চলে গেলেন আলোর ফেরিওয়ালা

চলে গেলেন আলোর ফেরিওয়ালা

মোহাম্মদ নজাবত আলী : যে নিজের কর্ম ও সাধনার মাধ্যমে নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের মনে আলো জ্বালাতে মানব কল্যাণে কাজ করেন তিনিই তো আলোকিত মানুষ। আলোর অভিযাত্রী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এ সমাজে আলোকিত মানুষের সংখ্য খুবই কম। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। যারা সব সময় শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবেন অন্যের কথা, মানব কল্যাণের কথা তাদের মাথায় আসেনা। সবাই যেখানে শুধু নিজের স্বার্থ নিয়ে ভাবে সেখানে পলান সরকার ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। আলোর ফেরিওয়ালা। তাঁর চিন্তা চেতনা ছিল সমাজ কেন্দ্রিক। অন্যের ঘরে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে চেয়েছেন পলান সরকার।

সাদা মনের এ মানুষটি গত পহেলা মার্চ চলে গেলেন। রেখে গেছেন তাঁর মহতি উদ্যোগ। পলান সরকারের জন্ম ১৯২১ সালের রাজশাহী বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামে। তাঁর প্রকৃত নাম হারেজ উদ্দীন। কিন্তু তিনি পলান সরকার নামেই পরিচিত ছিলেন। নিজের টাকায় বই কিনে পাঠকের বাড়ী বাড়ী বই পৌঁছে দিয়ে তিনি তার নিজ এলাকায় বই পড়ার আন্দোলন গড়ে তোলেন। কারণ এ যুগের মানুষ শিক্ষিতজনরা এমনকি নতুন প্রজন্ম বই পড়তে চায়না। তাঁর এ মহতি উদ্যোগের জন্য ২০১১ সালে একুশে পদক পান। তার এ মহতি উদ্যোগের জন্য ২০০৭ সালে সরকারিভাবে তার বাড়ীতে একটি পাঠাগার করে দেয়া হয়। সারা দেশ থেকে তিনি জীবদ্দশায় অসংখ্য সংবর্ধনা পেয়েছেন। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষ্যে প্যারিস ভিত্তিক একটি সংগঠন স্পার্ক নিউজ ইতিবাচক উদ্যোগের  উপর লেখা আহ্বান করলে তিনি “আলোর ফেরিওয়ালা” নামে বই পড়ার আন্দোলন নিয়ে লেখাটি পৃথিবীর ৪০টি প্রধান দৈনিকে প্রকাশিত হয়।
 
পলান সরকার বই পড়ার আন্দোলনটি শুধু পাঠাগারের মধ্যে সিমাবদ্ধ না রেখে অন্যত্র ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন একটু অন্যভাবে। তিনি বাড়ী বাড়ী গিয়ে বই দিয়ে আসতেন। পড়া শেষ হলে আবার নতুন বই দিয়ে সেই পুরাতন বই ফেরত নিতেন। তিনি তার এ আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে পাঁচটি বিকল্প বই বিতরণ কেন্দ্র তৈরি করেন। সেখান থেকে স্থানীয় পাঠকরা বই নিয়ে যায়। পড়া শেষ হলে তারা নিজেরাই বই ফেরত দিয়ে আবার নতুন বই পড়ার জন্য সংগ্রহ করেন। দূরবর্তী কেন্দগুলিতে বই আদান প্রদানের ব্যাপারে তার ছেলে তাকে সাহায্য করতেন। নতুন প্রজন্মের মাঝে বই পড়ার আগ্রহ তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসাবে বই উপহার দিতেন। যারা পাঠাগারে  আসতেন, তারা নিজের মন রুচি অনুযায়ী বই পড়তেন। পলান সরকার এভাবে রাজশাহীর ৪০টি গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন, বই পড়তে আগ্রহ তৈরির জন্য অভিনব এক শিক্ষা আন্দোলন। যে আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মাঝে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা ও জ্ঞানের অগ্নিমশাল ছড়িয়ে দেয়া। গ্রামের বই বিমুখ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষগুলোকে জাগাতে চেয়েছিলেন।

