জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দরকার সচেতনতা

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দরকার সচেতনতা

রায়হান আহমেদ তপাদার : পূর্বাপর দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে ছিল আমাদের জীবন সংসার। আমাদের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ উপেক্ষিত, অবহেলিত ও অগোছালো ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সততার সঙ্গে ভেজালমুক্ত এবং পুষ্টিকর খাদ্য আর নির্মল চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের সেবাগত কাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে। পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুনিয়ন্ত্রিত কি না সমাজ ও রাষ্ট্রকে দেখভাল করতে হবে। পলিথিনকে না এবং পাটশিল্পকে হ্যাঁ বলতে শিখতে হবে। প্রাকৃতিক অনেক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে মানুষের কোনো হাত না থাকলেও মানুষই পারে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে। প্রযুক্তিই উন্নতির ও সভ্যতার সোপান। তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহারের ধরন বা কৌশলই নির্ধারণ করে দেবে তা পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে।

 পরিবেশ দূষণের বিরূপ প্রভাব পড়েছে জনজীবনের ওপর। জাতিসংঘ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পরিবেশ দূষণের ফলে এশিয়ার আকাশে তিন কিলোমিটার পুরু ধোঁয়াশা জমেছে, যা এসিড বৃষ্টি ঘটাতে পারে। ফলে কোটি কোটি মানুষ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। প্রাকৃতিক দূষণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হেপাটাইটিস বি, পোলিও, কলেরা প্রভৃতি রোগ বাড়তে পারে। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির অনুপ্রবেশ বাড়ার কারণে চামড়ার ক্যান্সার ও চোখের ছানি পড়া রোগ বাড়তে পারে। এমনকি খাদ্যশস্যে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধের চেষ্টা করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। যন্ত্র ও গাড়ি থেকে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস ও সৌরশক্তি নির্ভর যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পরিবেশদূষণের ফলে মানুষের অস্তিত্ব আজ সংকটে। সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক সবার অঙ্গীকার।

পরিবেশের দূষণ বাড়ছেই। বেশ কিছু সূচকে অগ্রগতি সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি কাঙ্খিত পর্যায়ে নেই। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। পরিবেশ দূষিত হলে অবধারিতভাবে তার প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যে। আবার বিপর্যস্ত বন, ভূমি ও নদী-খাল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ। সরকার পরিবেশ সুরক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন নয়, পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষার দাবিনামা অগ্রাহ্য করার প্রবণতাও রয়েছে। ফলে খাল-বিল-জলাশয় এবং বন দখলে উন্মুখ লোকজনকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। জনগণের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জনসচেতনতা ও সরকারের সক্রিয়তা দরকার। টেলিফোন ও ই-মেইলে কালের কণ্ঠ’র পাঠকরা এ অভিমত জানিয়েছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রযুক্তির বর্ধিত ব্যবহার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রীর কারণেও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। যানবাহন ও কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ময়লা-আবর্জনা পরিবেশ দূষিত করছে। অন্যদিকে মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোন টাওয়ার, ইন্টারনেটের জন্য ব্যবহৃত রাউটার যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা ছড়াচ্ছে, তাতে মানুষ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের যা করতে হবে, তা হলো ইটভাটার চিমনি সঠিক উচ্চতায় স্থাপন করতে হবে, অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন রাউটার ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করতে হবে, মোবাইল টাওয়ার জনবহুল স্থান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে, আবর্জনা রিসাইক্লিং পদ্ধতিকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং পুরনো যানবাহন রাস্তা থেকে অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় আরো দক্ষ জনবল নিয়োগ করা প্রয়োজন। নিয়োগকৃত জনবল ঠিকমতো কাজ করছে না। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পরিবেশ সুন্দর রাখলে স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত হবে। এ জন্য তদারকি দরকার। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা অনেক কিছুর ওপর নির্ভরশীল। যেমন-ধূমপান, পানীয় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য উচ্চ কর ও জরিমানার ব্যবস্থা রাখা দরকার। পলিথিন, শব্দদূষণ ইত্যাদি রোধ করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। দেশের সব শিল্প ও কলকারখানার বর্জ্য পরিশোধন (ইটিপি) ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে জরাজীর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে, উচ্চ শব্দের ভেঁপু বাজানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে, শহরাঞ্চলের ময়লা ও আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্লাস্টিক ও পলিথিন দ্রব্য যেখানে-সেখানে ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে, গ্রামাঞ্চলের ময়লা-আবর্জনা, মলমূত্র যাতে খাল-বিল বা নদীর পানিতে না মেশে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ করতে হবে, বনাঞ্চল সংরক্ষণ করতে হবে। সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশ মানবজীবনকে সুন্দর করে, তাই পরিবেশ যাতে সুন্দর থাকে, মানুষের বাস উপযোগী হয়, সেদিকে আমাদের প্রত্যেককেই লক্ষ্য রাখতে হবে।
 
