গ্রামীণ গৃহ নির্মাণ আইন প্রবর্তন ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ

গ্রামীণ গৃহ নির্মাণ আইন প্রবর্তন ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ

মো: মুরশীদ আলম  : গ্রামাঞ্চলে যত্রতত্র অপরিকল্পিত ছড়ানো ছিটানো বাড়িঘর নির্মাণ, সড়ক ব্রিজ-কালভার্ট, বাঁধ নির্মাণ, প্রাচীন জলাধার মজাপুকুর দখল, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে পুকুর খনন ও কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন করায় বর্ষা বা বন্যার সময় উত্তরের বা উপরের দিক হতে নিচের দিকে নেমে আসা পানি সুষ্ঠুভাবে দ্রুত নেমে যেতে বা নির্গত হতে পারে না, আবার নির্গত বা নিষ্কাশন হলেও তা অতি ধীরগতিতে নেমে যায় বলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এই জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিন থাকে। বান বা বর্ষার পানির সংগে ভেসে আসা পানি উপরের জমিতে দীর্ঘদিন জমে থাকে। জমির প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পলি জমা হয়ে জমির ঊর্বরতা বৃদ্ধি করে। ফলে অতি উর্বরতার জন্য জমিতে ভাল ফসল হয় না। আবার নিচের দিকের জমিগুলোয় পানি প্রবাহ না থাকায় পলি পড়ে না। এতে উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায়। এর জন্য ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, কেবল পানি সুষ্ঠুভাবে দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় উপর ও নিচের দিকে উভয় জমির ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কম হচ্ছে।

জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের অধীন হারুঞ্জা গ্রামের আমিনুল ইসলাম নামে একজন জমির মালিক এবার আমন মৌসুমে তার ২ বিঘা জমিতে মাত্র ১২ মণ ধান পেয়েছে। এই জমিতে তার প্রায় ৪০ মণ ধান পাওয়ার কথা। এর কারণ উপর দিক হতে তার জমির দিকে নেমে আসা পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে যেতে বা নিষ্কাশন হতে পারেনি। তার জমির দক্ষিণ দিকে একটা মজাপুকুর ছিল। বর্ষা, বৃষ্টি বা বানের সময় পানি ওই পুকুরে জমা হত। পুকুরের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পানি পুকুরের দক্ষিণ পাড় দিয়ে নিচের দিকে নেমে যেত। এখন সেই পুকুরে মাছ চাষ করা হয়। মাছ চাষিরা সেই পুকুরের সব পাড় মজবুত করে বেঁধে রেখেছে। ফলে ওই পুকুরে আর কোন পানি প্রবেশ করতে বা বের হতে পারে না। ফলে আমিনুলের জমি সহ আশে পাশের জমিতে পানি দীর্ঘদিন জমে ছিল। জমির ধান গাছ দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকায় পচন ধরে বহু ধান গাছ নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে যে কয়েকটি ধান গাছ বেঁচে ছিল তাতে তেমন ফসল হয়নি। কেবল এই আমিনুলই নয় আরো অনেক আমিনুল এই পরিস্থিতি বা ক্ষতির শিকার হয়েছে। অনুসন্ধান করে জানা গেছে যে, কেবল হারুঞ্জা গ্রামের প্রায় ২ শত বিঘার জমির ধান এমনি জলাবদ্ধতার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। হিসাব করলে দেখা যায় যে, প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ১৪ মণ ধান কম পাওয়া গেছে। সেই হিসাবে ২ শত বিঘা জমিতে ২৮ শত মণ ধান কম পাওয়া গেছে বা কম উৎপন্ন হয়েছে। প্রতিমণ ধান যদি ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হয় তাহলে তার মোট মূল্য দাঁড়ায় ২৮ লাখ টাকা। এই টাকা জমির মালিকরা পাচ্ছেনা। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেই সংগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এই অবস্থা কেবল হারুঞ্জা গ্রামেই নয়, এই অবস্থা উপজেলার অন্যান্য গ্রামের চাষিদেরও।

