চলনবিলে সরিষা ফুল থেকে মধু

চলনবিলে সরিষা ফুল থেকে মধু

এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল : ‘‘মৌমাছি , মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি দাঁড়াও না একবার ভাই। ওই ফুল ফোটে বনে যাই মধু আহরণে দাঁড়াবার সময়তো নাই। ’’........ প্রয়াত শ্রদ্ধেয় কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের কবিতাটি মনে পড়ে চলনবিলের বিস্তীর্ণ সরিষার মাঠ দেখে। হাজার হাজার হেক্টর জমির সরিষার ফুলে ভর করে আছে কোটি কোটি মৌমাছি। মূলতঃ পরিশ্রমী ওই মৌমাছি গুলোই বিন্দু বিন্দু মধু সংগ্রহ করে ভরে তুলছে শত শত মৌচাষীর মৌবাক্স। আর মৌবাক্সের মধূ থেকে অর্থ উপার্জন করে অনেক মৌচাষী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এরকম চিরচেনা দৃশ্য এখন বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল চলনবিলের হলুদ বর্ণের সাজানো মাঠেই শোভা পাচ্ছে। যা দেখার মত।  চলনবিল হচ্ছে দেশের অন্যতম শস্য ভান্ডার। হরেক রকম ফসলের আবাদে চলনবিল অঞ্চলের কৃষকের ঘাম ও  শ্রম একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।  যেমন, বিনা চাষে রসুনের চাষাবাদ চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদেরই সৃষ্টি। বিশেষ করে গত দেড় দশকে রসুনের চাষাবাদে চলনবিলের নাটোর জেলার গুরুদাসপুর , সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।  আবার ভূট্টা, সরিষা, আলু, মশলা জাতীয় আবাদ কৃষককের নানা চাষাবাদে বৈচিত্র্যের কথাই স্মরণ করে দেয় চলনবিলের কৃষকের হাতে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার প্রেক্ষাপট। আশির দশকের পূর্বে এক সময় চলনবিলে ৬-৭ মাস বন্যার পানিতে ডুবে থাকতো বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ। মূলতঃ সে সময় রবি শস্য আবাদ তেমনটি হতো না। বর্ষাকালে আমন ধান আর শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান কেন্দ্রীক চাষাবাদেই কৃষক স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন।

 এ থেকে চলনবিলের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্রচাষীদের অর্থনৈতিক ভিত্তি অত মজবুত ছিল না।  কিšুÍ গত দুই থেকে তিন দশকে ১৯৮৪,১৯৮৮ ও ২০০৪ সালের পর চলনবিলে বড় বন্যা হয়নি। আর বন্যা না হওয়ার কারণে চলনবিলের কৃষক তৃতীয় আবাদ রবিশস্য মৌসুমে তাদের ফসল চাষাবাদে নতুন বৈচিত্র্য আনেন। তার মধ্যে সরিষার চাষাবাদ একটি। গত বিশ বছরে চলনবিলের কৃষক হাজার হাজার হেক্টর জমিতে বিশেষ করে টরি -৭, বারি-১৪, বারি-১৫, বিনা -১৪ ও দেশী জাতের সরিষার চাষাবাদে বিপ্লব এনেছেন। আর সরিষা ফুল কেন্দ্রিক হাজার হাজার টন মধূ সংগ্রহ চলনবিলের কৃষককের আবাদে অর্থনৈতিকভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের নতুন করে  আরেকটি দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনকেন্দ্রিক বাওয়ালীদের মধূ সংগ্রহের পর সম্ভবত চলনবিলাঞ্চলে রবি শষ্য মৌসুমে সরিষা ফুল থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মৌচাষীরা যে বিশুদ্ধ মধূ সংগ্রহ করেন তা আর দেশের অন্য কোথাও হয়না বললেই চলে। আর এদিকে ইতিমধ্যেই বিশুদ্ধ মধুর তীর্থস্থান খ্যাত চলনবিলে সরিষার ফুল কেন্দ্রিক মধু সংগ্রহের উৎসবে যোগ দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ৪৫০-৫০০ শতাধিক মৌচাষী।

