চলনবিলের শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ জরুরি

চলনবিলের শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ জরুরি

এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল : মিঠা পানির মাছের জন্য বিখ্যাত চলনবিল। তেমনি চলনবিলের মিঠাপানির মাছের শুঁটকির চাহিদাও দেশ বিদেশে রয়েছে। কিন্তু ওই শুঁটকি তৈরির কার্যক্রম সনাতন পদ্ধতিতেই রয়ে গেছে বছরের পর বছর। বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল ‘চলনবিল’ এলাকায় স্বাস্থ্য সম্মত পদ্ধতিতে দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রচেষ্টা এক সময় শুরু হলেও প্রকল্প নির্ভর ওই কার্যক্রম প্রকল্প মেয়াদ শেষে প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় দাতা সংস্থার অর্থে পরিচালিত প্রকল্পটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলনবিল এলাকায়  চলেছিল। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে না হতেই শুঁটকি তৈরির সাথে জড়িত চাতাল মালিকরা ফিরে গেছেন আবার সেই সনাতন পদ্ধতিতে শুটকি তৈরিতে। মূলতঃ সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, নাটোরের সিংড়া গুরুদাসপুর ও নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় বিস্তীর্ণ বিল থেকে পাওয়া দেশীয় প্রজাতির মাছের শুটকি তৈরির বড় ক্ষেত্র। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে, বৃহত্তর চলনবিলে প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ১৬ টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খাল রয়েছে।

মিঠা পানির মাছের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয় এক সময়ের  চলনবিল। এ সময় বিভিন্ন প্রজাতির শুটকি তৈরির উপযোগী সুস¦াদু দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। সেই মাছ শরৎ হেমন্ত এমনকি শীতকালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলনবিলের বিভিন্ন প্রজাতির মাছের যেমন টেংরা, পুটি, টাকি, ঢেলা, মওলা, চেঁলা, ইছা, বোয়াল, শোলসহ ১৫ থেকে ১৮টি প্রজাতি মাছের তৈরি শুঁটকির চাহিদা রয়েছে দেশ বিদেশে। হান্ডিয়াল বিলের শুঁটকি ব্যবসায়ী গোপেন হালদার  শুটকি প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণ বিষয়ক আলোচনায় এমনটা জানান। এছাড়া চলনবিলের মাছের শুঁটকি পার্শ্ববর্তী ভারত সহ আমেরিকা, মালেশিয়া, সৌদি আরব, বাহারাইন, কাতার ও দুবাই সহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে যাতে করে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এদিকে রাজশাহী মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো:শাহীনুর রহমান জানান, বৃহত্তর চলনবিল  ও তার প্লাবন ভূমিতে প্রতি বছর গড়ে চার শ থেকে সাড়ে চার শ মেট্রিক টন দেশীয় প্রজাতির শুটকি উৎপাদন হয়ে থাকে।  যার বাজার মূল্য টাকার অংকে প্রায় ২৬ থেকে ৩০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ করে শুটকি বিক্রি বাড়ানো সম্ভবপর। প্রাচীনকাল থেকেই চলনবিল এলাকার জেলেরা সনাতন পদ্ধতিতে মাছের শুটকি করে আসছেন। এ জন্য তারা উঁচু বাঁশের মাঁচা তৈরি করে , কাঁচা মাছ  রোদে শুকিয়ে শুটকি তৈরি করে থাকেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাছের পচন রোধে এবং পোকা ও মাছি মুক্ত রাখতে অনেক সময় কীটনাশক সহ রাসায়নিকজাত দ্রব্য মেশানোর অভিযোগ  উঠলে শুটকির বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে । এমনকি এ কারণে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুঁটকি তৈরি করার জন্য ২০১৪ ইং সালে চলনবিলের চাতাল মালিকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একটি প্রকল্প হাতে নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ)। ২০১৬ইং সালে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটিতে প্রকল্পটি পরিদর্শনে আসেন মালেশিয়ার কেব্যাংস্যাং ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড.মু. ইউসুফ মাসকাত, ভারতে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.সুশান্ত কুমার চক্রবর্তী সহ বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তরের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ। তারা প্রকল্পটি দেখে আশ্বস্ত হওয়ায় এবং  পরিচ্ছন্ন পরিবেশে দেশীয় প্রজাতির মাছের শুটকি উৎপাদন করায় সে সময় এর চাহিদাও বৃদ্ধি পায় বলে জানায় একাধিক শুটকির আড়তদার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো গত ২০১৬ ইং সালেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই চাতাল মালিকরা প্রকল্প সহযোগীতা না পেয়ে তারা ফের তাদের নিজস্ব সনাতন পদ্ধতিতে শুটকি তৈরী শুরু করেন। ""
এ ব্যাপারে মহিষলুটি শুটকি আড়তের মালিক আব্দুস সালাম জানান, দেশে-বিদেশে শুটকির চাহিদা থাকলেও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তারা হতাশ। তিনি দাবী করেন চলনবিল দেশীয় প্রজাতির মাছের শুটকি উৎপাদনকারীদের সরকারি সহায়তা, যেমনঃ স্বল্প সূদে ব্যাংক ঋণ, প্রশিক্ষন, এমনকি প্রণোদনা দিলে উন্নত প্রযুক্তিতে স্বাস্থ্যসম্মত শুটকি উৎপাদন কাজে সুফল পাওয়া যাবে।তিনি “হেকেপ” প্রকল্প প্রসঙ্গে বলেন, স্যাররা এসে আমাদের সহায়তা দিয়েছিলেন বলে আমরা স্বাস্থ্য সম্মত পদ্ধতিতে শুটকি তৈরি করেছি। কিন্তু এখন কোন প্রকার সহায়তা না মেলায় আমরা নিজস্ব পদ্ধতিতেই শুটকি তৈরি করছি। হেকেপ প্রকল্পের তৎকালীন উপ- প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ফৌজিয়া এবিদ ফ্লোরা বলেন, চলনবিলের শুটকি মানসম্মত পদ্ধতিতে তৈরির জন্য হেকেপ ২০১৪ সালে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালে। আসলে এ বিষয়ে  সবার আগে সরকারকেই  এগিয়ে আসতে হবে। উৎপাদনকারীদের ঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। সেই সাথে স্থানীয় বাজার তৈরি ও আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদন করা গেলে দেশী বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এর চাহিদা বৃদ্ধি পাবে।
লেখক ঃ প্রভাষক-কলামিষ্ট
[email protected]
০১৭১২-২৩৭৯৩৩