কেউ কেউ তার পৈত্রিক ভিটেমাটিতে স্থানাভাবে বা বাড়ি ঘরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মাঠের মধ্যে নিজ নিজ জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ করছে। যাতায়াতের সুবিধার জন্য নিজ জমিতে নিজ খরচে কাঁচা রাস্তা নির্মাণ করে প্রধান সড়কের সংগে সংযুক্ত করছে। এই কাঁচা রাস্তা পূর্বে ছিল না। ছিল কেবল জমি। বর্ষা বা বৃষ্টির পানি তখন অবাধে প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে যেত। ফসলের কোন ক্ষতি হতো না। কিন্তু এখন কাঁচা রাস্তা নির্মিত হওয়ায় পানি নিষ্কাশনে বাধা প্রাপ্ত হয়। যদিও বাড়ির মালিক রাস্তার মাঝখানে সিমেন্টের তৈরি রিং পাইপ দিয়ে পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে কিন্তু যে গতি বা বেগে পানি নেমে বা নিষ্কাশন হওয়ার কথা তা হয় না বলে আশে পাশের জমিতে পানি দীর্ঘদিন জমে থাকে। এর ফলে ধান গাছে পচন ধরে আশানুরূপ ফসল পাওয়া যায় না।

১৯৪০ সালে ব্যাডাস্ট্রাল সার্ভের (সি, এস) মানচিত্রে যে সমস্ত খাড়িনালা, গোচারণ পতিত জায়গা জমি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল যে সব জায়গা, খাড়িনালা জনসাধারণ অবাধে নিজ নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করত। ওই সব খাড়িনালা দিয়ে বানের বা বৃষ্টির পানি অবাধে নিচের দিকে নেমে যেত।
কিন্তু এখন সে সব খাড়িনালা বন্ধ হয়ে গেছে। একশ্রেণীর প্রভাবশালী মহল বা মানুষ সে সব স্থান নিজ নিজ সুবিধার জন্য ভরাট করে নিয়ে দখল করছে। ফলে ঐসব খাড়ি নালা দিয়ে পানি নিচের দিকে গড়িয়ে বা নেমে যেতে পারে না। কেননা পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে যদিও কোথাও কোন খাড়িনালার অস্তিত্ব থাকলেও সেগুলো প্রাকৃতিকভাবেই ভরাট হয়ে গেছে। খনন না করায় সমতল আকার ধারণ করেছে। ওই সব খাড়িনালা দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। এই জন্য ওইসব এলাকার জমিগুলোতে পানি বন্ধ থাকে। ফসলের ক্ষতি হয়।

এছাড়া যেসব এলাকায় গুচ্ছগ্রাম স্থাপন করা হয়েছে সেসব এলাকার আশ পাশের জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে ফসল আশানুরূপ উৎপন্ন হচ্ছে না। অধিকাংশ গুচ্ছগ্রাম খাস বা মজাপুকুর পাড়ে স্থাপন করা হয়েছে। ওইসব খাস বা মজাপুকুরকে খনন করে মজবুত করে পাড় বেঁধে গুচ্ছগ্রামবাসীদের আয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মাছ চাষের জন্য তাদেরকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগে ওইসব মজাপুকুরে বর্ষার পানি কিছু জমা থাকত। আর তার ধারণ ক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত পানি নিচের দিকে নেমে যেত। ওই সব পুকুরে আগে দেশীয় মাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। এখন এইসব পুকুরে বর্ষা বা বৃষ্টির পানি অর্থাৎ উপর দিক থেকে নেমে আসা পানি প্রবেশ করতে পারে না। বেরও হতে পারে না। ফলে এই পানি আশে পাশের জমিতে দীর্ঘদিন বদ্ধ থাকে। জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর দিনের পর দিন পানি বদ্ধ থাকায় আশে পাশের জমির ধান সহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি করে। জমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরিকল্পিতভাবে বা নিজ ইচ্ছামত আকারে বাড়িঘর নির্মাণ জলাবদ্ধতা ও সুষ্ঠুভাবে পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতার অপর এক অন্যতম কারণ।

