেই স্বপ্নগুলো এবং স্বপ্ন পূরণের পথে বাধাগুলো তুলে ধরা দরকার। দেশের সকল নাগরিকের অভিভাবক হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই বাধাগুলো জানা প্রয়োজন। জনগণ বিশ্বাস করে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি যে কোন সমস্যা সহজেই সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারেন। যেমন, পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় একজন শিক্ষার্থী লিখেছে, ‘আমি বড় হয়ে একজন শিক্ষক হতে চাই। কিন্তু আমার বাড়িতে কোন বিদ্যুৎ সংযোগ নাই। আমার লেখাপড়া করতে কষ্ট হয়। যদি আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে খুব উপকার হতো’। ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের একজন শিক্ষার্থী লিখেছে আমাদের এই উপজেলা শহরে ভাল কোন লাইব্রেরী নেই। আমাদের বিদ্যালয়ের পাশে যদি একটা সুন্দর লাইব্রেরী করা যেত তাহলে আমরা সেখানে গিয়ে পড়তে পারতাম’। পঞ্চগড়ের একটি মেয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছে যে, তাদের স্কুলে মেয়েদের ব্যবহারের জন্য ভাল টয়লেট নাই। যেটা আছে সেটা সব সময় তালা দেয়া থাকে। অনেকেই আবার লিখেছে তাদের অর্থনৈতিক দৈন্য, পরিবারের স্বল্প আয়, শিক্ষার ব্যয়ভার বহনের কষ্ট, বাল্য বিবাহের ঝুঁকি, ইত্যাদি।
লক্ষ্য করলে দেখবেন এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা খুব ছোট ছোট সব সমস্যার কথা লিখেছে যা সমাধান করতে অনেক টাকার প্রয়োজন হয় না। এমনকি এর বেশিরভাগ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতার  প্রয়োজন নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদ এর চেয়ারম্যান, উপজেলা প্রশাসন কিংবা এমপি মহোদয় চাইলেই এ ধরনের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারেন। সরকার থেকে এদের সবাইকেই উন্নয়ন কাজের জন্য তহবিল বরাদ্দ দেয়া আছে। তারা যদি কেবল হৃদয়টা মেলে দিয়ে ছেলেমেয়েদের সমস্যাগুলো শোনেন এবং আন্তরিকভাবে সমাধানের চিন্তা করেন, উদ্যোগ নেন তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান করা সম্ভব। প্রশ্ন হতে পারে তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে লেখা কেন? এর উত্তর হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানানো যে তৃণমূলের বাস্তবতাটা কি এবং অন্যদেরকে বোঝানো যে তোমরা কিন্তু আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগী হচ্ছো না। এর বাইরেও একটা কারণ আছে আর সেটা হলো, আত্মবিশ্বাস তৈরি করা। আয়োজকরা মনে করেন এই শিক্ষার্থীরা কখনও ভাবেনি যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লেখা যায়। এই আত্মবিশ্বাস তাদের ছিল না। এখন এই চিঠি লেখার মাধ্যমে তারা অন্ততঃ এটুকু বুঝতে পারল যে, আমি চাইলে আমার সমস্যার কথা রাষ্ট্রের যে কোন ব্যক্তিকেই লিখে জানাতে পারি। এটা কোন অপরাধ নয়,বরং এর ফলে সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয় মনে ভরসা তৈরি করা, তাহলে এ ধরণের কর্মসূচিগুলো মনে ভরসা জাগিয়ে তুলতে দারুণভাবে সহায়ক। আমার তো মনে হয় দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের উচিত তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মনে স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে উৎসাহ দেয়া এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি বা অন্য যে কাউকে চিঠি লিখে তাদের স্বপ্নের কথা জানানো। সারাদেশের কৃতী শিক্ষার্থীরা, ক্ষুদে নেতারা, আগামীর প্রজন্মেরা কি ভাবছে, কি স্বপ্ন নিয়ে বড় হচ্ছে, কোথায় কিভাবে তাদের স্বপ্নগুলো আটকে যাচ্ছে, কেন হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নগুলো, সেটা জানা এবং প্রতিকারের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সরকার প্রধান বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কার কথা শুনবে, কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে বা কিভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবে সেটা তাদের বিষয়!