 দুর-দুরান্ত থেকে মধু সংগ্রহের জন্য চলনবিলের প্রত্যন্ত এলাকায় বিশেষ করে যে সকল ফসলি মাঠে সরিষার আবাদ হয়েছে সেই সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য হাজার হাজার মৌবাক্স নিয়ে মাঠেই আস্তানা গড়েছেন শত শত মৌচাষী। যা দেখার মত দৃশ্য বটে। মূলতঃ অর্থনৈতিকভাবে লাভের আশায় মৌবাক্স নিয়ে বিলের ফসলি মাঠে অবস্থান করা একাধিক মৌচাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় মধু সংগ্রহ গত বছরের তুলনায় দ্বিগুন হতে পারে। চলনবিলে  মধূ সংগ্রহের অন্যতম জায়গা তাড়াশ উপজেলার  কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, সরিষার ফুল থেকে চলনবিল এলাকায় অবস্থান করা মৌচাষীরা মৌসুম শেষে প্রায় ১০০ মেঃ টনের উপরে মধু সংগ্রহ করবেন। অবশ্য এর জন্য অনুকুল আবহাওয়া থাকা চাই। এছাড়া এর আর্থিক মূল্য কয়েক কোটি টাকা। সরেজমিনে চলনবিলের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, এ অঞ্চলে শীত মৌসুমকে সামনে রেখে রবি শস্য সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহের উৎসব শুরু হয়েছে যা চোখে পড়ার মতো। দৃশ্যমান মৌবাক্স দেখে মনে হয় চলনবিল মধু সংগ্রহের একটি তীর্থস্থান এমনটি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা গুরুদাসপুরের  শাহ আলম (৪৬)। তিনি আরো জানান, মূলতঃ রংপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মৌচাষীরা মৌবাক্স নিয়ে বিস্তীর্ন মাঠে সরিষা ফুলের সমারোহে মৌবাক্স পেতে রেখে মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবার এদের সাথে এলাকারও বিপুল সংখ্যক মৌচাষী মধু সংগ্রহে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। কৃষি অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, শস্যভান্ডার খ্যাত বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল চলনবিলের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া ও নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় রবিশস্যের চলতি মৌসুমে প্রায় ৫৫-৬০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের নিবিড় সরিষার আবাদ করা হয়েছে।

