চলে গেলেন বরেণ্য চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন

চলে গেলেন বরেণ্য চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন

অভি মঈনুদ্দীন ঃ চলে গেলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ আমজাদ হোসেন। গতকাল বাংলাদেশ সময় আজ দুপুর ২.৫৭ মিনিটে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোহেল আরমানের সহধর্মিনী। টানা ১৬ দিনের চিকিৎসার পর আর তাকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তবে পারিবারিকভাবে এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি কবে আমজাদ হোসেনের মরদেহ দেশে আনা হবে।  একজন আমজাদ হোসেন, একাধারে অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার, সংলাপকার, গীতিকার, নাট্যকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক। ‘আমি আছি থাকবো, ভালোবেসে মরবো, দোহাই লাগে তোমার, আমারে পাগল কইরোনা’-আমজাদ হোসেনের লেখা এই গানটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা ববিতার সবচেয়ে প্রিয় গান। এই গানটি আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘সুন্দরী’ চলচ্চিত্রের গান। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ববিতা। ববিতার প্রিয় এই গানটির সুর ও সঙ্গীতায়োজন করেছিলেন আলাউদ্দিন আলী। একজন আমজাদ হোসেনকে নিয়ে কিছু কথা বলতে গিয়ে ববিতা তার প্রিয় গানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ আমজাদ ভাইয়ের অনেক চলচ্চিত্রে আমি অভিনয় করেছি। আমার ভীষণ প্রিয় একজন মানুষ। তারমতো এমন আবেগী মানুষ আমি আমার অভিনয় জীবনে খুব কমই দেখেছি। তার নির্দেশনায় প্রথম যখন আমি ‘নয়ন মনি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করি , তখন অভিনয়ের পূর্বে তিনি আমাকে বলেছিলেন, অভিনয় করে দেখুন, আপনার ভালোলাগবে আশাকরি। সত্যিই নয়ন মনি একজন অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকের কাছে আমজাদ ভাই আমাকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়েগিয়েছিলেন। চিরায়ত গ্রাম বাংলাকে তিনি এতো চমৎকারভাবে তুলে ধরতেন যা আর কেউই পারতেন না।

 ‘নয়নমনি’র পর সুন্দরী’, ‘‘কসাই’, ‘বড় বাড়ির মেয়ে’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি আমি। একটি বিশেষ কথা আজ বলতে চাই যারা সত্যিকার অর্থে বড় মাপের নির্মাতা তাদের মধ্যে বিশেষ কিছু গুনই থাকে যা সহজেই অন্য অনেকের চেয়ে তাকে আলাদা করতে সহায়তা করে। আমজাদ ভাই ঠিক তেমনি একজন গুণী মানুষ, নির্মাতা। আমজাদ ভাইয়ের মতো গুণী মানুষেরা আজীবন তার সৃষ্টি দিয়েই দর্শকের মাঝে যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন। আমজাদ ভাইয়ের মৃত্যুতে আমি সত্যিই অনেক কষ্ট পেয়েছি। আমাদেরকে সত্যিই নিঃস্ব করে চলে গেলেন আমজাদ ভাই। আল্লাহ আমজাদ ভাইয়ের পরিবারকে এই শোক সইবার ক্ষমতা দিন এবং আমজাদ ভাইকে যেন আল্লঅহ বেহেস্ত নসীব করেন।। ’ যদি এদেশের চলচ্চিত্রের মুক্তির সালের হিসে  করা হয় তবে সে হিসেব অনুযায়ী আমজাদ হোসেন বাংলাদেশের ত্রিশতম পরিচালক। যেখানে সবার আগে রয়েছেন আব্দুল জব্বার। আমজাদ হোসেনের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট, জামালপুরে। জামালপুরের গর্বিত সন্তান হিসেবেই তিনি বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীর কাছে চলচ্চিত্রের ম্যাধমে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। শৈশব থেকেই আমজাদ হোসেনের সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চার সাথে জড়িত হন। প্রথমেই তিনি অভিনয়ে নিজেকে তুলে ধরেন পাবনার সন্তান মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে। এরপরপরই তিনি অভিনয় করেন মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে। তবে এরপরের ইতিহাসটা একেবারেই অন্যরকম। বি বাড়িয়ার সন্তান সালাহ উদ্দিন আমজাদ হোসেনের লেখা নাটক ‘ধারাপাত’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এতে আমজাদ হোসেন নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর আমজাদ হোসেন জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ শুরু করেন। এভাবেই দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে ১৯৬৭ সালে তিনি নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। নাম ‘জুলেখা’। এরপর নূরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণ করেন ‘দুই ভাই’চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। তার পরিচালিত ব্যাপক দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘বাংলার মুখ’, ‘নয়নমনি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হীরামতি’,‘প্রাণের মানুষ’,‘সুন্দরী বধূ’,‘কাল সকালে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’ ‘গোলাপী এখন বিলেতে’। ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম মুক্তিযোদ্ধা পরিচালকদের অনুপ্রেরণায় বিএফডিসিতে পরিচালক সমিতি গঠিত হয়। কিন্তু এই সংগঠনটি বেশিদিন স্থায়ীত্ব লাভ করেনি। ১৯৮১ সালে সেই সমিতি আবারো যাত্রা শুরু করে। এই পুণঃরায় যাত্রা শুরুর সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আমজাদ হোসেন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সমিতির হয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