শিক্ষার উদ্দেশ্য কি? গাড়ি-ঘোড়ার মালিক হওয়া নাকি মনুষ্যত্ব অর্জন-এই প্রশ্নটা এখন আর কেউ মনে হয় করে না। সবাই জানে পরীক্ষায় ভাল নম্বর না পেলে ভাল কোথাও ভর্তির জন্য আবেদনই করা সম্ভব হবে না। তাই সবাই এখন ভাল নম্বরের জন্য মরিয়া। এতে দোষের কিছু নাই বলেই সবাই মনে করেন। কিন্তু গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস বলতেন শিক্ষার জন্য সবার আগে যেটা দরকার সেটা হচ্ছে প্রশ্ন করার ক্ষমতা। যে যত বেশি প্রশ্ন করতে পারবে সে তত বেশি শিখতে পারবে। এখন আমরা যদি চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি জানবে ও শিখবে তাহলে তাদের মুখস্থ করার দক্ষতা বাড়ানোর চাইতে প্রশ্ন করার দক্ষতা বাড়াতে মনোযোগ দিতে হবে। তাদের পরীক্ষার্থী নয়, শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তোলার প্রেরণা যোগাতে হবে।
আমাদের দেশে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়াটা প্রায় সকল অভিভাবকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়গুলির শিক্ষার মান বিচারেও এই জিপিএ-৫ এর সংখ্যাকে সূচক হিসেবে দেখা হয়। তাই শিক্ষক ও অভিভাবকের মান-মর্যাদা রক্ষার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীকেও নেমে পড়তে হয় তার সকল নিয়ে। তার শৈশবের দিনগুলোতে অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে মাত্র একটাই চাওয়া, আর সেটা হচ্ছে জিপিএ-৫। এর জন্য কত শিক্ষার্থীকে যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তা আমরা জানি না, জানলেও আমলে নেই না। এটা সত্যিই বেদনার! কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো অথবা গাধা পিটিয়ে মানুষ বানানোর অযৌক্তিক কল্পকাহিনীর তত্ত্বের মত করে আমরা আমাদের প্রিয় সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার যে চেষ্টা করছি তা কাম্য নয়। সন্তানকে যদি মানুষ করতেই হয় তাহলে তার মধ্যে স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে হবে। তাকে স্বপ্ন দেখতে এবং প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। একজন মানুষ যখন কোন কিছু না জানে এবং কোন কিছু জানতে আগ্রহী না হয় তাহলে সে কখনই প্রশ্ন করবে না। সুতরাং প্রশ্ন করতে শেখান, দেখবেন সন্তানের জ্ঞানের রাজ্যের পরিধি বেড়ে গেছে।
গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস এর কথা আমরা সবাই জানি। তাঁর কোন সুনির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না কিন্তু অনেকেই তাঁর কাছে শেখার জন্য আসতেন। দুনিয়াব্যাপী মানুষ এখনও তাঁকে সম্মান করে। কেন করে? কারণ তিনি এমন অনেকগুলে কথা বলে গেছেন যা এখনও সত্য এবং আলোকশিখা হয়ে আমাদের চলার পথে আলো ছড়াচ্ছে। তিনি বলেছেন, ‘পোশাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান’। তাই তিনি বললেন, ‘নিজেকে জানো’। নিজেকে জানা বলতে এটা বোঝায় না যে আমি কার সন্তান, আমার দাদামহ কে ছিলেন। নিজেকে জানা বলতে বোঝায়, নিজের সম্পর্কে, নিজের হৃদয়কে জানা ও বোঝা। আমি