 ইতিমধ্যে বিলপাড়ের নয়টি উপজেলার বিভিন্ন ফসলী মাঠে সরিষার গাদা গাদা হলুদ বর্ণের ফুলে  ভরে উঠেছে।  আর সরিষা ফুলে ভর করেছে  মৌমাছিরা। তাদের গুঞ্জনে অপরূপ সাজে সেজেছে চলনবিলের কৃষকের সরিষার ক্ষেত। এ ক্ষেতেই দেড় থেকে দু’মাসের জন্য মধু সংগ্রহের কাজে নেমেছেন প্রায় ৪৫০-৫০০ শতাধিক মৌচাষীরা।  কামারশোন গ্রামের পশ্চিম মাঠের কথা হয় নাটোরের গুরুদাসপুরের মৌচাষী সাইফুল ইসলাম ও মাসুদ রানার সাথে। তারা বলেন, চলনবিল অঞ্চলে সরিষার ফুল থেকে এ মৌসুমে নয় উপজেলায় সরিষার মাঠে থাকা কয়েক শতাধিক মৌচাষী গড়ে তাদের হিসেবে ১১০-১১৫ মেঃ টন বিশুদ্ধ মধু সংগ্রহ করতে পারবেন। যা কৃষি অর্থনীতিতে বড় একটা অংশ বটে। কথা হয়  তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, তার উপজেলাতেই এ বছর সরিষার ফুল থেকে ২০-২২ মেঃ টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। আর এ থেকে উপার্জিত অর্থ মৌচাষীদের অর্থনৈতিক ভীতকে শক্তিশালী করবে।  রংপুর থেকে চলনবিলের মাকড়শোন গ্রামের মাঠে আসা মৌচাষী লিয়াকত আলী (৫৫) জানান,  বাণিজ্যিক ভাবে  মৌ চাষীরা মৌবাক্স থেকে মধু সংগ্রহের এ  উৎসবে অর্জিত মধু ২২০ থেকে ২৫০ টাকা লিটারে বিক্রি করবেন। বাজার ভাল থাকলে  এ র চেয়ে বেশী দাম পেতে পারি। তিনি আরো জানান, প্রতিটি মৌবাক্স থেকে ৭ দিন অন্তর অন্তর সোয়া লিটার থেকে দেড় লিটার পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা সম্ভব। আর এ সকল মধু দেশের বিভিন্ন নামী দামী মধু বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান কিনে থাকেন। যা প্রক্রিয়া ও প্যাকেট জাত করে উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি করবেন। তবে মৌচাষীরা প্রাথমিক ভাবে সরিষা ফুল থেকে  যে মধু সংগ্রহ করবেন  এ থেকে আয়ের টাকায় শত শত মৌচাষীর সংসার পরিচালনায় স্বাচ্ছন্দ আসবে। চলনবিল ঘুরে আরো দেখা গেছে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করতে হাজার হাজার মৌবাক্স ফসলী মাঠের স্থাপন করে আস্তানা গেড়ে বিশুদ্ধ মধু সংগ্রহ করে জারকিনে ভরে রাখছেন। এরপর পাইকাড়রা মাঠ থেকেই মৌচাষীদের সিংহভাগ মধু কিনে নেবেন। এছাড়া বিভিন্ন  শহরে পাইকাড়রা সরিষার ফুল থেকে সংগ্রহ করা মধু কিনবেন।

ভাঙ্গুড়ার ময়দান দিঘী এলাকার মৌচাষী দিপংকর মধু সংগ্রহের কাহিনী জানান, তিনি বলেন, মৌচাষীর প্রতিটি মৌবাক্সে একটা করে রানী মৌমাছি থাকে। রানী মৌমাছির মাতৃত্বের  গন্ধ পেয়ে মৌমাছিরা মৌবাক্সে ছোটাছুটি করে থাকে। তিনি আরো জানান, রানী মৌমাছির এই মাতৃত্বের গন্ধ কয়েক কিঃ মিঃ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকায় মৌমাছিরা ছুটে আসে মৌবাক্সে। আর তারাই সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে পূর্ণ করে  মৌচাষির মৌবাক্স। প্রসঙ্গে  তাড়াশ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, তার কর্ম ্এলাকায় এ বছরে মধূ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২২ মেট্রিক টন। আর পুরো চলনবিলে এবছরও রেকর্ড পরিমাণ মধু সংগ্রহের আশা করছেন মৌচাষীরা। তার কথায় সায় দিয়ে একাধিক কৃষক বলেন, চলনবিল অঞ্চলে সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহের ফলে একদিকে যেমন বিশুদ্ধ মধু পাওয়া যাচ্ছে তেমনি কৃষি অর্থনীতিতে রবিশস্য সরিষার আবাদ বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে চলনবিল অঞ্চল থেকে শত শত  মৌচাষীরা কোটি কোটি টাকার মধু সংগ্রহ করে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করছেন।  এক সময় সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহের বিষয়টি বেশীর ভাগ মৌচাষীদের ধারনায় ছিল না। অথচ গত এক দশকে চলনবিলের বিস্তীর্ণ ফসলী মাঠ থেকে সরিষার ফুল কেন্দ্রিক মধু সংগ্রহের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এরই ধারবাহিকতায় জীবন-জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৌচাষীরা প্রায় দুই মাসের জন্য প্রত্যন্ত বিলের খোলা আকাশের নিচে আস্তানা গেড়ে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করছেন। তা যেন ঝিনুক থেকে মুক্তা আহরনেরই মতই।
লেখক ঃ প্রভাষক-কলামিষ্ট
[email protected]
০১৭১২-২৩৭৯৩৩