খাবার ও পরিবেশের দিক থেকে আমাদের সচেতন হতে হবে। সরকারের উচিত, পৌরসভা পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার ও প্রশিক্ষণ দেওয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতন ও উৎসাহমূলক কাজের পরিবেশ তৈরি করা। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইউনিয়ন কাউন্সিল, পৌরসভা ও থানা পর্যায়ে ময়লা ফেলার জন্য লোকবল দরকার। আমরা উন্নতি করছি নানা খাতে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ভালো রাখতে নজর দিচ্ছি না। এ ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল ও প্রশাসনের তদারকি দরকার। ময়লা পরিষ্কার ও নিয়ম করে ওষুধ ছিটানো দরকার। যথেষ্ট তদারকিও বিশেষ প্রয়োজন। বস্তুত দূষণ রোধ ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দূষণ রোধে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও এর সফল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে এখনই। দেশে পানিদূষণের কারণেও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারায়। তাই পানিদূষণ রোধেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সব নদীকে দূষণমুক্ত করতে হবে। তা না হলে জনস্বাস্থ্য অচিরেই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্বের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা না করে আমরা বরং নষ্টই করছি। কিন্তু মোকাবেলা করার আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। গাছ লাগিয়ে সৃষ্টি করতে পারি সবুজ প্রকৃতি। জীববৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের স্বপ্ন যেন বাস্তবে রূপ নেয় এবং আমাদের অনাগত প্রজন্ম সেই নিরাপদ পৃথিবীর বাসিন্দা হবে আশা করি। আমরা যত শিক্ষিত ও সভ্য হচ্ছি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় যেন তত অসচেতন হয়ে পড়ছি।

উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লোক যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করে। শহরে পাবলিক টয়লেটগুলো অভিগমনযোগ্য ও বেশি মানুষের সমাগম হয়-এমন স্থানে নির্মাণ করা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শহর অঞ্চলে পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই বললেই চলে। দেশের বেশির ভাগ পয়োবর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে প্রতিনিয়তই পানি ও পরিবেশ দূষিত হয়ে নানা রকম রোগব্যাধি ছড়াচ্ছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সারা দেশের পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা উন্নত করতে পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। শত শত বছর ধরে মানুষ নিজেদের সুখ-সুবিধার জন্য প্রকৃতির এত বেশি ক্ষতি করেছে যে প্রকৃতি এখন প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এতে খাওয়া-দাওয়ার সমস্যা দেখা দিচ্ছে বটে; কিন্তু এর চেয়ে বড় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। জনসংখ্যা যতই বাড়ছে; বন কেটে, নদী, জলাশয় ভরাট করে বসতি স্থাপন ও আবাদি জমির সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর ভয়াবহতা যে কত মারাত্মক হতে পারে, আমরা কেউই ভাবছি না। রাস্তাঘাটের ময়লা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ বিষয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সতর্ক দৃষ্টি প্রয়োজন। বায়ুম লে আজ আর নেই বিশুদ্ধতার প্রতিশ্রুতি বা প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ। পরিবেশে নেই জীবনের নিরাপদ আশ্বাস। নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস এবং কা জ্ঞানহীন দূষণের মধ্য দিয়ে মানুষ তাদের সুন্দর এ পৃথিবীতে ডেকে এনেছে এক মহাবিপর্যয়।

পৃথিবীর বুকে সঞ্চারণমান প্রাণ কত দিন টিকে থাকবে তা শুধু পদার্থবিদ্যার সূত্রের ওপরই নির্ভর করছে না, নির্ভর করছে আমাদের মানুষের ওপরও। প্রথমেই দরকার গণসচেতনতা। সচেতনতা তৈরি না হলে এ বিষয়ে ভালো ফল আশা করা বৃথা। এর সঙ্গে দরকার পরিবেশ দূষণকারীদের জন্য শাস্তির বিধান। সর্বোপরি সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখতে হলে পরিবেশসম্মত বাসস্থান অত্যন্ত জরুরি। এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনসচেতনতাই পারে পরিবেশ সুরক্ষা করতে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠলে মানুষের রোগবালাই লেগেই থাকে। এ ব্যাপারে মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সচেতন করতে হবে। সচেতনতাই সুরক্ষার মূল মাধ্যম হবে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় জাতীয় সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন ও সহজলভ্য হতে হবে। বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। গ্রামে-মফস্বলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব পণ্যের ব্যবহার রোগ-জীবাণু ছড়ায় এবং পরিবেশের ক্ষতি করে সেসব বর্জন করতে হবে। মানুষের অসচেতনতার কারণে বাড়িয়ে দিচ্ছে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি। ব্যবহার করার পর অবশিষ্ট ওষুধ ফেলে দিচ্ছে যেখানে-সেখানে। এতে করে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে ও অ্যান্টিবায়োটিকগুলো জীবাণু অপ্রতিরোধী হয়ে উঠছে। পলিথিনের ব্যবহার বেড়েছে, তা যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। খাবারের উচ্ছিষ্ট নিয়ে ফেলছে বাড়ির পাশের কোনো ড্রেনে। মশা জন্ম নিচ্ছে, ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু অথবা ম্যালেরিয়া। ওয়াসার পানির কারণেও ছড়াচ্ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। ফ্যাক্টরিগুলো ইটিপি ব্যবহার করে না, ফলে পানি দূষিত হচ্ছে এবং নদীর পানি ব্যবহার না করে করছে ভূগর্ভস্থ পানি। এতে দূষণের মাত্রা আরো বাড়ছে। সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।  
লেখক ঃ কলামিস্ট

[email protected]