গ্রামের মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব কারা নেবেন..

গ্রামের মানুষের  চিকিৎসার দায়িত্ব   কারা নেবেন..

রবিউল ইসলাম (রবীন): অপ্রিয় হলেও সত্য যে গ্রাম বা মফস্বলে বিভিন্ন পেশার অনেক মানুষ থাকলে বা দায়িত্ব পালন করতে চায় না। বিশেষ করে ’বিখ্যাত বা সেলিব্রেটিরা’ তো নয়।  ’গ্রামে থাকা সম্ভব নয়’- এই মনোভাব নিয়ে এক দৌড়ে কেউ কেউ ঢাকা যেতে চান। রাজনীতিবিদরাও কালে ভদ্রে গ্রামে আসে। ঈদ বা পূজা পার্বণ ছাড়া তাঁরা রাজধানী  ছাড়েন না। আর আসেন নির্বাচনের সময়। বাংলাদেশের অনেক কিছুই রাজধানী ঘিরে। উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা সহ অনেক উন্নত কিছু বলতে গেলে সেখানেই। সমস্ত ক্ষেত্রে বিখ্যাত হওয়ার প্রায় একমাত্র ঠিকানা রাজধানী। অনেকে মনে করে রাজধানীতে না থাকলে ব্যাপক অর্থ উপার্জন হয় না। বিখ্যাত হওয়া যায় না। সেলিব্রেটি হওয়া যায় না।  আরাম আয়েসের কথা নাই বা তুললাম। সুতরাং রাজধানী ছাড়া যাবে না। কোন কারণে চাকরি ক্ষেত্রে মফস্বলে যদি পোষ্টিং হয়েই যায়, কিভাবে  ছয় বা এক বছরের মধ্যে পূর্বের অবস্থানে অর্থাৎ রাজধানীতে  ফিরে আসা যায়, সেটাই সেই ব্যক্তির  একমাত্র ধ্যান জ্ঞান হয়ে যায়।

তাহলে গ্রামের বা মফস্বলের মানুষগুলোর কী হবে? তাঁদের চিকিৎসার দায়িত্ব কারা নেবেন?  উপজেলা  বা ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতে এখনো  ২০ বা ৫০ শয্যার হাসপাতাল বা উপস্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই একমাত্র ভরসা। কিন্তু বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আমরা প্রায়ই দেখতে পাই সেখানে  চিকিৎসক, নার্স ও অনান্য কর্মচারীর সংকট। অধিকাংশ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স নেই, এক্স-রে মেসিন থাকলেও হয়তো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর। সর্বোপরি চিকিৎসক সংকটই প্রকট। এইসব হাসপাতালগুলিতে রোগির তুলনায় বেডের সংখা কম। ফলে হাসাপতালের বারান্দায় বা মেঝেতে অনেক রোগিদের ঠিকানা হয়ে যায়। অধিকাংশ ওষুধ এসব হাসপাতাপলে বাইরে থেকে কিনতে হয়।

আর একদম গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসার একমাত্র অবলম্বন কমিউনিটি ক্লিনিক। সেখানেও কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) পদে আছে জনবল সংকট। অধিকাংশ সেন্টারে এই পদে লোক নেই। ফলে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামের মানুষ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জনগণের দোরগোড়ায় প্রাথমিক গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে। এই কমিউনিটি ক্লিনিক হয়ে উঠেছে গ্রামের অনেক সুবিধা বঞ্চিত মানুষের চিকিৎসার ঠিকানা। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসকরা না থাকতে চায় এই বলে যে সেখানে থাকার পরিবেশ নেই। অবকাঠামো সমস্যা। কিন্তু তাঁরা বাসা ভাড়া হিসেবে যে টাকা পান তা দিয়ে মফস্বল পর্যায়ে থাকার ব্যবস্থা এখন হয়েছে। অন্যান্য পেশার অনেকে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে অফিসার পর্যায়ে অনেকে  থাকছেন। সেখানে স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা, এনজিও কর্মকর্তরাও থাকেন। সবাই মিলে থাকলে সমাজ সমৃদ্ধ হবে। মানুষ উপকৃত হবে। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক এখন সর্বত্র। অনেকের সন্তান লেখাপড়া করছে মফস্বলে এবং তারা ভাল করছে।  এখন গ্রামের রাস্তাঘাট আগের চেয়ে ভাল হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে যাঁদের পদায়ন হয়েছে, সেখানে চিকিৎসকদেরও থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। মোট কথা গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা চিকিৎসকদের থাকতে হবে। তবে সরকার আরও বাড়িঘর তৈরি করতে পারে।

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে খুঁজলে দেখা যাবে, অনেক ক্ষেত্রে পদের অতিরিক্ত সংখ্যক চিকিৎসক প্রেষণে বা সংযুক্তি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া আছে। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা নিতে সচেষ্ট। উচ্চশিক্ষা নিতে বাধা নেই। তবে কারা উচ্চশিক্ষা নেবেন এবং কোন প্রক্রিয়ায়, সেটি সরকার কর্র্তৃক নির্ধারিত নিয়মে হতে হবে। আর মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বাছাই করে এই সুযোগ দিলে বিভ্রাটও হবে না। তা না করে যাঁর যাঁর সুযোগমতো দেনদরবার করে এসব করায় গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সংকট অবস্থা বিরাজ করছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমাদের বিনিয়োগ অনেক কম।গ্রাম বা ইউনিয়ন পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ে উন্নত ডায়াগনস্টিক সেন্টার নেই। ডায়াবেটিস হৃদ রোগের বা অন্যান্য জটিল রোগের জরুরি সেবা গ্রামে নেই। ইউনিয়ন পর্যায়ে এ্যাম্বুলেন্স নেই। ফলে রোগি পরিবহনের সমস্যা মারাত্মক। এই রকম সমস্যা নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে গ্রামের মানুষ দিন যাপন করছে।

্কথা হলো এই সমস্যার বিকল্প তাহলে কী হতে পারে? সরকারি চিকিৎসকদের গ্রামে বা উপজেলা পর্যায়ে কাজ করার বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। তাছাড়া বিসিএসের বাইরে থেকে সরাসরি এগুলোর জন্য চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দেশের অনেক ইউনিয়ন বা পৌরসভায় তৈরি করা হাসপাতাল নানা জটিলতায় বন্ধ হয়ে আছে। সেগুলি অবিলম্বে চালু করতে হবে। আমার এলাকায় সান্তাহারে এ রকম একটি হাসপাতাল নানা কারণে বন্ধ হয়ে আছে। চালু হলে মানুষ উপকৃত হতো। বিষয়টি মানবিক। গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসম্মত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে যা যা করার দরকার, সরকারকে তাই করতে হবে। মনে রাখতে হবে গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।
লেখক ঃ কলেজ শিক্ষক-প্রাবন্ধিক
০১৭২-৫০৪৫১০৫