জাতীয় মহাসড়কে টোল ও আমাদের প্রত্যাশা

জাতীয় মহাসড়কে টোল ও আমাদের প্রত্যাশা

 সৈয়দ আহম্মদ কিরণ : সময় ও জীবন টাকার বিনিময়ে ফেরত আসবে না। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিটি শহরকে মহাসড়ক ও নগর সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে এসে টোল সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী, নিরাপদ, সুবিধাজনক এবং ঝামেলাবিহীন ভ্রমণ সুবিধা এবং পরিসেবা সরবরাহের দিকে নজর দিয়ে সরকার জাতীয় মহাসড়কে ভ্রমণকারীদের জন্য ব্যবহারকারী বান্ধব মহাসড়ক নির্মাণ করবে। যার মধ্যে পার্কিং সুবিধা, নির্দিষ্ট গতির লেন, ছোট কার, বড় কার, বাস, ট্রাক, লরি, ছোট যানবাহন এবং জরুরি লেন ব্যবস্থা রেখে জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ সাপেক্ষে মহাসড়কের পার্শ্বে রেস্তোরাঁ, টেলিফোন বুথ, ওয়াই-ফাই, জ্বালানি স্টেশন, এটিএম বুথ, গাড়ী মেরামতের ওয়ার্কশপ, ড্রাইভারদের জন্য বিশ্রামাগার, মহিলা ও পুরুষদের জন্য টয়লেট, চিকিৎসা সেবার জন্য হাইওয়ে হাসপাতাল, কেমিষ্ট শপ, হেলিপ্যাড সুবিধা, সিসি ক্যামেরা, রাতে রাস্তার দু-পাশে দৃশ্যমান আলো এবং রোড মার্কিং জ্বল জ্বলে সহ সব ব্যবস্থা মহাসড়কে রেখে মহাসড়ক নির্মাণ করে টোল আদায় উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করবে এবং দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে।

টোল মানে ট্যাক্স নয়। টোল মানে ব্যবহারকারীর ফি অথবা জাতীয় মহাসড়ক ব্যবহারকারী ফি। টোল জোনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় টোল ট্যাক্সের হার আপনি যে যানবাহন ব্যবহার করবেন তার উপর নির্ভর করবে। সেটা কত কি.মি. জাতীয় মহাসড়ক ব্যবহার করবেন সেই হিসাবে চার্জ আরোপিত হবে। ইঞ্জিন ক্ষমতা, আসন সংখ্যা এবং যানবাহনের দাম এর ভিত্তিতে টোল ফি আদায় করা যেতে পারে। জাতীয় মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহনই চলাচল করবে। যেমন হালকা মোটরগাড়ী, হালকা বাণিজ্যিক যানবাহন, বাস, ট্রাক, মাল্টি এক্সেল যানবাহন ইত্যাদি।মহাসড়ক ব্যবহারকারীরা সহজেই যেন অর্থ প্রদান করতে পারে তার জন্য বহুমূখী ব্যবস্থা থাকতে হবে। মহাসড়ক নেটওয়ার্কে উচ্চসামাজিক সুবিধা বহন করে। যেমন রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, পাওয়ার গ্রীড, ওয়াটার সাপ্লাই, সম্প্রচার ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সংযুক্ত হতে পারে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতি উচ্চমানের মহাসড়ক ব্যবহারের জন্য চার্জ দেওয়ার পক্ষে যুক্তিযুক্ত।বর্তমানে বাংলাদেশে জাতীয় মহাসড়ক ৩,৭৯১ কি.মি., আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪,২০৬ কি.মি., জেলা সড়ক ১৩,১২২ কি.মি, মোট রাস্তার দৈর্ঘ্য ২১,১১৯ কি.মি.। যখনই চার লেন এবং ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মিত হবে সেটাকেই আমরা জাতীয় মহাসড়ক হিসাবে চি?িহ্নত করতে পারি।

আপনি মাসিক ফি প্রদানের মাধ্যমে টোল দিতে পারবেন। কিছু পাস দেওয়া যেতে পারে যারা সরকার কর্তৃক অব্যহতি প্রাপ্ত ব্যক্তি এবং প্রতিরক্ষা কর্মি একটি পাস কার্ডের মাধ্যমে মহাসড়ক ব্যবহার করতে পারবে। টোল সংগ্রহ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয়। যিনি অর্থায়নের মাধ্যমে জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ করবেন এবং পরিচালনা ব্যয় মিটাবেন। যখন ট্রাফিকিং ব্যবস্থা সুচারুরূপে পালন করা হবে তখন মহাসড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। টোল ফি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন ব্যবহারকারীদের উপর আর্থিক চাপ না পড়ে এবং প্রাইভেট সংস্থার অতিরিক্ত লাভ যেন না হয়। টোল ফি’র উপর সরকার ভ্যাট ট্যাক্স আরোপ করতে পারে। এটা সরকারের একটা আয়ের উৎস হতে পারে। টোল আদায়ের নীতিমালা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন ব্যবহারকারী উৎসাহী হয়ে মহাসড়ক ব্যবহার করে। মহাসড়কগুলি কোন অবস্থাতেই নিম্নমানের হওয়া যাবে না। মহাসড়ক কমপক্ষে ২০ বছর মেয়াদী এবং যেখানে ট্রাফিক যানজট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে সেখানে ৫০ বছরের হিসাবে হাইওয়ে লেনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। দূর্দান্ত পরিবর্তনশীল নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। যাতে নীতিমালাগুলি বাস্তব এবং স্থায়ী সাফল্যের সাথে সংগতিপূর্ণ হয়।