 বর্তমানে গুণী এই চলচ্চিত্র পরিচালক পরিচালক সমিতির আজীবন সদস্য হিসেবে আছেন। গুণী এই পরিচালক ১৯৭৮ সালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং ১৯৮৪ সালে ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। কিছুদিন আগে কথা হয় তার করতোয়ার সাথে। তখন আমজাদ হোসেন বলেছিলেন, ‘ সারাটি জীবন আমি দর্শকের ভালোলাগা , ভালোবাসার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। দর্শক আমার চলচ্চিত্র দেখার জন্য হলে গিয়েছেন। তাদের ভালোবাসায় আমি সিক্ত হয়েছি। আজীবন দর্শকের ভালোবাসার মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই। ’ আমজাদ হোসেন সত্যিই দর্শকের ভালোবাসার মাঝেই বেঁচে থাকবেন।  আমজাদ হোসেনের বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক ফারুক। আমজাদ হোসেন প্রসঙ্গে ফারুক বলেন,‘ আমজাদ ভাইকে নিয়ে কী বলবো! তার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু কথা ছাড়া তার সবইতো জানতাম আমি। আমরা দু’জন এক আতœা, এক মন, এক প্রাণ। হয়তো তারসঙ্গে আমার অনেক কিছুর অমিল হতেও পারে। কিন্তু মানুষকে শ্রদ্ধা করা, ভালোবাসা, সম্মান প্রদর্শন করা-এই বিষয়গুলোতে আমাদের দু’জনের প্রচ- মিল ছিলো। আমাদের আরো বহুদূর পথচলার কথা ছিলো। কিন্তু সেই পথচলা আমরা নিজেরাই ধ্বংস করে দিয়েছি। আমজাদ ভাই অনেক বড় মনের একজন মানুষ ছিলেন, অনেক বড় মাপের একজন নির্মাতাও তিনি। অপূর্ব সৃষ্টিশীল একজন মানুষ। আমাদের দেশে তারমতো চলচ্চিত্র পরিচালকের আদৌ জন্ম হবে কিনা সন্দেহ আছে।

 তাই তাকে হারিয়ে আজ আমরা শূণ্য হয়ে পড়েছি। এই শূণ্যতা পূরণ হবার নয়। ’ একজন আমজাদ হোসেন আমাদের বাঙ্গালী জাতির অহংকার। একজন আমজাদ হোসেন আমাদের চলচ্চিত্রের গর্ব, একজন আমজাদ হোসেন প্রবীণ শিল্পীদের অহংকার। একজন আমজাদ হোসেন নিজেই একটি ইন্ডাষ্ট্রি, যাকে নিয়ে নতুন প্রজন্ম গবেষণা করলে হয়তো নিজেদের মেধার বিকাশে তা কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন।  গত ৮ নভেম্বর সকালে আদাবরের বাসায় ব্রেন স্ট্রোক করেন আমজাদ হোসেন। সে সময় তাকে ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময়  হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের লাইফ সাপোর্টে ভর্তি ছিলেন। আমজাদ হোসেনের উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ৪২ লাখ টাকা প্রদান করেন। এরপর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই আজ দুপুর ২.৫৭ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭৬ বছর। তার মৃত্যুতে চলচ্চিত্রসহ শোবিজের নানা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ১৯৭৬ সালে ‘নয়নমনি’ চলচ্চিত্রের জন্য পেয়েছেন তিনটি জাতীয় পুরস্কার। তার হাতে ওঠে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার, শ্রেষ্ঠ প্রযোজক আর শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। বাংলাদেশ সরকার তাকে সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। আমজাদ হোসেনের দুই পুত্র নাট্য নির্মাতা সাজ্জাদ হোসেন দোদুল ও অভিনেতা-নির্মাতা সোহেল আরমান।