জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব

আব্দুল হাই রঞ্জু: জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনাবৃষ্টি, অকালে বন্যা, অসময়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গি। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর পানির নাব্যতাও এখন অনেক কম। ফলে উত্তরাঞ্চলের প্রমত্তা নদী পদ্মা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র সহ নদ-নদীগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিশেষ করে উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় খরস্রোতা তিস্তা এখন নামেই নদী। তিস্তায় এখন পানি না থাকায় চোখে পড়ে শুধু ধু ধু বালুচর। চলতি বছরের জুলাই, আগষ্ট, সেপ্টেম্বর মাসে টানা বর্ষণ আর উজানের ঢলে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল তিস্তা নদী। এই সময় লালমনিরহাটে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারেজ’ রক্ষায় খুলে দেওয়া হয় ৫২টি গেট। কারণ উজানের পানির চাপ এতই বেশি ছিল যে, সব গেট খুলে দেয়া না হলে ব্যারেজকে রক্ষা করাই কঠিন ছিল। এতে ভাটিতে থাকা লাখ লাখ মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়ে। এমনকি হঠাৎ পানির স্রোতে নদী ভাঙ্গনে বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয় প্রায় ৩০ হাজার পরিবার। এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তা নদীটি এখন পানির অভাবে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এমন এক সময় ছিল যখন নদী পারাপারে নৌকাই ছিল একমাত্র অবলম্বন। অনেকেই বলতেন, এক নদী মানে হাজার ক্রোশ, অর্থাৎ নৌকা ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তর ছিল না। সে নদীতে এখন হাঁটু পানি। মানুষ এখন নৌকা ছাড়াই নির্বিঘেœই হেঁটে নদী পারাপার করছে।
মূলত ভারত তিস্তার উজানে জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ব্যারেজ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশে ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী পানির অভাবে এখন মৃত প্রায়। তিস্তার পানির নাব্যতা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে, আসন্ন বোরো মৌসুমে ব্যারেজের সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য, ভারত এখন তিস্তা নদীর উজানে ব্যারেজ তৈরি করে সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তায় প্রবাহিত পানি ভারতের মহানন্দা নদীতে এবং জলপাইগুড়ি জেলা পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুরের মালদহ ও কুচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে।
যেখানে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটক কিংবা পরিবর্তন করার বৈধতা আন্তর্জাতিক আইনে নেই, সেখানে ভারত সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে একতরফাভাবে তিস্তার পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটকে দিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যা অর্থনৈতিক এবং বাংলাদেশের মানুষের ওপর এক ধরনের অবিচার। এ নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে বাংলাদেশের তরফে পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য কুটনৈতিক তৎপরতা চালালেও আশ্বাস ব্যতিত কার্যকর কোন সাফল্য মেলেনি। এক সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে বলেছিলেন, নদীর গতি, পানি ও বাতাসের নির্দিষ্ট কোন সীমারেখা নেই। প্রকান্তরে তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার যে অধিকার তা পাওয়া উচিত। আমরাও আশা করেছিলাম, সে দফায় হয়ত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার একটা সমাধান হবে। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। নীতিবাক্য শোনা ব্যতিত তেমন কিছুই অর্জন হয়নি।
উল্লেখ্য সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য ভারত সরকারকে বোঝাবার চেষ্টা করেও সফল হননি। উল্টো সে সফরে ভারত  অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলোচনা করলেও তিস্তা নিয়ে টু-শব্দটি পর্যন্ত করেননি। উল্টো ভারতের অনুরোধে ফেনি নদীর পানি প্রত্যাহারের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী মানবিক কারণে রাজী হয়েছেন মর্মেও তিনি মন্তব্য করেছেন। এ চুক্তিকে অসম চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। আবার বুয়েটের মেধাবি ছাত্র আবরার অসম এ চুক্তিকে ঘিরে ফেসবুকে পোষ্ট দেওয়ায় সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন নেতা কর্মিদের নির্মম নির্যাতনে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। তবু তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার সমাধান কখন কিভাবে হবে, তা এখনও সুদূর পরাহত। চলছে আমনের কাটা মাড়াই। ভরা মৌসুম আমন ধান কাটা মাড়াইয়ের। আগামী সেচভিত্তিক বোরো চাষাবাদ অত্যাসন্ন। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠী। যাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেচভিত্তিক চাষাবাদের সুতিকাগার এখন উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলা। এই অঞ্চলের উৎপাদিত ধানে দেশের মোট চাহিদার খাদ্যের একটি বড় অংশ পূরণ হয়। আর সেচভিত্তিক এই চাষাবাদে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের বুক চিরে প্রবাহিত নদীগুলোর পানির অবদান অনেক বেশি। কিন্তু সেচের জন্য যে পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, তা তিস্তা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্রে সে অর্থে থাকে না। মাত্র এক মাস আগেও তিস্তায় ছিল অথৈ পানি। এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে তিস্তা। দেখলে মনে হয়, নদী নয় যেন মরা খাল। বিশাল বিশাল বালুর স্তুপে মুল গতিপথ হারাতে বসেছে তিস্তা।
সূত্র মতে, বর্তমানে তিস্তা ব্যারেজের ৫২টি গেটের মধ্যে ৪৫টি বন্ধ রেখে উজানে পানি আটকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ কারণে আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এ ধরনের সংকট শুধু এ বছরই নয়, প্রতিবছরেই ঘটে থাকে। ফলে সেচভিত্তিক চাষাবাদের জন্য ভু-গর্ভস্থ পানিই হয়ে যায় একমাত্র ভরসা। ফলে প্রতিনিয়তই ভু-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায় মানুষের নানা ধরনের চর্ম রোগও দেখা দিচ্ছে। ফলে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ভু-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া প্রসঙ্গে বরেন্দ্র অঞ্চল গবেষণা সংস্থা ডামকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কর্মকর্তা জাহাঙ্গির আলম খান বলেছিলেন, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ জেলার ১০০ টি পয়েন্টে বোরিং করে দেখা গেছে, গত ৩-৪ বছরে এসব অঞ্চলের ভু-গর্ভস্থ পানির স্তর ৮ ফুট থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এ তথ্য যে উদ্বেগের, যা সচেতন মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। যেখানে মাত্র ৩-৪ বছরের মধ্যে ভু-গর্ভস্থ পানির স্তর ১২ ফুটি পর্যন্ত নেমে গেছে, সেখানে আগামী দিনগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ পানির যে তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে; যা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংগতকারণে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার আমাদের বৃদ্ধি করতে হবে। যেমন- বৃষ্টির পানি, বন্যার পানি, নদী-নালা সংস্কার করে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি নদ-নদীর পানি পরিশোধন করে খাবার উপযোগী করতে হবে। যদি নদ-নদীর পানি পরিশোধন করে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভু-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমে আসবে। এ কারণে  প্রতিটি নদী, খাল এখনই সংস্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। পানি ব্যতিত মানুষের বেঁচে থাকার কোন উপায় নেই। এ জন্য বলা হয় পানির অপর নাম জীবন। জীবন রক্ষাকারী পানির যথেচ্ছা ব্যবহার যেমন কমাতে হবে, তেমনি বন্যা ও বৃষ্টির পানি আটকিয়ে তা মানুষের খাবার উপযোগী এবং চাষাবাদে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেশি ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ, এতে কোন সন্দেহ নেই। যারা আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আশ্রয়, খাদ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে। সেই  দেশের কাছ থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের মতো অনৈতিক, অমানুষিক আচরণ আমরা কোনভাবেই আশা করি না। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সেই ভারত যুগের পর যুগ ধরে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করছে। এমনকি ১৯৯৬ সালে পদ্মার পানি চুক্তি করেও শর্ত অনুযায়ী পানি দিচ্ছে না। ত্রিশ বছর মেয়াদের চুক্তির এখন প্রায় ৭ বছর বাকি আছে। ইতিমধ্যেই ভারত সরকার পদ্মার উজানে গঙ্গাঁর পানি আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে অন্যান্য রাজ্যে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে পানির অভাবে আমাদের কৃষি, মৎস্য চাষ, জীব বৈচিত্র্য, নৌ- যোগাযোগ সবই এখন হুমকির মুখে পড়েছে। নৌ-যোগাযোগ, মৎস্য চাষ, কৃষি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন যেখানে পানি, সেখানে পানির অভাবে এই অঞ্চলের মানুষের রুটি রুজির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে- এটাই স্বাভাবিক।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের আদায় করতেই হবে। তা না হলে তিস্তার অববাহিকায় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কৃষি চাষাবাদ, মৎস্য চাষ কিংবা বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় পানির অভাবে যে সংকটাপন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তা নিকট ভবিষ্যতে সামাল দেয়া অনেকাংশেই কঠিন হবে।  
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