আজকাল প্রায় গ্রামেরই ২/৪ জন লোক বিদেশে চাকরি করে। তারা দেশে টাকা পাঠায়। এই টাকা তারা কোন উৎপাদনশীল খাত বা কলকারখানা স্থাপনে ব্যয় করে না। অবশ্য বিদেশে যারা যায় তারা অধিকাংশই স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিক। এরা যে টাকা রোজগার করে তা থেকে দালালি, বিদেশ যাওয়ার খরচ ঋণের টাকা শোধ করে যে টাকা হাতে থাকে তাতে এককভাবে কারো পক্ষে কলকারখানা স্থাপনের সুযোগ ও সম্ভাবনা কম। এছাড়া কলকারখানা স্থাপনের জন্য যে শিক্ষা থাকা দরকার তা না থাকায় এবং কলকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে নানা জটিলতার কারণে কেউ ওই দিকে পা বাড়ায় না। তাই সহজ উপায় বাড়ি-ঘর নির্মাণ আর জমি কেনা। আর এই সহজ উপায়ের দিকে তারা অগ্রসর হয়। তারা বাড়ীঘর নির্মাণ করে। অনেকেই প্রধান সড়কের ধারে বাড়ি করে। কেউ বা আবার মাঠের মধ্যে কেনা জমিতে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। এইসব বাড়ির তিন দিকে অন্য মানুষের জমি। বাড়ি নির্মাণের ফলে সারা বছর বাড়ির ব্যবহৃত পানি ও আবর্জনা পাশের জমিতে পড়ে। ফলে সারা বছর জমি ভিজা থাকে। আবার বর্ষার সময় এইসব জমির পানি দ্রুত বেগে নেমে যেতে পারে না। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বাড়িটি অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণের ফলে পানি সরাসরি দ্রুত বেগে নেমে যেতে পারে না। কেননা পানি নিষ্কাশনের পথটা খুবই সরু বা অপ্রশস্ত। আর এই জন্য পানি বদ্ধ থাকায় পাশের জমির ফসলহানি হয়। এর ফলে জমির মালিকরা বাড়ির মালিকের নিকট জমি বিক্রি দিতে বাধ্য হয়। এতে দেখা যাচ্ছে যে এক শ্রেণীর মানুষ ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছে অপর দিকে এক শ্রেণীর নব্য জোতদার সৃষ্টি হচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলে কৃষি জমিতে বৈধ বা অবৈধভাবে ইটভাটা নির্মাণ করায় জমির ফসল হচ্ছেনা। কেননা ইট তৈরিতে কৃষিজমির উপরের মাটি বা টপসয়েল ব্যবহার করা হয়। ইটভাটার মালিকগণ উচ্চমূল্যে টপসয়েল কিনে নেয়। টপসয়েলের অভাবে ওই জমিতে ভালো ফসল হয় না। কেননা টপসয়েল তৈরি হতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগে। ফলে তিন বছর জমিতে ধান বা অন্যকোন ফসল হয় না। এইসব নানাবিধ কারণে প্রতিবছর ধানের যে ক্ষতি হয় উৎপাদনের পরিমাণ কম হয় তার জন্য ধান চাষী বা জমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তারা ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে। এই ক্ষতির পরিমাণ যথাযথভাবে নির্ণয় করা হয় না। চাক্ষুষভাবে প্রতীয়মান হয় না। দেখা যায় না। এটা ঘাতক ব্যাধির মত নিরব থাকে। ঘুন পোকার মত কুঁড়ে কুঁড়ে খায় কৃষকের আর্থিক দেহ টাকে। এই ক্ষতির ক্ষত যে কতটা ভয়াবহ তা কৃষক ছাড়া কেউ বুঝতে পারে না। কিন্তু তাদের করারও কিছু থাকে না। শুধু ভাগ্য কে দোষারোপ করে দুর্বল মেরুদণ্ড নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে। অর্থ কষ্টে থাকে সারা বছর। এ যেন তাদের নিত্য সংগী। ধানচাষীদেরকে এ অবস্থা থেকে রক্ষা করতে হলে গ্রামের জলাবদ্ধতা দূর করতে হবে। এর জন্য ভরাট হয়ে যাওয়া খাড়ি-নালা বা জলাধারগুলো কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা টি আর কিংবা অন্য কোন প্রকল্পের মাধ্যমে পুনঃখনন করার উদ্যোগ নিতে হবে। আর অপরিকল্পিত বাড়ি-ঘর নির্মাণ রোধ করতে হবে। এর জন্য গ্রামীণ গৃহ নির্মাণ আইন চালু করা দরকার।
লেখক : উন্নয়ন কর্মি
০১৭১৮-৫৩৩৭৬৬