কে, আমি কি চাই, কেন চাই, আমার জীবনের সার্থকতা কিসে, আমি যা করছি তা কার উপকারে লাগছে, ইত্যাদি প্রশ্নগুলো নিজের মধ্যে তৈরি করা এবং সেই মোতাবেক নিজের জীবনকে গঠন ও পরিচালনা করাটাই হচ্ছে নিজেকে জানার মূল কথা। প্রকৃত জ্ঞান নিজেকে জানার মধ্যে, অন্য কিছু জানার মধ্যে নয়। শিক্ষকদের উদ্দেশ্য করে সক্রেটিস বলেছেন, ‘জ্ঞানের শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোনো ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল। পৃথিবীতে শুধুমাত্র একটি-ই ভাল আছে, জ্ঞান। আর একটি-ই খারাপ আছে, অজ্ঞতা’। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘ সত্যিকারের জ্ঞানী হবার প্রক্রিয়াটি তখনই শুরু হবে যখন আপনি জানবেন যে আপনি কিছুই জানেন না’। সত্যিকারের জ্ঞান হচ্ছে একটা উপলব্ধির বিষয়।
আমাদের উপলব্ধি করতে হবে আমরা যা করছি তা মানুষের কোন কল্যাণে বা কাজে লাগছে কি না। আমরা কি দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করছি নাকি দুর্বৃত্তায়িত গোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে চলেছি? আমাদের সন্তানদের আমরা প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছি নাকি তাদের মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলোকে কবরচাপা দেয়ার ব্যবস্থা করছি? বিদ্যা শিক্ষার নামে কতিপয় প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার যে শিক্ষা আমরা আমাদের সন্তানদের প্রদান করছি তা তাদের স্বপ্নগুলোকে ডানা মেলতে সহায়তা করছে কি না সেটা ভেবে দেখা জরুরি। আমরা যেন মনে রাখি মৃত মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারে না। তাই স্বপ্নহীন বা স্বপ্ন দেখতে অসমর্থ মানুষকে মৃত মানুষের সমান হিসেবে তুলনা করা হয়। সেই বিবেচনায় আমরা যেন এমন প্রজন্ম গড়ে না তুলি যাদের স্বপ্ন দেখতে দেয়া হয়নি বলে এখন আর কোন স্বপ্ন দেখে না। এখন তারা বেঁচে আছে কেবল প্রকৃতির নিয়মে এবং এই বেঁচে থাকার মধ্যে তাদের মধ্যে কোন আনন্দ নেই, এই বেঁচে থাকার মধ্যে তাদের কোন সার্থকতা বোধ নেই!
জ্ঞানই পূণ্য! সত্যিকারের মানুষ হচ্ছে জ্ঞানী মানুষ। এই জ্ঞান প্রকৃতি থেকে সবচেয়ে ভাল সংগ্রহ করা যায়। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা আসলে এক একটি জ্ঞান। ফলবতী বৃক্ষ যেমন ফলের ভারে নুয়ে পড়ে, তেমনি প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিও বিনয়ী ও আচার আচরণে মধুর হয়। আজকের সমাজের বিবেচনায় তাঁর হয়তো অর্থ-বিত্ত কম থাকতে পারে, যেমন সক্রেটিসেরও ছিল না কিন্তু জ্ঞানের বিবেচনায় সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ ব্যক্তি মাত্রই সত্যিকারের ধনী। ইংরেজিতে সে কারণেই বলা হয়, জ্ঞানই শক্তি (নলেজ ইজ পাওয়ার)। তাই আমরা চাই ছেলেমেয়েরা জ্ঞানের চর্চা করুক, তাদের জ্ঞানের আলোয় গড়ে উঠুক মানবিক বাংলাদেশ! তাদের স্বপ্নগুলো ডানা মেলে উড়–ক শান্তি ও সমৃদ্ধির বিস্তীর্ণ আকাশে!
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