গ্যাসের দাম কমানো হোক

গ্যাসের দাম কমানো হোক

জিআরএম শাহজাহান  : বাজেটের কর বৃদ্ধির উত্তাপ-উত্তেজনা ঠান্ডা না হতেই গত ৩০জুন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সব ধরনের গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য ৩২.৮০% ভাগ বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাসা-বাড়িতে এক চুলার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ৯২৫ টাকা এবং দুই চুলার দাম বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা ধরা হয়েছে। যা আগে ছিলো যথাক্রমে ৭৫০টাকা এবং ৮০০ টাকা। এছাড়া প্রিপেইড মিটারে প্রতি ঘন মিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১২.৬০ টাকা। এতোদিন যা ছিলো ৯.১০ টাকা। হিসাব করলে দেখা যায়, চুলা ভিত্তিক গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ আর মিটার ভিত্তিক গ্যাসের দাম বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। সিলিন্ডারে ব্যবহৃত এলপি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে ১২ কেজি ওজনের যে সিলিন্ডারের দাম ৯৬০ টাকা ছিলো তা এখন কতো টাকায় কিনতে হবে সে হিসাবটা এখনো পরিষ্কার ভাবে পাইনি। বাসার পাশের সিলিন্ডার দোকানদার বললো, শতকরা ৩২.৮০ টাকা হারে গ্যাসের দাম বাড়লে একটা সিলিন্ডার কিনতে হবে নাকি ১৩২৩.৪৮ টাকা দিয়ে।

 যানবাহনে যে সিএনজি গ্যাস ব্যবহার হয়, তার মূল্য প্রতিঘন মিটার ৩৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৩ টাকা করা হয়েছে অর্থাৎ ৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে গ্যাস ব্যবহৃত হয় তার মূল্য ৩.১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪.৪৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে বৃদ্ধি করা হয়েছে ৪৬ শতাংশ । এদিকে সার উৎপাদনে যে গ্যাস বাবহার করা হয় তার মূল্য প্রতি ঘন মিটারে ২.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪.৪৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সার উৎপাদন ভিত্তিক গ্যাসের দাম বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত প্রতি ঘন মিটার গ্যাসের দাম ৩৮ শতাংশ বাড়িয়েছে। ফলে ৭.৭৬ টাকার গ্যাসের বর্তমান মূল্য দাঁড়াবে ১০.৭০ টাকায়। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে মানুষের প্রাত্যহিক জীবন যাত্রায় কি পরিমাণ চাপ পড়বে আর কারাই বা লাভবান হবে তার একটা হিসাব করাটাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। ইতিমধ্যে আমার সংসারে মাসে দুইটি সিলিন্ডার ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত ৭০০ টাকা খরচ করতে হতে পারে। সিলিন্ডার গ্যাস এক সময় সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডিলার নিয়োগ করে বিক্রি হতো। এখন পাড়া -মহল্লার পানের দোকানে-মুদির দোকানে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি হয়।

এ থেকে বোঝাই যায় যে, দেশের বিত্তবানরাই নয় এখন নিম্ন আয়ের মানুষেরাও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে। ব্যাপক চাহিদার কারণে গ্রামে-গঞ্জে যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যায়। তাহলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এই প্রভাব কেবল উপর তলায় নয় একেবারে নিচের স্তরেও পড়বে। ইতিমধ্যে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব যে পড়েছে তার নমুনাও পেলাম। একজন সিএনজি চালকের কাছে জানতে চাইলাম, সান্তাহার থেকে রাণীনগর পর্যন্ত ভাড়া কতো? জানালো, ২০ টাকার জায়গায় এখন ২৫ টাকা। সান্তাহার হতে ঢাকাগামী কিছু কিছু বাসের ভাড়া ৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেখলাম। “গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি ৩ টাকা, আলহামদুলিল্লাহ্! সাতমাথা (বগুড়ার) টু চারমাথা-সিএনজি ভাড়া বৃদ্ধি ৫ টাকা”। অর্থাৎ ১০ টাকার ভাড়া এখন ১৫ টাকা হয়েছে। গতকাল এক রডের দোকানদার বললো, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আগামী চালান থেকে রডের দাম নাকি প্রতি কেজিতে ১৪ টাকা করে বাড়ার সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ প্রতি টন রডে মূল্যবৃদ্ধি হবে ১৪০০ টাকা। কেননা রড প্রস্তুত করার অধিকাংশ কারখানাগুলো গ্যাস নির্ভর।

