জাতীয় ঐক্যের চাপ সত্ত্বেও জামায়াতকে ছাড়বে না বিএনপি

জাতীয় ঐক্যের চাপ সত্ত্বেও জামায়াতকে ছাড়বে না বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় আগ্রহী নেতাদের চাপ সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীকে ত্যাগ করবে না বিএনপি। নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের রাজনীতির কারণে দীর্ঘদিনের এই জোট সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে চায় তারা। বিএনপির শঙ্কা, তারা ছেড়ে দিলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারে জামায়াত। তাতে ভোটের সমীকরণে এগিয়ে যাবে আওয়ামী লীগ। তাই কৌশলে ২০ দলের ঐক্য অক্ষুন্ন রেখে জাতীয় ঐক্য গড়ার পক্ষে কাজ করবে বিএনপি। এক্ষেত্রে জামায়াতকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে সম্পৃক্ত করবে না দলটি। জানা গেছে, অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা বাদে জাতীয় ঐক্যের বাকি দলগুলোরও সম্মতি রয়েছে বিএনপির এ কৌশলে। এদিকে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপির জাতীয় ঐক্যে বাধা হতে চায় না জামায়াতও। সে কারণে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের সঙ্গে ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিকের ঐক্যে আপত্তি নেই তাদের। জামায়াতের চাওয়া, জাতীয় ঐক্যের সফলতা। এজন্য প্রয়োজনে ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতেও রাজী তারা। গত বৃহস্পতিবার ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে দলের এমন মনোভাবের কথা জানায় জামায়াত। বিএনপি বলছে, জাতীয় ঐক্য এখন দেশবাসীর চাওয়া ও আকাক্সক্ষায় পরিণত হয়েছে। কোনো দল বা ব্যক্তির কারণে সেটা বাধাগ্রস্ত হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট দল বা ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে সরকার ও সরকারি জোটের বাইরে থাকা সব দল, সংগঠনকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের ডাক দেন বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেন। বিএনপিও এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের নেতাদের প্রধান শর্তই হলো, তাদের জোটে স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিরোধীদের স্থান হবে না। যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরিক বিকল্পধারার শর্ত, ঐক্যে আসতে হলে জামায়াতের সঙ্গে জোট ভাঙতেই হবে বিএনপিকে। এ ব্যাপারে বি. চৌধুরী এখনও অনড় রয়েছেন। তবে জাতীয় ঐক্যে আগ্রহী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাকিরা এ বিষয়ে ততটা কঠোর নন। তারা জামায়াত ইস্যুতে বিবাদের চেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের কৌশল হচ্ছে- জামায়াতকে বৃহত্তর ঐক্যে নেওয়া হবে না। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের জোটের বিষয়েও তারা আপত্তি করবেন না। কারণ তারা বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করছেন, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সঙ্গে নয়।

