জুমাদাল উখরা প্রথম খালিফার ইন্তেকালের মাস

জুমাদাল উখরা প্রথম খালিফার ইন্তেকালের মাস

মোহাম্মাদ আব্দুল আজিজ :ইসলামি ক্যালেন্ডারের ষষ্ঠ মাস জুমাদাল উখরা। অর্থ বরফ জমার শেষ মাস। শায়েখ সাখাবীর মতে আরবগণ যখন সর্বপ্রথম মাসসমূহের নামকরণ করছিল ঘটনাক্রমে সে বছর জুমাদাল ওলা ও জুমাদাল উখরা দুই মাস আরবে বরফ জমার কাল ছিল, তাই তারা উক্ত দুই মাসকে উক্ত দুই নামে অভিহিত করেছিল। জুমাদাল উখরাকে জুমাদাল আখের, জুমাদাল আখেরা ও জুমাদাল মানিয়াও বলা যায়। কারণ ‘জুমাদা’ শব্দটি পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয় ক্ষেত্রে আসে। সর্বজনবিদিত যে ইসলামের প্রথম খলিফা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তার এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উর্ধ্বতন ৭ম পুরুষ মোররা। মহানবী (সা.) এর জন্মের দুই বছর কয়েক মাস পর জন্মগ্রহণ করেন। প্রাক-ইসলামি যুগে আবু বকর (রা.) ছিলেন দানবীর এবং সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। ইসলামের প্রথম তিন ব্যক্তির একজন। ইসলাম গ্রহণের পরেও তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের নিকট সম্মানের পাত্র। তার কারণ ছিল জনসেবামূলক কাজে তার অসাধারণ ত্যাগ ছিল। সমাজ সংস্কারে আবু বকর (রা.) এর দান ছিল অসামান্য ও অফুরন্ত। ৩০ হাজার স্বর্ণ মুদ্রার বিনিময়ে মুসলিম দাস-দাসীদের দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার কারণে কোরাইশ নেতারা তার প্রতি অত্যাচার করার দুঃসাহসিকতা দেখালে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আবিসিনিয়ায় হিজরত করার উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হয়ে যখন তিনি ‘বারকলগাবাত’ নামক স্থানে পৌছলেন, তখন আকস্মিকভাবে মক্কার কাবা গোত্রের নেতা ইবনুল দাগান তাকে ফিরে নিয়ে এসে সকলের সাথে পরামর্শ করে মীমাংসার একটা চুক্তি পত্র সম্পাদন করে দেন। তিনি ছিলেন নবী (সা.) এর সারা জীবনের সাথী। হিজরতের সময়ে কঠিন মুহূর্তে মক্কার ছুর পর্বতের গুহায় নবী (সা.) এর একমাত্র সাথী। তার সম্পর্কে মহানবী (সা.) ইন্তেকালের পাঁচদিন আগে মদীনার মসজিদে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে উল্লেখ করেন যে, বন্ধুত্ব এবং অর্থসম্পদ ত্যাগ করার ক্ষেত্রে আমার প্রতি সবচেয়ে বেশী উপকার করেছে আবু বকর। যদি আমি আমার রব ছাড়া অন্যকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম, কিন্তু তার সাথে আমার ইসলামি ভ্রাতৃত্ব  ও ভালবাসার সম্পর্ক বিদ্যমান। মসজিদের কোনো দরজা যেন খোলা না রাখা হয়।, সকল দরজা যেন বন্ধ করা হয়, শুধু আবু বকরের দরজা বন্ধ করা যাবে না। সেদিন ইশা’র সালাত থেকে ১৭/২২ ওয়াক্ত মদীনার মসজিদের ইমাম ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। নবী (সা.) তাকে নিজেই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। নবী (সা.) এর ইন্তেকালের পরদিন হতে কণ্ঠভোটে  খালিফা নির্বাচিত হয়ে ২ বছর তিন মাস ০৯ দিন। (১৩/০৩/১১ হিজরী হতে ২২/০৬/১৩ হিজরী পর্যন্ত।)


