চামড়া বাজারের অরাজকতা বন্ধ হোক

চামড়া বাজারের অরাজকতা বন্ধ হোক

রিপন আহসান ঋতু : সব জিনিসের দাম বাড়ে। লাগামহীন ভাবে দাম বাড়তেই থাকে। আর চামড়ার দাম কমতে কমতে একেবারে গোবরের চেয়েও কমে যায়। বর্তমান যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে গরুর চামড়ার চেয়ে গরুর গোবরের দাম বেশি। বাংলাদেশে এখন গরুর চামড়া নিয়ে যে অরাজকতা হচ্ছে ইতিহাসে আর কখনও তা হয়নি। পৃথিবীর অন্যকোন দেশেও তা হবার সুযোগ নেই। এমন কি মগের মুল্লুকেও চামড়া নিয়ে এরকম লাজ লজ্জাহীন চামড়াবাজি হয়েছে বলে মনে হয় না। প্রতিনিয়ত কমছে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম। গত ছয় বছরে ক্রমান্বয়ে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। দেশীয় বাজারে কোরবানির চামড়ার মূল্য টানা ৬ বছর ধরেই কমে আসছে। গত বছর যেখানে গরুর প্রতিবর্গফুট চামড়ার মূল্যছিল ঢাকায় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪৫ থেকে ৪০ টাকা। আর খাসির চামড়ার মূল্য ছিল ২২ টাকা থেকে ২০ টাকা ঢাকার অভ্যন্তরে। আর ঢাকার বাইরে ১৭ টাকা থেকে ১৫ টাকা।

 সেখানে আবারও এ বছর গরুর চামড়ায় কমানো হয়েছে প্রতি বর্গফুটে ৫ টাকা, আর খাসির চামড়ায় ২ টাকা। এটা কোনভাবেই ভাল আলামত নয়। কোনো বোকাও বিশ্বাস করবে না যে, এর পেছনে কোনো কারসাজি নেই। মূলত এ দেশে কাঁচা চামড়ার বিক্রেতা কারা? ক্ষুদ্র গরিব ব্যবসায়ী-ফড়িয়া এবং লাখো এতিমখানা ও গরিবদের ফান্ড পরিচালনাকারী মাদরাসাগুলোই হচ্ছে কাঁচা চামড়ার বিক্রেতা। হাতেগোনা বিত্তের কুমিরদের পেটের ক্ষুধা ভরার জন্য এই দুটি শ্রেণীকে ঠকাতে কারসাজির খেলাটা শুরু হয়েছে। চামড়া এমন একটি শিল্প পণ্য যা দিয়ে তৈরি করা যায় না এমন কোনো জিনিস নেই। যেকোনো ধরনের সৌখিন জিনিসই চামড়া দিয়ে বানানো যায়। পায়ের জুতা, কোমরের বেল্ট, গায়ের জ্যাকেট, হাতের ব্যাগ, পার্টস, যন্ত্রপাতির কভার, মানিব্যাগ ইত্যাদি আরো কত কি। চামড়ার জিনিসের কদরই আলাদা। সেজন্য দামেও বেশি। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে চামড়ার তৈরি জিনিসের কদর ও মূল্য নেই। আর এ কদর দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কিন্তু আমাদের দেশে দেখছি কিছুদিন ধরে তা উল্টোপথে হাঁটছে। এটি অর্থনীতির কোনো সূত্রই ফলো করছে না। অর্থনীতির সাধারণ সূত্রানুসারে পণ্যের চাহিদা বাড়লে তার দাম বাড়বে। ঠিক সেরকমভাবে দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই বিদেশেও এখন চামড়ার চাহিদা বাড়ছে, সেইসঙ্গে বাড়ছে দামও। কিন্তু বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার মূল্য দিন দিন কমেই চলেছে।