 আবার যে সমস্ত কারখানায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রড উৎপাদিত হয়, সেই বিদ্যুৎ আবার গ্যাস দ্বারা উৎপাদন হয়, অতএব সঙ্গত কারণেই রডের দাম বাড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৫০% ভাগের বেশি পাওয়ার প্লান্ট গ্যাস নির্ভর। তাহলে গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুতের দামতো আর বসে থাকবেনা। গ্যাস ভিত্তিক যেসব শিল্প-কলকারখানা রয়েছে তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম নিশ্চয় বাড়বে। অপর দিকে সার উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহৃত হয়। তাহলে ৫০ কেজি প্রতি ব্যাগের সারের মূল্য কত টাকা বাড়বে? এখন দেখা যাক গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে কোন কোন শ্রেণীর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর কোন গোষ্ঠী বিশেষের পকেট ভারী হবে। দেশে ৬০ লক্ষের বেশি গার্মেন্টস শ্রমিক রয়েছে। এদের বেতন কি বেড়েছে? দেশের মোট জনসংখ্যার ৭৯% কৃষক। কৃষক কি ধান উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছে? বরং ধানের দাম আরো কমছে। শিল্প- কলকারখানায় যেসব শ্রমিকরা কাজ করে তাদের বেতন বেড়েছে কি? মধ্যবিত্ত থেকে হতদরিদ্র কোন শ্রেণীর মানুষের আয়- রোজগার বেড়েছে , বলতে পারবেন কি ? মানুষের আয় বাড়েনি অথচ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হলো, যুক্তিটা কি? বলবেন দয়া করে। গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনগণকে কোন কোন খাতে কতো বেশি পয়সা-কড়ি গুনতে হবে, তা কয়েক দিনের মধ্যে আরো পরিষ্কার হবে। জ্বালানি গ্যাস এখন মানুষের নিত্য দিনের চাহিদা অন্যতম অনুষঙ্গ। মানুষের যেমন ভাত, কাপড়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বাসস্থান চাই, তেমনি বিদ্যুৎ চাই, আবার গ্যাসও চাই। একবেলা গ্যাস না থাকলে গৃহস্থলি-শিল্প কারখানায় কি রকম বিরূপ প্রভাব পড়ে তা কেবল ভুক্তভোগিরাই জানে। এদিকে যখন বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম প্রায় ৫০% কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

 তখন আমাদের দেশে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি কতোখানি যৌক্তিক, জনগণ সে প্রশ্ন করতেই পারে। ভারতীয় গণমাধ্যম ইটিভি জানিয়েছে, ইন্ডিয়ান ওয়েল কর্পোরেশন সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ১০১ রুপি কমিয়ে দিয়েছে। এখন ভারতে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৬৩৭ রুপি। রোববার সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ভারত বিশ্ব বাজার থেকে প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজি গ্যাস ক্রয় করছে ৬.৫০ ডলার দিয়ে আর আমরা কিনছি সেটা ১০.৫০ ডলার দিয়ে। এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে যে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন আয়ের বা বিত্তহীনদের ওপর ভিষণ চাপ পড়বে তা ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়েছে। সরকার বলছে, দেশে যে পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা আছে তার চেয়ে উৎপাদন কম হয়, যার জন্য প্রতি বছর তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হয়। দেশে উৎপাদিত প্রতি ঘনমিটার (এলপি) গ্যাসের মূল্য ৭ টাকা আর আমদানি করা গ্যাসের দাম পড়ে ৩২ টাকা। ফলে এক্ষেত্রে বিরাট অংকের ভর্তুকি দিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান করার জন্য সরকারি সংস্থা বাপেক্সকে কি সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে? নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের গল্প শোনা গেলেও কার স্বার্থে বাপেক্সকে কার্যকরি ভুমিকা পালন করতে দেয়া হচ্ছে না? গ্যাস উৎপাদন না করে আমদানির উপর নির্ভরশীল হবার কারণ কি? সে প্রশ্ন এসে যায়। অভিযোগ আছে, এক শ্রেণীর দেশী-বিদেশী স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীদেরকে এলএনজি গ্যাস আমদানির মাধ্যমে মুনাফা-কমিশনের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।

গ্যাসের সিস্টেম লস হচ্ছে ১২ শতাংশ। এটা আসলে সিস্টেম লস নাকি চুরি? সেটা নিয়ে তর্ক- বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সেই সিস্টেম লস বলেন বা চুরিই বলেন, তা ঠেকানোর কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড হচ্ছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ করপোরেশনের একটি প্রতিষ্ঠান। তিতাস গ্যাসে অনিয়ম আর দূর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব সিস্টেম লস বা অনিয়ম দূর্নীতির দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা না নিয়ে কেবলমাত্র ভর্তুকির অজুহাত তুলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে কাদের স্বার্থ রক্ষা করা হলো? গ্যাস বিতরণ-বিপণন ব্যবস্থায় চুরি না থাকলে তিতাসের একজন মিটার রিডার অথবা এক-এগারোর সময় ট্রুথ কমিশনে যাওয়া আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজরা এমপি পদে নির্বাচনের স্বপ্ন দেখে কি ভাবে? মূলত গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি কি গোষ্ঠীবান্ধব না জনবান্ধব, এই সরল অংকটা আম-জনতা সকলেই বোঝে। একজন জানতে চাইলো, ‘ভাই জ্বালানি সংক্রান্ত মূল্য বাড়ানো বা কমানোর জন্য তো এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আছে। তারা এসব মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের সিংহভাগ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নেয় না কেন’। বললাম, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কথা বলছেন, সেটা তো কলের গান। আগে থেকেই যা রেকর্ড করা থাকে, সেটাই বাজানো হয়, আর সেটাই শুনবেন। দাম বাড়ানোর বেলায় তারা একটা গণশুনানির নাটক করে। তারপর যেটা নির্দেশিত থাকে সেটাই ঘোষণা দেয়। এখানে শুনানীতে যারা অংশ নেয়, তাঁদের মতামতকে কখনোই গুরুত্ব বা প্রাধান্য দেয়া হয় না। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো নানা কর্মসূচি পালন করছে।শেষ কথাটা বলি, কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি সম্পূরক আবেদন করেছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
০১৯২৫-৭৭৪৩৮০