৭ই জুমাদাল উখরা সোমবার ১৩ হিজরী হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) জ্বরে আক্রান্ত হন। ১৫ দিন একাধারে অসুস্থ ছিলেন। লোকেরা দেখতে এসে বললো। আপনার চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসক আনা হোক। তখন খলিফা কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি আর বেশী দিন বাঁচবেন না। অসুস্থ অবস্থায় তিনি বিচক্ষণ সাহাবীদের সাথে আলোচনা করে ওমর (রা.) কে খেলাফতের জন্য মনোনয়ন দিয়ে পরের দিন জনসাধারণকে ডেকে কণ্ঠ ভোটে তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করে ঘোষণা দেন। শেষ বারের মত উমর (রা.) কে কিছু উপদেশ প্রদান করেন। খলিফা নির্বাচনের একটি চুক্তিপত্র ওসমান রা. কে বলে লিখে নিয়ে জনসাধারণকে এ চুক্তিপত্রটি শুনান হলো। খলিফা নির্বাচনের পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) প্রাণপ্রিয় কন্যা আয়েশা (রা.) কে ডাক দিয়ে বললেন “রাজকোষ হতে খলিফা এ যাবত বেতন ভাতা বাবদ কত নিয়েছেন তা হিসাব করে দেখা হোক (হিসাব করে দেখা গেল ৬০০০ দিরহাম (ছয় হাজার দিরহাম) খলিফা বললেন আমার একটি নিজস্ব জমি আছে উহা বিক্রয় করে ঐ ছয় হাজার দিরহাম রাজকোষে জমা দিও।” আবার বললেন বাইতুল মাল হতে আমার বাড়ীতে কি কি জিনিসপত্র আছে হিসাব কর। হিসাব করে দেখা গেল একটি হাবশী দাস, একখন্ড বস্ত্র ও একটি উট। তখন খলিফা বললেন আমার মৃত্যুর পর এগুলি সবই উমরের নিকট জমা দিও। একথা শুনে উমর (রা.) খলিফার পাশে বসে কাঁদছেন আর বললেন “ হে আবু বকর (রা.) আপনি কত মহান! আপনি আপনার আচরণ দ্বারা আপনার উত্তরাধিকারের কাজকে কতইনা কঠিন করে গেলেন! আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন মহানবীর দাফনে কয়টুকরা কাপড় ছিল? আয়েশা (রা.) বললেন ‘তিন টুকরা’। তিনি বললেন আমাকেও তিন টুকরা কাপড় দিও। ২টি আমার ব্যবহার করা আছে এ দুটাকে পরিষ্কার করে নিও। এক টুকরা নতুন কিনে নিও। আয়েশা বললেন, আমরা কি এতই দরিদ্র না কৃপণ যে আপনার জন্য তিন টুকরা নতুন কাপড় সংগ্রহ করতে পারবো না। খলিফা বললেন “নতুন কাপড় মৃত অপেক্ষা জীবিতদের বেশি কাজে লাগে।” আবার জিজ্ঞাস করলেন আজ কি বার? আয়েশা বললেন ‘সোমবার’। তখন খলিফা বললেন মহানবী এ দিনেই ইন্তেকাল করেছেন। আমার মনে হচ্ছে আমিও আজ দুনিয়া ত্যাগ করবো। আমার মৃত্যুর পর তোমরা আমাকে নবীর কবরের পাশে কবর দিও। সত্যই তিনি ঐ দিনই ২২ শে জমাদাল উখরা ১৩ হিজরী সোমবার বাদ মাগরিব ইন্তেকাল করেন। খলিফা উমর তার জানাজার নামাজ সু-সম্পন্ন করেন। মহানবীর পাশেই তাকে দাফন করা হয়।
খলিফার স্ত্রী সন্তানঃ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) সর্বমোট চারটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম ২টি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে এবং পরে দুইটি মদিনায়। প্রথম স্ত্রীর নাম কুতায়লা তার এক ছেলে আব্দুল্লাহ ও এক মেয়ে আসমা। কুতায়লা ইসলাম গ্রহণ না করায় বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম উম্মে রুমান। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মদিনায় মারা যান। তার এক পুত্র আব্দুর রহমান ও এক কন্যা আয়েশা। তৃতীয় স্ত্রীর নাম আসমা। মদিনার অধিবাসী। তাঁর গর্ভে এক পুত্রের জন্ম হয় তার নাম মোহাম্মদ। তাঁর ৪র্থ স্ত্রীর নাম উম্মে হাবিবা মদিনার অধিবাসী। তাঁর একমাত্র কন্যা উম্মে কুলছুম।
হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক (রাঃ) মর্যাদাঃ
১) পবিত্র কুরআনের সুরা তাওবায় ৪নং আয়াতে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) কে ‘দুই জনের একজন’ বলা হয়েছে। অপর জন হলেন রাসুলুল্লাহ (সা)। গারে ছুরে আত্মগোপন করলে কাফির উক্ত গুহার মুখে উপস্থিত হলে আবু বকর তাদের পা দেখে ভয় পেয়ে বলেছিলেন এখন আমাদেক দেখে ফেলবে। এমন অবস্থায় নবী (সা) তাকে অভয় প্রদান করলেন। মহান আল্লাহ তার উপর প্রশান্তি নাজিল করেছিলেন (তাফসীরে কবির)। আলোচ্য আয়াত নিঃসন্দেহে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) এর মর্যাদার ইঙ্গিত বাহক।
২) আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (রঃ) বলেন, আমি আয়েশা (রা) কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাসুলুল্লাহ (সা) সাহাবীদের মধ্যে কে তাঁর নিকট সর্বাধিক প্রিয় ছিলেন? তিনি বলেন আবু বকর (রা)। আমি আবার বললাম তারপর কে? তিনি বলেন ওমর (রাঃ) আমি পুনরায় বললাম তারপর কে ? তিনি বলেন আবু উবাইদা ইবনু জাররাহ। আমি আবার বললাম তারপর কে? এরপর তিনি চুপ থাকলেন। হাদিসটি হাসান ও সহীহ ইবনু মাজাহ ৩) হযরত উমর (রা) বলতেন, আবু বকর (রা) আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম, আমাদের তুলনায় রাসুলুল্লাহ (সা) এর অধিক প্রিয় ছিলেন। (সহিহ তিরমিযী)।
৪) আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা) আবু বকর (রা) কে বললেন, আমি হাওযে (কাওছারে) আমার সাথী। হাদিসটি হাসান এবং সহীহ। তিরমিযী হাদীস নং-৩৬০৯। ৫) যুবাইর ইবনু মোতই ম (রা)তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন। একদা এক মহিলা নবী (সা) এর কাছে এসে বললো আচ্ছা বলুনতো, আমি পুনরায়, এসে আপনা কে না পেলে? মহিলা যেন নবী (সা) এর ওফাতের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। (উত্তরে) নবী (সা) বললেন যদি তুমি আমাকে না পাও তাহলে আবু বক্করের নিকট যাইও। বুখারী হাদীস নং-৩৩৯৪। আলোচ্য হাদীসে আল্লাহর নবীর পরেই আবু বক্করের (রা) মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখক ঃ খতিব উপশহর জামে মসজিদ বগুড়া
ও ইমাম মদিনা মসজিদ কালিতলা হাট বগুড়া।
০১৭১২-৫১৪৪৭৮