যুক্তফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দৈনিক করতোয়াকে বলেন, তাদের ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট বলা আছে- জাতীয় ঐক্যে স্বাধীনতাবিরোধী দলের স্থান নেই। ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চলছে, জামায়াতের সঙ্গে নয়। জামায়াত বিএনপির শরিক। জামায়াতের প্রশ্নে বিএনপি কী করবে, সেটা তাদের নিজস্ব বিষয়।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আমরা শুরুতেই বলেছি-স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে কোনো ঐক্য হবে না। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে-ভোটের অধিকার ফিরে পেতে ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমরা বৃহত্তর ঐক্য করছি। জামায়াতের কি ভোট নেই? তারা কি ভোট দেবে না? এটা নিয়ে সবাই অস্থির হয়ে গেছে কেন? বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, তাদের অবস্থান হচ্ছে- জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট অটুট রেখে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিন্তাও অভিন্ন। কারাগারে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তিনি বলেছেন- ২০ দলীয় জোটকে অটুট রেখেই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বিদায় করতে হবে। লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একই বার্তা দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও জোটের ঐক্য অক্ষুন্ন রেখে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়তে বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছে ২০ দলের শরিকরা। ঐক্যপ্রক্রিয়াকে ইতিবাচক চোখে দেখে তা এগিয়ে নিতে বিএনপি মহাসচিবকে দায়িত্ব দিলেও জোটের ঐক্য অটুট রাখার ওপর গুরুতারোপ করেন তারা। জাতীয় ঐক্যে জামায়াতকে নিয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির বিষয়ে বৈঠকে জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক এই দলটিকে সমর্থন করেই কথা বলেন ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিক দল। ওই দলগুলোর নেতারা বলেন, তারা দীর্ঘ সময় ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলন করে যাচ্ছে জোটবদ্ধভাবে। এখন জোটের বাইরে থাকা কোনো দলের উস্কানিতে জোট ভাঙা যাবে না। তাছাড়া জাতীয় ঐক্যে এখন কেবল বিকল্পধারার পক্ষ থেকে এককভাবে জামায়াতের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখা হচ্ছে। যুক্তফ্রন্টের অন্য শরিক দলগুলোর সাথে তা মিলছে না। তাই একজন ব্যক্তির মতামতে বিএনপি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ সময় বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশনাও এমনই। তিনি ২০ দলীয় জোট অটুট রেখে জাতীয় ঐক্য গড়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরাও সেটাই করছি। ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্য দুটি আলাদা প্লাটফর্ম। দুটি ফ্রন্ট কাজও করবে আলাদা। তাই এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।

জানা গেছে, ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে প্রয়োজনে সব ধরণের ছাড় দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে জামায়াত। জোটের ঐক্য অটুট রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে দলটির নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, বিএনপির ঐক্যে জামায়াতের সমর্থন আছে। যেহেতু কমন ইস্যুতে সবাই কথা বলছে, সুতরাং এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় তাদেরও সমর্থন আছে। তার দল দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যেকোনো ধরণের জাতীয়ঐক্য গড়ার বিষয়ে সমর্থন জানায়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বার্থে এই ঐক্য গড়ে তুলতে বিএনপির নেতৃত্বের প্রতিও তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। এক্ষেত্রে জামায়াতকে নিয়ে কে, কী বললো কিংবা তাদেরকে ঐক্য প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো কিনা-সেটা নিয়ে তারা বিচলিত-চিন্তিত নয়। তারা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সফলতা চান। প্রয়োজনে তাদেরকে বাইরে রেখে হলেও ঐক্যের সাফল্য চায় জামায়াত। এদিকে, জাতীয় ঐক্য নিয়ে জামায়াতের এই অবস্থানে সন্তুষ্ট বিএনপি।

জাতীয় ঐক্যে জামায়াতকে নিয়ে বিকল্পধারার আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের দুইজন নেতা বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে বিএনপি জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। বি. চৌধুরীও এখন একই কথা বলছেন। জনগণ এটিকে ভালো চোখে দেখছে না। দেশবাসী তার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। কারণ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই এখন মুখ্য বিষয়। জাত-কূল দেখার সময় এখন নয়।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ২০ দলীয় জোট ও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য পৃথক বিষয়, সাংঘর্ষিক নয়। জামায়াত ২০ দলীয় জোটের শরিক। তারা বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে থাকছে না। তিনি জানান, জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে ২০ দলীয় জোটে আলোচনা হয়েছে। জোট শরিকরা এটিকে সমর্থন করেছে। জামায়াতও এ প্রক্রিয়ায় দ্বিমত করেনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য নিয়ে দেশের জনগণ কী বলছে-ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত দলগুলোকে এখন সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। দেশবাসীর চাওয়া, যেকোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্যের সফলতা। এই ঐক্যে কোনো দল বা ব্যক্তি যদি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জনগণ তাকেই দায়ী করবে। তিনি বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের জন্য দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যতটুকু ত্যাগ স্বীকার করা দরকার-সেটা আমরা করব। জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে জনগণের কাছে দোষী সাব্যস্ত হতে চায় না বিএনপি।