গুরুদাসপুরের গ্রামে চাঁই বুনে জীবিকা

গুরুদাসপুরের গ্রামে চাঁই বুনে জীবিকা

গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি : চলনবিল বেষ্টিত গ্রামটির জনসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। যোগাযোগ ব্যবস্থা পশ্চাদপদ। তার ওপর আত্রাই নদ গ্রামটিকে বিভাজন করেছে। মাছ ধরার উপকরণ (চাঁই) তৈরি করে জীবিকার পথ বেছে নিয়েছে জনগোষ্ঠীর মানুষ। আয় ভালো হওয়ায় পড়ালেখাও করছে এসব পরিবারের ছেলে-মেয়েরা। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নে গড়ে ওঠা গ্রামটির নাম বিলহড়িবাড়ি। উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার উত্তরে গ্রামটির অবস্থান। মূলত: আত্রাইনদ আর চলনবিলের উন্মুক্ত জলরাশির মাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল গ্রামটি। ওই গ্রামটিতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়িতেই মাছ ধরার উপকরণ (চাঁই) তৈরিতে ব্যস্ত নারী-পুরুষ। কেউ বাঁশ চেরাই করছেন, কেউ চেরাই করা বাঁশের শলাকা তৈরি করছেন, কেউ কেউ সেই শলাকা নাইলনের সুঁতোয় সেলাই করে তৈরি করছেন চাঁই।

যেন দম ফেলার সময় নেই কারোই। আশরাফ আলী, হারেজ উদ্দিন ও মাজেম আলী নামে তিনজন গ্রামবাসী জানালেন, চাঁই তৈরির প্রধান উপকরণ হচ্ছে বাঁশ-নাইলনের সুতো। বাজার থেকে এসব বাঁশ কিনে তা নির্দিষ্ট আকারে কেটে ৩-৭ দিন পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়। সেই বাঁশ থেকে চিকন শলাকা তৈরি করেই তৈরি হয় চাঁই।  ওই গ্রামের মজনু প্রামানিক জানালেন, যেসব পরিবারে দৈন্যতা রয়েছে সেসব পরিবারের সদস্যরা চুক্তিভিত্তিক ভাবে চাঁই তৈরি করে থাকেন। প্রতিটি চাঁই তৈরির জন্য মজুরি পেয়ে থাকেন ৩০-৫০ টাকা করে। দিনে ১০-১৫টি চাঁই তৈরি করা যায়। এতে করে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকেন এসব পরিবার। গ্রামের অপেক্ষাকৃত সচ্ছল এবং এব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত অনেক মানুষ এপেশায় লগ্নি করে থাকেন।

কথা হয় সালেহা বেগম ও খালেদা বেগম নামে দুই নারীর সাথে। তাদের ভাষ্য, ২০০৭ সালের দিকে তাদের বিয়ে হয়। বাবার বাড়িতে অভাব-অনটন ছিল। কিশোরী বয়সে নতুন বউ হয়ে স্বামীর সংসারে এসেছিলেন তারা। কিন্তু অভাব পিছু ছাড়েনি তাদের। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে  শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে চাঁই বুনোনোর পেশাটি রপ্ত করেছেন তারা। এখন তাদের সংসারে ছেলে-মেয়ে রয়েছে। নিজেরা কষ্টে থাকলেও সন্তানদের স্কুলে পাঠায়। অবসরে বাবা-মায়ের পাশাপাশি তারাও চাঁই বুনোনের কাজে সহায়তা করে থাকে। বেঁচে থাকার সংগ্রামে চাঁই তৈরির ওপর নির্ভরশীল ওই গ্রামের মানুষ। বিয়াঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হক জানালেন, একটা সময় ছিল, গ্রামটির মানুষ অভাবের সাথে যুদ্ধ করতো। গেল প্রায় এক দশক ধরে চাঁই তৈরির সাথে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের ভাগ্য বদলে গেছে। এখন অনেকের ঘরেই রয়েছে রঙিন টেলিভিশন। স্যাটেলাইটের সংযোগে দেখছে দেশী-বিদেশী সিরিয়াল।