চামড়া নিয়ে শিক্ষা হয়েছে

চামড়া নিয়ে শিক্ষা হয়েছে

আব্দুল হাই রঞ্জু : রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক এবং অভিবাসন আয়ের পরের স্থানটি দখলে রেখেছে চামড়া খাত। চামড়াজাত পণ্য ও চামড়া রফতানির খাতটি তৈরি পোশাক খাতের মতোই অবদান রাখার যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও শুধু টেকসই পরিকল্পনার অভাব এবং যুগোপযোগী চামড়া নীতিমালা প্রণয়ন না করায় যা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে টানা কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজারে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরও ঈদুল আজহায় গরিব এতিমদের হক কোরবানির চামড়ার দাম কম ছিল। তবে এ বছরের মত অসহনীয় দরপতন হয়নি। বলতে গেলে এ বছর চামড়া কেনার ক্রেতাই ছিল না। একমাত্র ভরসা ছিল মৌসুমি ব্যবসায়ী। যারা নানাভাবে অর্থ সংগ্রহ করে তৃণমূলে চামড়া কিনেছে। কিন্তু যে দামে চামড়া কিনেছে, সে দামে চামড়া বিক্রি করতে পারেনি। আবার এ বছর ঢাকায় গরুর চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা ও মফস্বলে যা ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় প্রতি বর্গফুট দাম সরকারিভাবে ঘোষণা হলেও তার চেয়ে অনেক কম মূল্যেই চামড়া বিক্রি হয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ে কোরবানির চামড়া যত্রতত্র ফেলে দেয়া হয়েছে। অনেকেই মাটির নিচে চামড়া পুঁতে ফেলেছে। যেহেতু চামড়া পচনশীল পণ্য, উপরে রাখলে গন্ধ ছড়াবে এবং পরিবেশ দুষণ হবে, সে কারণে অনেকেই মাটি খুঁড়ে চামড়া পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।


চামড়া পুঁতে ফেলাই কি শেষ সমাধান? চামড়া হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম একটি পণ্য। যে পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিদেশে। অথচ দামি সে পণ্য দেদার ফেলে দেয়া হয়েছে। এ লক্ষণ কোনভাবেই কাম্য নয়। কারণ সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য চামড়ার যে ভাবে কদর থাকার কথা, তা যদি হেলায় অবহেলায় নষ্ট করে দেয়া হয়, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব আমাদের অর্থনীতির জন্য হবে অশনিসংকেত। প্রতিবছর কি পরিমাণ গরু, ছাগল কোরবানি হবে, তার পরিসংখ্যান সরকারের হাতে রয়েছে। আর ট্যানারি মালিকগণ কি পরিমাণ চামড়া কিনতে পারেন, সে তথ্যও সরকারের নজরে রয়েছে। এ বছর কোরবানির ঈদের আগেই কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রায় ২৫ লাখ পিস কম চামড়া কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। প্রতিবছরই কমবেশি ১ কোটি পনের বিশ লাখ পশু কোরবানি দেয়া হয়। উল্লেখ্য কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের ধারনা ছিল, এ বছর চামড়ার দামে যেমন ধস নামবে, তেমনি ট্যানারি মালিকগণও গত বছরের তুলনায় কম পরিমাণ চামড়া কিনবে। সবমিলে লেজেগোবরে অবস্থা। সত্যিই কোরবানির চামড়া নিয়ে এ বছর নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।


নিজের চোখেই দেখলাম, মফস্বল এলাকায় ভাল মানের গরুর একটি চামড়া তিনশত টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচশত টাকায় বিক্রি হয়েছে। এত কমদামে চামড়া কেনার পরও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সে মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে পারেনি। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের এ বছর এমনভাবে লোকসান গুনতে হয়েছে, যেখানে অনেক ব্যবসায়ী দেনাদার হয়ে যাবেন। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়ার বাজারের দুরাবস্থা দেখে শেষ পর্যন্ত তড়িঘড়ি কাঁচা চামড়া রফতানির ঘোষণা দিয়েছে। আগেই বলেছি, পরিকল্পিত নীতিমালার অভাবে চামড়া খাতে এখন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এখানে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কি ঘুমে ছিল? তারা কি জানতেন না, এ বছর চামড়ার দরে ধস নামবে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে জড়িত ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনে সর্বস্বান্ত হতে হবে। তাহলে ঈদের আগে কেন কাঁচা চামড়া রফতানির ঘোষণা দেয়া হলো না? ঈদের আগে কাঁচা চামড়া রফতানির ঘোষণা দিলে হয়তো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না। শুধুমাত্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অদূরদর্শিতার কারণে লাখ লাখ পিস চামড়া নষ্ট হয়েছে। এমনকি প্রান্তিক ব্যবসায়ীদেরকে পুঁজি হারাতে হয়েছে। শুধু চামড়া খাতেই নয়, আমাদের দেশে যে কোন পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেই উপযুক্ত দরের অভাবে মানুষকে সর্বস্বান্ত হতে হয়।  