প্রথম শ্রেণীর মহাসড়ক, দ্বিতীয় শ্রেণীর মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়েগুলি ব্যক্তিগত গাড়ি জনসাধারণের দ্বারা ব্যবহৃত বহুকার্যকরী সুবিধাদির বাস, কোচ, ট্যাক্সি, নিজস্ব পরিবহন, বাণিজ্যিক সড়ক উত্তলন পরিসেবা, জরুরি গাড়ি (এ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ যানবাহন, ফায়ার ট্রাক)। মহাসড়কে যে গাড়িগুলি চলাচল করবে তার ড্রাইভারদের খুবই দক্ষ হতে হবে। মহাসড়কগুলির নেটওয়ার্ক সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে ঝঊওচ প্রকল্পের আওতায় এডিপি’র অর্থায়নে দক্ষ ড্রাইভার তৈরির লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।মহাসড়ক নির্মাণ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এর হিসাবে টোল আদায়ের সময়কাল নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি টোল সংগ্রহের সময়কাল ছোট হয় তাহলে চার্জ উচ্চতর হবে এবং টোল আদায়ের সময়কাল বড় হলে চার্জ নিম্নতর হবে।  জাতীয় মহাসড়ক সরকারের অন্তর্ভূক্ত। রোড ট্যাক্স প্রযোজ্য হতেই পারে। সংগৃহিত ট্যাক্সগুলি রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে হবে। যেন চালকেরা রাস্তায় কোন সমস্যায় না পড়েন।জাতীয় মহাসড়কের প্রয়োজনীয় ফি জেলা টু জেলা শহর এবং শহরগুলির মধ্যে যোগাযোগ সুবিধা তৈরি করে এবং পণ্য পরিবহন ও আরামদায়ক ভ্রমন ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা সৃষ্টি করে। জাতীয় মহাসড়কে সুরক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় মহাসড়কে টোল প্লাজার মাধ্যমে টোল সংগ্রহ করা হয় এবং প্রতিটি টোল প্লাজা নির্দিষ্ট দূরুত্বে তৈরী হবে।
উচ্চমানের জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি দেশের জন্য বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সড়ক পরিবহণ-পরিবহণ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত বর্ধনশীল খাত গঠন করে পণ্য ও লোকের চলাচলের মাধ্যমে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সমর্থন করে, অর্থনৈতিক বিশেষায়নের সুযোগ করে দেয়, দক্ষতাকে ছড়িয়ে দেয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। মহাসড়কগুলি আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করে। অভ্যন্তরিণ যোগাযোগ বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক বিকাশের সুবিধা ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। মহাসড়কগুলি গ্রামীণ বিচ্ছিন্নতাকেও হ্রাস করে, নাগরিকের চাকরি, স্বাস্থ্য সুবিধা, শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ উন্নত করতে সহায়তা করে।মহাসড়ক নেটওয়ার্ক সরবরাহের জন্য বিকেন্দ্রীভূত প্রাতিষ্ঠানিক এবং তহবিল ব্যবস্থাগুলি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মহাসড়কগুলি নির্মাণ, পরিচালনা করা, নীতি ও মান নির্ধারণ করা, পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়গুলিকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। কোন অবস্থাতেই একটি সংস্থা অন্য সংস্থার উপর দায় চাপাতে পারবে না।
বিশ্বজুড়ে টোলযুক্ত রাস্তাগুলির দৈর্ঘ্যরে প্রায় ৭০% চীনে। অন্য কোনও দেশ এত অল্প সময়ের মধ্যে এ জাতীয় স্কেলের একটি এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে উন্নত বিশ্বে মহাসড়ক টোলিং সিস্টেম এর আওতায় এনে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং অপারেটিং ব্যয় মিটিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি সহ ভারত, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো, সুইজারল্যান্ড এবং অন্যান্যরা রাস্তা টোলিং সিস্টেম ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ইন্টারস্টেট হাইওয়ে সিস্টেমের ৪,০০০ কি.মি এর বেশি টোল ব্যবস্থপনার আওতায় এসেছে। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে রাস্তা দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণ যদি অপর্যাপ্ত হয় তবে মহাসড়কের দ্রুত অবনতি ঘটবে। তখন মহাসড়ক ব্যবহার অসম্ভব হয়ে পড়বে। টোলিং সিস্টেম পরিচালনা ব্যয় মিটানোর সর্বোত্তম পন্থা। মহাসড়কের পরিবেশ এবং সুরক্ষা সঠিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ মোড় মহাসড়কের পার্শ্বে নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে স্থাপন ও নির্মাণ অনুমতি দিতে হবে।
কোন কারণে টোল নিয়ে মহাসড়ক পরিচালনায় ব্যর্থ হলে দ্রুত মহাসড়কের অবনতি ঘটবে, সড়ক নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে, যানজট প্রকট আকার ধারণ করবে, ব্যবহারকারীদের অভিযোগ প্রকট আকার ধারণ করবে। তখন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। সুতরাং আধুনিক ও সময়োপযোগী টোলিং সিস্টেম বাস্তবায়ন করার জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে হবে। প্রকল্পটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। শীঘ্রই দেশের সব মহাসড়ক উন্নত বিশ্বের মহাসড়কের মত নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল হবে। সর্বোপরি ‘বি ংযড়ঁষফ মবঃ যিধঃ বি ঢ়ধু ভড়ৎ’ যেটার জন্য টোল দিব সেটা আমাদের পাওয়া উচিৎ।
 লেখক : শিল্পোদ্যোক্তা।
০১৭৩০-০৪১৭০০