 আলোকিত মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, তথ্য ও প্রযুক্তির যুগে বর্তমান শিক্ষিত পাঠক পাঠিকা অধিকাংশই বই পড়তে চায়না।  বই পড়তে ভালো লাগে না। তার পরিবর্তে মোবাইল ইন্টারনেট ল্যাপটপ তো রয়েছে। প্রকৃত বাস্তবতা হলো সেকালের মত একালে শিক্ষার্থীরা বই পড়তে চায়না। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের যুগে বইয়ের পরিবর্তে ইন্টারনেট ফেসবুকে আসক্তি বাড়ছে। অথচ প্রতি বছর একুশে বই মেলার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে পাঠক সমাজে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করা। আমাদের সমাজে বহু মনের মানুষ আছেন। তাদের মধ্যে কেউ প্রচার বিমুখ, কেউ আত্মকেন্দ্রিক, কেউ নিস্বার্থ, নিজের পরিশ্রম দ্বারা অন্যকে খুশি করাতে চান। পরোপকারি। নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে পরিশ্রমের দ্বারা অবক্ষয় মুক্ত সমাজ গড়তে নিজ কর্মসুচির দ্বারা আলোকিত করতে চান সমাজকে। শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে চান প্রতিটি ঘরে। সাদা মনের এসব মানুষ সাধারণত নির্লোভ হয়ে থাকেন। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজের মাঝে সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করতে চান। এজন্য যে পরিচ্ছন্ন চিন্তা ভাবনা থাকা দরকার পলান সরকারের তা ছিল।  

আমাদের দেশের প্রতিটি এলাকায় যদি একজন করে পলান সরকারের মত একজন আদর্শবান ও মহৎ উদ্যোগী মানুষ থাকত তাহলে
আজকের যুব সমাজ মাদক মুক্ত হত। বই পড়তে আগ্রহী হত। আমাদের সমাজ ক্রমান্বয়ে আলোকিত হত। সুস্থ বিনোদনের জন্য
বই পড়ার পরিবর্তে আজকের তরুণ- তরুণীরা মোবাইল ইন্টারনেট ফেসবুকে মেতে উঠেছে যা অপ্রিয় হলেও সত্য। কারণ, এর ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে এবং এর নেতিবাচক ব্যবহারে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা ও যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক দিকে যতটা উন্নতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে দেশের জ্ঞান- বিজ্ঞান ও তথ্য- প্রযুক্তি। কিন্তু সে অনুযায়ী বই পড়ার মানুষ তৈরি হয়নি।
তাই অপরাধমুক্ত সামাজিক অবক্ষয়মুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের যেতে হবে পলান সরকারের আদর্শ ও মহৎ উদ্যোগী মানুষটির কাছে। যেখানে তিনি স্ব উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন কয়েকটি বই পড়ার কেন্দ্র। পলান সরকার আমাদের সমাজের আলোর বাতিঘর।
বাংলাদেশের অধঃপতিত তরুণ সমাজকে রক্ষা ও তাদের নেতিবাচক মনের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অভিভাবক পিতা-মাতার সচেতনতার অভাবে উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়া ও অসৎ সঙ্গদোষে এবং বইমুখী না হয়ে তারা ভবিষৎ উজ্জল জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিপথগামী হচ্ছে। এক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্বই প্রধান। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধু সুলভ আচরণ করে তাদের তথ্য প্রযুক্তির পাশাপাশি বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের শিক্ষা নেয়া দরকার পলান সরকারের আলোকিত উদ্যোগ থেকে। বইমুখী হয়ে বইকে জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বেছে নেয় তাহলে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে আজকের যুগের যুব-সমাজ তরুণ-তরুণীরা। পলান সরকার বহুকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের সমাজে। আলোকিত মানুষের মাঝে।
লেখক : শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১