যা গত ৬ বছর আগেও ছিল ৮৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা। সমীক্ষা করলে দেখা যায়, পশুর চামড়ার দাম অব্যাহতভাবেই কমে আসছে। যা আগেই বলেছি। তাহলে দেশীয়ভাবে চামড়া উৎপাদন বাড়বে কি ভাবে? অব্যাহতভাবে দাম কমার কারণে প্রতিবছরই কোরবানির চামড়ার একটি অংশ নানা কৌশলে প্রতিবেশি দেশ ভারতে পাচার হয়। কারণ যখন দেশীয়ভাবে চামড়ার দাম কমে আসে, তখন বেশি দামের আশায় ফাঁক ফোকর গলে ভারতে চামড়া পাচার হয়ে থাকে। বিশেষ করে কোরবানির সময় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানির চামড়ার ব্যবসা করে থাকে। অনেক সময়ই সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের টাকায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে লবণ মিশ্রিত করে মজুদ করে। যা পরে সুবিধাজনক সময়ে প্রতিবেশি দেশে পাচার করে দেয়। যদিও পাচার ঠেকাতে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানাভাবে উদ্যোগ নিয়ে থাকে। তারপরও সময় সুযোগের সদব্যবহার করে দেশীয় চামড়া বিদেশে পাচার হয়ে থাকে। এই পাচার রোধ করতে না পারলে তিনগুণ উৎপাদন ক্ষমতার ট্যানারি শিল্পনগরী সাভারের চাহিদার পুরো কাঁচামাল পাওয়া সম্ভব হবে না। তখন সরকারকে দেশীয় শিল্পের উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার স্বার্থে সহজ শর্তেই কাঁচা চামড়া আমদানির সুযোগ দিতে হবে, এটাই বাস্তবতা। অথচ যৌক্তিক পর্যায়ে চামড়ার মূল্য নির্ধারিত হলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চামড়া দিয়েই নিজস্ব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ জন্য সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ট্যানারিমালিকদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। কিন্তু দেখা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মূল্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও বাদ সাধে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। ফলে উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খামারি ও সাধারণ গরুর মালিকরা।

এবার দেখলাম ঈদের আগে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দর ঘোষণা করলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। নির্ধারিত দর ছিল, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ঢাকায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং প্রতি বর্গফুট বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা। এই দরে ৩০ থেকে ৩৫ বর্গফুটের লবণযুক্ত বড় গরুর চামড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় ট্যানারি মালিকদের কেনার কথা। প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণে লবণ, গুদামভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ মোট ব্যয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এবং ১০০ টাকা মুনাফা ধরলেও ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় মাঠ পর্যায়ে কেনাবেচা হওয়ার কথা। কিন্তু মাত্র ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে ওই আকারের চামড়া। ১৫ থেকে ২৫ বর্গফুটের ছোট ও মাঝারি চামড়ার যৌক্তিক দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা হলেও ১০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি দর পাওয়া যায়নি কোথাও। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। নির্ধারিত দরের হিসাবে গড়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও তা ১০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যেই বেচাকেনা হয়েছে। গরুর মাথার চামড়ার দর ছিল মাত্র ৫ টাকা, যা অনেকে বিক্রি করতে না পেরে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন। লক্ষনীয় বিষয় হলো এর আগে কখনোই ঈদের আগের দিন চামড়ার দাম ঠিক করে দেওয়ার নিয়ম ছিলনা। স্থানীয় ক্রেতাদের চরমভাবে ঠকানোর এ প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে মাত্র ৫ বছর আগে থেকে। এটা করা হয়েছে এজন্য যে, যাতে করে চামড়ার দাম ইচ্ছামত কমানো যায়। চামড়ার প্রথম বিক্রেতা বা গ্রাম থেকে যারা চামড়া সংগ্রহ করেন তারা যেন মাঠে মারা যায়, সেজন্যই এই কি এই ব্যবস্থা করছেন কর্তৃপক্ষ।

