চকবাজার ট্র্যাজেডি

চকবাজার ট্র্যাজেডি

অলোক আচার্য : একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে দেশবাসী যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর তখন পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুরো জাতি হতবিহবল, স্তম্ভিত। সবার চোখ ছিল টিভি পর্দায়। একের পর এক মৃতহদেহ, পোড়া, আধপোড়া। কত মানুষের স্বপ্ন নিমেষেই ছাই হয়ে গেল। এক স্বামী তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী নামতে পারেননি জন্য নিজেও পুড়েছেন। আহারে! তাদের সন্তান তাদের ভালোবাসা সব পুড়ে গেল নিমিষেই। দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে আগুন নিভে যেতে থাকে। সেই সাথে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে পুড়ে যাওয়া স্বপ্নের সংখ্যা। নিমতলীর পর চকবাজার। দুই এলাকার দুরত্বও বেশি নয়। আগুনের সূত্রপাত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। আর আগুন দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করেছিল কেমিক্যালের কারণে। নিমতলীতেও ভয়াবহ আগুনের পেছনে এই কেমিক্যাল ছিল। আমাদের দেশে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ডে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়।

 নিমতলীর এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৪ জন মারা যাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি সেখান থেকে রাসায়নিক গুদাম সরানোসহ ১৭টি সুপারিশ করেছিল। তারপর বহু বছর পার হয়ে গেছে। সুপারিশ কাগজেই রয়ে গেছে। রাসায়নিক গুদাম যেভাবে ছিল সেভাবেই রয়ে গেছে। তারপর আবার এই চকবাজার ট্রাজেডি। এবারও তদন্ত কমিটি হয়েছে। সেই সুপারিশ এবং তা বাস্তবায়নের কথা ঘুরেফিরেই আসছে। কারণ সুপারিশ যদি বাস্তবায়িত না হয় তাহলে সেই সুপারিশে মানুষের লাভ কোথায়। কোন ঘটনা থেকে কেবল শিক্ষা নিয়ে বসে থাকলেই পরবর্তী ঘটনা আটকানো যায় না। ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তা যেন আর না ঘটে বা ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় তা বাস্তবায়ন করাই আসল কাজ। নিমতলীর অগ্নিকান্ডের পর চকবাজারের অগ্নিকান্ড আমাদের নতুন করে শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি পুরনো অবহেলা মনে করিয়ে দিল। কোন দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কি পরিণাম হতে পারে চকবাজারের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আগ্নিকান্ডের সূত্রপাতের উৎস হিসেবে মতভেদ শোনা গেলেও গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্ফোরণের কথাই বেশ জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে। এই গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্ফোরণে মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দেশে একেবারেই কমন। যানবাহনে মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো খুব সাধারণ একটি ঘটনা। বলা হয় মেয়াদ উত্তীর্ণ একটি সিলিন্ডার একটি বোমার মত মারাত্বক।

 চলন্ত গাড়িতে এরকম বোমা নিয়ে দেশের অনেক স্থানেই ঘুরে বেরাচ্ছি আমরা। যে কোন সময় আমি বা আপনি যে গাড়িতে চড়ে বসে আছেন নিশ্চিন্তে গন্তব্যে যাবার জন্য হয়তো সেটিতেই কোন দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। এরকম বহু ঘটেছে আমাদের দেশে। গাড়িতে মেয়ায় উত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার বহনের পাশাপাশি বাড়িতেও কিন্তু এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বহু অগ্নিকান্ডের ঘটনা এবং তার ফলশ্রুতিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও ব্যাবস্থা গ্রহণ করা যায়। চকবাজারে আগুন দ্রুত ছড়ানো এবং ভয়াবহতার পেছনে কেমিক্যালের প্রভাব রয়েছে। যে স্থাপনায় মূলত আগুন লেগেছে সেখানকার বেসমেন্টে প্রচুর কেমিক্যালের ড্রামের অস্তিত্ত পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হলো একটি রাসায়নিক পল্লী তৈরির কাজ আর কতদূর? অথচ এরকম একটা ঘিঞ্জি স্থানে কেমিক্যাল ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ। নিমতলীর মত একটি ভয়াবহ ট্রাজেডি ঘটার পর খুব দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি আলাদা স্থানে কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে নেয়ার কথা ছিল। এরকম বহু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আমাদের চোখের সামনেই হয় এবং কিছুই হবে না ভেবে মেনেও নেই। তবে দুর্ঘটনা ঘটার পর আর করার কিছুই থাকে না। নিমতলী ট্র্যাজিডিও দেখতে দেখতে আট বছর পেরিয়ে গেছে। পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে ’বিসিক কেমিক্যাল পল্লি’ নামের ২০২ কোটি টাকার একটি অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্প্রতি কাজ শুরু করেছে বিসিক। আগুনের ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে যে কেমিক্যাল দায়ী যদি তা সরিয়ে নেয়া যায় তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো আর কোন নিমতলী বা চকবাজারের মত হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হতে হবে না দেশবাসীকে।  অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। না হলে নিমতলী বা চকবাজারের মত দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলাম লেখক
[email protected]
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