গ্রাম বাংলার খেলাধুলা বিনোদন হারিয়ে যাচ্ছে

গ্রাম বাংলার খেলাধুলা বিনোদন হারিয়ে যাচ্ছে

রবিউল ইসলাম (রবীন) : একটা সময় কাক ডাকা ভোরে কৃষক লাঙল গরু নিয়ে  মাঠে যেত, মাইলের পর মাইল হেঁটে সে জমিতে যেত। জমিই ছিল তাঁর সব। এখন কলের লাঙল হওয়ার কারণে কৃষকের আর সেই কাজ করতে হয় না। ফলে সকালের কসরৎ আর তাদের হয় না। একটা সময় নদীতে নৌকা পারাপারে মাঝি ভাটিয়ালি গান গাইতো প্রাণ খুলে। নদী আর তেমন কই ? ফলে ভাটিয়ালি গানও আর আগের মতো শোনা যায় না, মাঝিকেও দেখা যায় না ।গ্রামাঞ্চলে বিয়ে মানেই সাত দিন ধরে চলতো মেয়েদের, গান, নৃত্য। আধুনিক নৃত্য নয়, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ নৃত্য। নানা জাতের পিঠা তৈরি হবে সেই বিবাহকে ঘিরে। দল বেধে এপাড়ার, ওপাড়ার মেয়েরা তা দেখতে, কেউ সে সব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসতো।

এখনও কিছুটা যে হয়না তা নয়, হয়। তবে তাল কেটে গেছে। আগের মতো আর হয় না। এখন মাইকের পরিবর্তে ছেলেরা  শহর থেকে সাউন্ডবক্স নিয়ে আসে। বিকট শব্দে বিয়ে বাড়িতে এখন বিয়ের গান নয়, হাই বিটের হিন্দি গান বাজে।  উঠতি বয়সের ছেলেরা, মেয়েরা তাতে নাচে। তবে এসব দেখে ভাটিয়ালি গান ভয়ে পালিয়ে  যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমাদের জাতীয় খেলা হাডুডু কে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আগে বিকেল হলেই কিংবা কোন উৎসবে গ্রামের যুবকরা দল বেধে হাডুডু খেলতো। গোল্লাছুট, ছিবুড়ি, কিৎকিৎ, কাবাডি, সাঁতার, নৌকা বাইচ, ক্যারাম, লুডু,দাবা, খেলাগুলো কি আর আগের মতো  দেখা যায়? কোথায় সব হারিয়ে গেল? গ্রামের খেলাধূলা, বিনোদন কি তাহলে হারিয়ে যাবে? পল্লী কবি জসিম উদ্দীনের গ্রামকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না? কবি জসিম উদ্দীনের লেখা  ’তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়, গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়’। মনে পড়ে সেই কবিতা? এমনি করে আর কেউ গ্রামে আসতে নিমন্তন্ন জানায় না ? সেই গ্রাম কে আর খুঁজে পাই না? সেই পল্লী বধূ কে আর খুঁজে পাই না। সেই ভাটিয়ালি, জারিসারি, পল্লীগীতিকে আর খুঁজে পাই না? সেই গ্রামের নিসর্গ কোথায় ?
একটা সময় প্রায় প্রতিটি গ্রামে ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবে ছোট পরিসরে হলেও কিছু বই থাকতো, থাকতো খেলাধুলার সামগ্রি। বিকেল থেকে মুখরিত থাকতো সেই ক্লাবের কর্মকান্ড। বয়স্ক থেকে নানা বয়সের মানুষের মিলন মেলা ছিল সেই ক্লাবকে ঘিরে। সেই ক্লাবের মাধ্যমে বিভিন্ন খেলাধুলা হতো। যাত্রাপালা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হতো। রমজান মাসে তরুণরা ’কাফেলা’ পরিচালনা করতো। সেই কাফেলায় ইসলামিক গজল পরিবেশন করতো তরুণরা। প্রতিটি ঈদের পর গ্রামে মেলা বসতো। সেই মেলায় নৌকা বাইচ খেলা হতো। পুতুল নাচ সহ নানা খেলা উপভোগ করেছে মানুষ সেই সকল মেলায়। এখন অধিকাংশ গ্রামে ক্লাব নেই, যাত্রাপালা নেই, খেলাধুলা তেমন নেই, সংস্কৃতিক কর্মকান্ড নেই। বলতে গেলে বিনোদনের কোন ব্যবস্থায় তেমন নেই গ্রামে।]  এখন গ্রাম্য বিচার ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। কেউ কাউকে মানতে চায়না। ’ভিলেজ পলিটিক্্র’ এখন দানা বেধেছে প্রায় গ্রামে। কিছু হলেই  অনেকে তাই উপজেলার পুলিশের কাছে নালিশ করতে যায় অথবা মামলা করতে যায়।