] স্থানীয় চামড়া ক্রেতাদের ঠকিয়ে ট্যানারী মালিকদের কোটিপতি করার এক গোপন রহস্য এখানে লুকিয়ে আছে কি? এ কারণেই কি যত কারসাজি? এমন প্রশ্নই ঘুর পাক খাচ্ছে সর্বত্র। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে চামড়া বাজারের এমন অরাজকতা নিয়ে হচ্ছে নানা আলোচনা সমালোচনা। অনেকে আবার হাতে চামড়া জুতা ধরে ছবির ক্যাপশনে লিখছেন একখন্ড চামড়া দিয়ে বানানো এই জুতার দাম মাত্র ৬০০০ টাকা!!! আর পুরো একটা চামড়া বিক্রি করলাম ৩০০ টাকায়!! তার মানে দাঁড়ায় দেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাড়ছে রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়ার মূল্য বাড়ছে, বাড়ছে চাহিদা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কমছে বাংলাদেশের চামড়ার দাম। আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারতেও চামড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কারণ সেখানে দৈনন্দিন যে পরিমাণ চামড়ার প্রয়োজন হয় তা এখন জোগান দিতে পারছে না দেশটি। সেখানে ধর্মীয় কারণে গরু জবাই করা এবং গোমাংস বিলি ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেখানে পশু জবাই করতে পারছে না বলে সে দেশের চামড়া শিল্পের কারখানাগুলো চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ কাঁচা চামড়া তারা পাচ্ছে না। সে জন্য প্রয়োজন চামড়া আমদানি করা। আর সেখানে বাংলাদেশের এসব চামড়ার অনেক চাহিদা রয়েছে এবং রয়েছে উচ্চমূল্য।

 তৈরি পোশাক শিল্পের পর দেশের অন্যতম সম্ভাবনায় খাত চামড়া। এ খাতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন প্রায় শতভাগ। তৈরি পোশাক থেকে আমরা যত রপ্তানি আয় করি তার বেশির ভাগই চলে যায় খাত সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে। কিন্তু চামড়া খাতের জন্য শুধু প্রক্রিয়াজাত করতে কিছু কেমিক্যাল ছাড়া, পুরোটাই স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজিত অর্থাৎ রপ্তানি আয় যা হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই দেশে থাকছে। সম্ভাবনাময় এই চামড়া খাতের জন্য সুখবর নেই। গেল অর্থবছরে (২০১৭-১৮) আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৪ কোটি ডলার কমে রপ্তানি আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। যদিও ২০২১ সাল নাগাদ এ খাত থেকে ৫শ কোটি ডলার রপ্তানির আয়ের লক্ষ্য আছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্য ও পাদুকা রফতানি করে প্রায় ৫০ কোটি ডলার আয় করেছে। অথচ গত বছরের তুলনায় এবছর গরুর চামড়ার দর দাম কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার অজুহাত দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে স্থানীয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ ও মজুদকারী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা একজোট হয়ে চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

বাজার যাচাই না করে সরকারকে তারা বাধ্য করছে নিজেদের পছন্দমত দাম নির্ধারণে। এই অভিযোগের কিছুটা সত্যতা পাওয়া গেছে। চলতি বছরের জন্য ট্যারিফ কমিশন লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৬০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ১০ টাকা কমিয়ে ৫০ টাকা নির্ধারণ করে। গেল বছর আন্তর্জাতিক বাজারে ‘এ’ গ্রেডের প্রতি বর্গফুট ফিনিসড চামড়ার দাম ছিল দুই থেকে তিন ডলার বা ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা। চামড়া কেনা থেকে ফিনিসড বা ক্রাস্ট পর্যায়ে প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ খরচ পড়ে ১০০ টাকা। তারপরও চামড়ার দাম না বাড়ার পিছনে যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমাদের বিশ্বাস, সরকার ও ট্যানারিমালিকরা সমঝোতার ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে নিকট ভবিষ্যতে চামড়া খাতও রফতানি আয়ে বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