কাঁচা চামড়া রফতানির প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, ট্যানারি মালিকরা বিভিন্ন অজুহাতে বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা তাদের কাছে পাওনা রয়েছে। বিপুল পরিমাণ বকেয়া টাকা আদায় না হওয়ায় আমরা পুঁজির অভাবে ব্যবসা করতে পারছি না মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন, বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ। তিনি বলেন, আমরা যদি তাদের বকেয়া টাকা না দিয়ে থাকি, তাহলে তারা ব্যবসা করছেন কিভাবে? তিনি দাবি করেন, ২০১৭ সালের আগে ট্যানারি ব্যবসায়ীদের শতভাগ বকেয়া পরিশোধ করে দিয়েছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, সাভারে স্থানান্তরের ফলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ট্যানারি উৎপাদনে যেতে পারেনি। তাই কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের কিছু টাকা বকেয়া রয়েছে। কিন্তু সে জন্য তো চামড়ার দাম কমিয়ে দেওয়ার কারণ নেই। পাল্টা অভিযোগ করে তিনি বলেন, কাঁচা চামড়ার আড়তদররা সস্তায় চামড়া কেনার জন্য সিন্ডিকেট করে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের ঠকাচ্ছে।


এদিকে কাঁচা চামড়া রফতানির প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার অ্যান্ড লেদারগুডস এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট দিলজাহান ভুঁইয়া বলেন, দেশের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শিল্প দেশীয় চামড়ার ওপরই নির্ভরশীল। কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দিলে চামড়া শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিযোগ করে শিল্প-কারখানা স্থাপন করেছেন। দেশের চামড়া দিয়ে বড় জোড় তিন থেকে চার মাস করাখানাগুলোকে চালু রাখা সম্ভব হয়। এমতাবস্থায় কাঁচা চামড়া রফতানি হলে এ খাত ধ্বংস হয়ে যাবে মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রকৃত সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের প্রচন্ড অর্থসংকট চলছে, আমরা ব্যাংক ঋণও পাচ্ছি না। আমরা যদি সিন্ডিকেটই করব তাহলে পানির দামের চামড়া কিনবো না কেন? আসলে আমাদের কাছে অর্থ নেই, এটাই বাস্তবতা বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের ২২০টি ট্যানারি থেকে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর মধ্যে ৬৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ ছাগলের চামড়া, ২ দশমিক ২৩ শতাংশ মহিষের চামড়া ও ১দশমিক শুন্য ৫ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাত চামড়ার মধ্যে ৭৬ শতাংশের বেশি রফতানি করা হয় মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন।


গত ১৪ আগষ্ট ঢাকায় ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনের সভাপতি মোঃ শাহিন আহমেদ বলেন, কাঁচা চামড়া রফতানি করা হলে চামড়া শিল্প নগরিতে সাত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এমনকি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠীর রুটিরুজি বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ ফিনিসড লেদার অ্যান্ড এক্সপোর্টস অ্যাসোসিয়েসনের শংকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী বলেন, প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে।যাই হোক, এ শিল্পের সাথে জড়িত মৌসুমী ব্যবসায়ী, কাঁচা চামড়ার আড়তদার এবং ট্যানার্স মালিকদের স্বার্থ বিবেচনায় সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে যেভাবেই যুক্তি দেন না কেন প্রকৃত অর্থে চামড়ার প্রকৃত মুল্য নিশ্চিত করা যে সম্ভব হয়নি, যা সকলকেই স্বীকার করতেই হবে। এমনকি এ বছর যে পরিমাণ চামড়া ক্রেতার অভাবে নষ্ট হয়েছে, যা অস্বীকার করারও কোন জো নেই। ফলে মৌসুমী ব্যবসায়ী, কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্যানার্স মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় যৌক্তিক পর্যায়ে চামড়া নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এমনকি সকলের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে পুঁজির সংকট দুর করতে হবে। তা না হলে চামড়া খাতের সংকট আগামী দিনে আরো সংকটাপন্ন হবে। অবশ্য গত ২৮শে আগষ্ট বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার অভাবেই এবার কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এও বলেছেন, চামড়া নিয়ে এবার আমার শিক্ষা হয়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, এবারের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে একটি পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছি। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে চামড়া সংগ্রহে বড় ধরনের কোন সংকট তৈরি হবে না।  
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