প্রতিটি গ্রামে এখন ডিশ এন্টেনার মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখতে পায়। নারীরা ভারতীয় সিরিয়ালের ভক্ত এখন গ্রামেও। গ্রামের মানুষের বিনোদন বলতে এখন সন্ধ্যা হলেই মোড়ের দোকানে বসে চা খাওয়া, সেই দোকানে থাকা টিভির কিছু অনুষ্ঠান দেখা, কিছু গল্প করা, তারপর বাড়ি ফেরা। যেহেতু কৃষি আবাদ অনেকটা যান্ত্রিকীকরণের পথে চলে গেছে, তাই শহরের মানুষের মতো গ্রামের মানুষেরও কায়িক পরিশ্রম কমে গেছে। বেকারত্বের পরিচয় ঘোচাতে গ্রামের অনেক তরুণ এখন বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কেউ কেউ বেছে নিয়েছে সিএনজি গাড়ি চালানো। পড়াশুনা তাই অতি আবশ্যক মনে করছে গ্রামের গুটিকয়েক পরিবার। তাই আগের মতো সন্ধ্যা হলেই আর তেমন কোন বাড়ি থেকে পড়াশোনার আওয়াজ পাওয়া যায় না। গ্রামে এখন ছেলেদের চাইতে মেয়েরা পড়াশোনায় এগিয়ে আছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য অনেক গ্রামে মাদক প্রবেশ করেছে। ফলে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে গ্রামে। শিক্ষিত অনেক তরুণ মাদকে আকড়ে ধরছে। নানা বয়সের মানুষ মাদক গ্রহণ করছে। আর ধুমপান যে ক্ষতিকর বা প্রকাশ্যে খাওয়া অপরাধ, এটি শতকরা ৯৯% ভাগ মানুষই উপলদ্ধি করেনা গ্রামে। তাই বিভিন্ন বয়সের মানুষ একসাথে ধুমপান করে গ্রামে। শাসন, শ্রদ্ধা এখন শহরের মতো গ্রামেও কমে গেছে। শহরের পার্শ্ববর্তি গ্রামগুলিতে এখন অতি তুচ্ছ কারণে তরুণরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। তারপর সেটি নিয়ে দেখা দিচ্ছে পরস্পরের মধ্যে বিভক্তি, মামলা। নেতৃত্বের প্রবল সংকট এখন অনেক গ্রামে। এরপরও কিছু আদর্শ গ্রাম আছে। সেখানে শিক্ষিতের হার শহরের অনেক মহল্লার চেয়ে ভাল। এ দেশের যাঁরা মূল চালিকাশক্তি  গ্রামের কৃষক সম্প্রদায়ও ভাল নেই। কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য দাম পায় না। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত কৃষক নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। তাদের পক্ষে কথা বলার মানুষ কোথায়? এ দেশে প্রায় সমস্ত  পেশাজীবীদের দাবি আছে, আন্দোলন আছে, সমিতি আছে। কিন্তু কৃষকের পক্ষে মিছিল হয় না, মিটিং হয় না। ফলে চিরবঞ্চিত অনেকটা তারাই। তাদের কোন বিনোদনও নেই। গ্রামকে বাঁচাতে হবে। পল্লী বন্ধু জসিম উদ্দীনের চিরচেনা গ্রামকে আবার দেখতে চাই আমরা। গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থাকে মজবুত করার জন্য গ্রাম আদালতকে আরো শক্তিশালি করতে হবে। বাল্য বিয়ে বন্ধ করতে হবে। তবে সুখের কথা, গ্রামীণ স্যানিটেশন ব্যবস্থা,বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, রাস্তাঘাটের অবস্থা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন উন্নত। সব শেষ কথা মনে রাখতে হবে গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-সহকারী অধ্যাপক
০১৭২৫-০৪৫১০৫