চলনবিলে বর্ষা শেষে শুঁটকি চাতালে মাছের অভাব !

চলনবিলে বর্ষা শেষে শুঁটকি চাতালে মাছের অভাব !

আব্দুল মান্নান পলাশ, চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি : বর্ষাকাল সংক্ষিপ্ত হচ্ছে প্রতিবছর। যোগাযোগের উন্নয়ন হয়েছে। মাছ দ্রুত চলে যাচ্ছে শহরে। নির্বিচারে মাছ নিধন বাড়ছেই। ফলে চলনবিলে বর্ষাশেষে শুঁটকির চাতালে মাছের অভাব দেখা দিয়েছে। এই বিলে তাজা মাছের পাশাপাশি শুঁঁটকি মাছের ঐতিহ্যেও টান পড়েছে।বর্ষাশেষে এ কার্তিকেই বিলের পানি কমতে শুরু করে। চাতালিরা বিলপাড়ের বিভিন্ন স্থানে মাছ শুকোতে চাতাল ফেলেন। তবুও চলনবিলের শুঁটকির ঐতিহ্য এখনও হারিয়ে যায়নি। এখনও এ সময় বিলের বাতাসে নাক পাতলে শুঁটকি মাছের ম ম গন্ধ ঢুকে পড়ে। দেশের সবচেয়ে বৃহৎ জলাভূমি উত্তরাঞ্চলের মিঠে পানির মৎস্য ভান্ডার চলনবিল। এই বিলের সুস্বাদু শুঁটকি মাছের চাহিদা দেশে-বিদেশে। রফতানি হচ্ছে আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে।

ব্রিটিশ কোম্পানী সরকার চলনবিলের এই মাছ কলকাতা নেয়ার জন্য ১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মান করে। তখন চলনবিলের সাথে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ী থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ২০০২ সালে চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বনপাড়া-হাটিকুমরুল-যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়ক। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপ কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তৎকালে বিলের আয়তন ছিল ১৪২ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারাবছর পানি জমে থাকত।

চলনবিলে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০ অস্থায়ী শুঁটকির চাতাল। গুরুদাসপুরের সাঁতগাড়ী গ্রামের ব্যবসায়ী নান্নু মিয়া শুঁটকির চাতাল গড়েছেন তাড়াশের মহিষলুটি মাছের আড়তের পাশে। তিনি জানান, গত বছর তার চাতালে ৩৫০ থেকে ৪০০ মণ শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। এবার মাছের অভাবে গতবারে অর্ধেক শু^টকিও হবে না। তিনি জানান,   সৈয়দপুর, নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ীরা এসে চাতাল থেকেই শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্র গুলো থেকে ধারনা পাওয়া গেছে, চলতি শুঁটকি মৌসুমে চাতাল থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ১০০ থেকে ১১৫ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, শুঁটকির মান ভেদে এ, বি, ও সি, গ্রেডে বাছাই করা হয়।

 এ গ্রেডের(ভালো মানের)শুঁটকি মাছ আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ ২৫ টি দেশে রফতানি করা হয়। চাটমোহরের নটাবাড়ীয় গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ জানান, তিন থেকে ছয় লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে শুঁটকি ব্যবসা শুরু করা যায়। অভিযোগ রয়েছে, বিলে পানি কমতে থাকলে বিভিন্ন এলাকার জলমহাল গুলোতে মৎস্যজীবী সমিতির আড়ালে-আবডালে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা বেড়াবাঁধ দিয়ে সোঁতিজাল পেতে নির্বিচারে মাছ নিধন করেন। পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচি, বাইম, বোয়ালসহ প্রায় ৩৫ প্রজাতির মাছ। এসব মাছই চাতালিরা কিনে অথবা নিজেরা চাতালে শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদন করেন।

ননুয়াকান্দি গ্রামের সবিতা, তাহমিনা, রমজান আলী, সমশের মিয়াসহ বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ শুঁটকি শ্রমিক জানান, তিন কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি তৈরি হয়। প্রকার ভেদে শুঁটকির বাজারমূল্য ৩০০ টাকা থেকে ১,২০০ টাকা। শুঁটকির আড়তদারা জানান, মহাসড়ক নির্মানের আগে চলনবিল থেকে আহরিত বিপুল পরিমাণ মাছ অবিক্রিত থেকে যেত। এসব মাছ পরে শুঁটকি করা হতো অথবা ফেলে দেয়া হতো। শুঁটকি চাতালিদের বিরুদ্ধে অনেকদিন থেকে একটি গুরুত্বর অভিযোগ চালু রয়েছে। তাহলো শুঁটকি মাছের পোকা ও পচনরোধে উচ্চ দ্রবণীয় কীটনাশকের ব্যবহার।