জলস্রোত রক্ষা করা জরুরি

জলস্রোত রক্ষা করা জরুরি

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : বাঁচাও জলস্রোত, রক্ষা কর পরিবেশের ভারসাম্য। বাংলাদেশ নদী মাতৃত্ব দেশ, এক সময় নদ-নদীর কলতানে আর মাঝি মাল্লাদের ছোটাছুটিতে ভরপুর ছিল নদীগুলো। দেশের সর্বত্র ভাতে-মাছে বাঙালির যে ঐতিহ্য ছিল তা আজ কল্পনায় পরিণত হয়েছে। দেশের বহমান নদী, খাল, বিল অবৈধ ভরাট ও দখলদারি আর ভূমি দস্যুদের হাতে জিম্মি। ফলে আস্তে আস্তে পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। পরিবেশের বিরুদ্ধাচারণে বেঁচে থাকার পথকে অবলীলাক্রমে রুদ্ধ করে। কারণ পরিবেশ নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করা দরকার। আমাদের পরিবেশ যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে আমাদের আবাসস্থল। তাই সময় থাকতেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সহ গণসচেতনতা দরকার। পরিবেশ দূষণ সমস্যা আজ প্রকট আকার ধারণ করছে, ফলে মানব সভ্যতা আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য নানামুখী গবেষণা ও প্রচার প্রচারণা করা হলেও আশানুরূপ ফলাফল অর্জন কোন ক্রমেই সম্ভব হচ্ছে না বরং সমস্যার ভয়াবহতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সুস্থ ও সুন্দর মানব সভ্যতা বিকাশের জন্য সুন্দর পরিবেশ একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। দারিদ্র, অশিক্ষা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও মানুষের লোভ লালসাসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। অথচ মহান আল্লাহ পরিবেশ সুন্দর করার জন্য দান করেছেন অফুরন্ত নিয়ামত। যার সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী। মহান আল্লাহ মানুষের কল্যাণে ও পরিবেশ সংরক্ষণে তৈরী করেছেন, আলো-বাতাস, অফুরন্ত গাছ-গাছালী, ফল-মূল, নদী -নালা, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত, বনজঙ্গল, জীব-জানোয়ার, পাখ-পাখালীসহ অগণিত কীট-পতঙ্গসহ বহুকিছু । এগুলোর মধ্যে নদ-নদী ও খালবিল অন্যতম।
বর্তমানে অসাধু ও কিছু সংখ্যক হিং¯্র আর স্বার্থপর মানুষের কারণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদ-নদী ও খাল-বিলগুলো। দেশের প্রায় সবগুলো নদীর জল¯্রােতের ধারা ব্যাহত হচ্ছে  ভরাট হওয়ার কারণে। নদীর পাড়ে তৈরি হচ্ছে বড় বড় অট্টালিকা। অন্য দিকে ভূমি দস্যুরা অবৈধভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন করে নষ্ট করছে নদী ও জলাশয়ের পাড়। ফলে বিলিন হয়ে যাচ্ছে জলাশয়গুলো। একথা চরম সত্য যে পরিবেশ রক্ষা করতে নদীর নাব্যতা ও পরিবহনযোগ্যতা বজায় রাখতে নদীগুলোকে তার নিজস্ব গতিতে বহমান রাখতে হবে। আমাদের নদীমাতৃক ভূ-খন্ডে নদ-নদী, খাল-বিল শুধু পরিবেশ বান্ধবই নয়, বরং আমাদের  অস্তিত্ব রক্ষার পূর্বশর্ত। কিছু দিন আগেও আমাদের যোগাযোগ ও বাণিজ্য কার্যক্রম চলত নদী পথেই  দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে, সর্বত্র অল্প খরচে যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলো নদীপথে। যা বর্তমানে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরাও ছোট বেলায় বাড়ির পার্শ্বে করতোয়া নদীতে গোসল করতাম, খেলতাম, মাছ ধরতাম, সাঁতার কাটতাম। কিন্তু বর্তমানে সেই করতোয়া নদী নামে থাকলেও বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই। দেশের উত্তরাঞ্চলে নদীর প্রবাহমানতা কত খারাপ অবস্থায় রয়েছে তা করতোয়া নদীর দিকে তাকালেই সহজে অনুধাবন করা যাবে। কোন কোন জায়গায় নদীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। এই নদীর দু-ধার বিলীন করে  ফসল চাষ করা হচ্ছে। শহরতলী এলাকা ভরাট করে  ইমারত গড়ে উঠেছে । ফলে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে পুরো উত্তরাঞ্চল। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে বছর কয়েক পর লোভের আগ্রাসনে এ নদীর অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের দাক্ষিণ্যে আবিষ্কার করতে হবে এ মাঠে একদা করতোয়া নামে একটি নদী ছিলো ।

বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। এক সময় জালের মতো সমগ্র দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য খর¯্রােতা নদ-নদী আমাদের জীবন-জীবিকা সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করিলেও আজ সেগুলি জীর্ণ-শীর্ণ, মরণাপন্ন। অনেক নদী ইতোমধ্যে মানচিত্র হতেও হারিয়ে গিয়েছে। স্বাধীন হবার পর দেশে নদীপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। কিন্তু দখলদারদের কারণে বর্তমানে তাহা ৩৮০০ বর্গকিলোমিটারে ঠেকেছে। দেড় হাজার হতে কমে দেশে এখন নদীর সংখ্যা ৩০০। নদী হতে ভূমি সৃষ্টির জন্য নেওয়া হয়েছে বিচিত্র কলাকৌশল । সৃষ্টি করা হয়েছে কৃত্রিম চর। নদীর উপর আগ্রাসনের কারণে আগামী দিনগুলিতে পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি অনিবার্য । নদী  রক্ষা কমিশন ৫৮ টি জেলায় নদী দখলের চিত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, প্রভাবশালীরাই নদী দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা, এমনকি শিল্পকারখানা তৈরি করেছে। নানাবিধ কারণে নদীর এ বদ্ধ অবস্থার ওপর যুক্ত হয়েছে মানুষের লোভ লালসা, অন্যায় স্বার্থপরতা অস্বাচ্ছন্দ্য গতি, নদীর পাশে অবৈধ স্থাপনা, যা প্রবাহমান নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই জাতির স্বার্থে সরকার ও জনগণ সচেতন না হলে এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের সব নদীরই মৃত্যু ঘটবে। যা দেশের জন্য চরম সর্বনাশের শামিল। ফলে গোটা দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তখন হা হুতাশ করে  কোন লাভ হবে না। তাই জলস্রোতকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া দরকার।    
লেখক ঃ প্রভাষক-প্রাবন্ধিক  
mostakimbogra@gmail.com
০১৭১২-৭৭৭০৫৮