ওয়ার্ডে জামায়াতকে ছাড়ের চিন্তা

গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন জয়ের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিএনপি

গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন জয়ের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : নির্বাচনের বছরে জাতীয় নির্বাচনের আগে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। দুই সিটিতে জয়ের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে বেশ বেকায়দায় থাকা এই দলটি। জয়ের মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায়- দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পরও বিএনপির প্রতি মানুষের সমর্থন, ভালোবাসা ও আস্থা মোটেই কমেনি, বরং তা আরো বেড়েছে। সুতরাং খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে ছাড়া আগামীতে জাতীয় নির্বাচন হবে না, দেশবাসী ও বহির্বিশ্বের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই দলীয় মেয়র প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বিএনপি। তবে প্রার্থী দেওয়ায় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জোট শরিক জামায়াতে ইসলামী।

২০ দলীয় জোটের বৈঠকে দুই সিটি নির্বাচন জোটগতভাবে করার সিদ্ধান্ত হলেও জামায়াত প্রার্থী দিয়ে তাদের পক্ষে অনানুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বিএনপি আশা করছে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিনে আজ সোমবার জামায়াত তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবে। এজন্য প্রয়োজনে কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে জামায়াতের প্রার্থীকে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।

জানা গেছে, গাজীপুরে জামায়াতের নগর আমীর অধ্যক্ষ এসএম সানাউল্লাহ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদেও প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। খুলনায় জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থী না থাকায় তারা মেয়র পদে প্রার্থী দেয়নি। তবে ৫টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী দিয়েছে। গাজীপুরে জামায়াতের মেয়র প্রার্থীকে বসিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের সাথে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জামায়াত তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবে। এটা নিয়ে তাদের সাথে কোনো সমস্যা হবে না।

এজন্য প্রয়োজনে দুই সিটির কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে জামায়াতের প্রার্থীকে ছাড় দেওয়া হবে। জামায়াতের বাইরে গাজীপুরে জোট শরিক এনপিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা সভাপতি সালমা রহমান সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডে (১৬, ১৭ ও ১৮) কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত সিটি নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড থেকে নির্বাচন করে দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি। সালমা রহমানকে এবার বিএনপির পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়া হতে পারে বলে জোট সূত্রে জানা গেছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুসারে আগামী ১৫ মে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন আজ ২৩ এপ্রিল এবং আগামীকাল ২৪ এপ্রিল প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। জানা গেছে, দুই সিটিতে জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বিএনপি।

নির্বাচন সুষ্ঠু করতে দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশনে ছয় দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যেই দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের কাছে প্রচারে সরব হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন কেন্দ্রীয় ও দুই সিটির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে। পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোকেও নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় করা হচ্ছে। নির্বাচন পরিচালনায় বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও ইতোমধ্যে একাধিক সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। গাজীপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক করা হয়েছে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে। সেখানে জোটের পক্ষ থেকে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় পার্টির (জাফর) মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার ও সদস্য সচিব এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম। খুলনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক করা হয়েছে।

সেখানে জোটের সমন্বয়ক এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও সদস্য সচিব এনডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈসা। এই কমিটির সঙ্গে জোটের সকল কেন্দ্রীয় নেতাকে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুই-একদিনের মধ্যে গাজীপুরে ৫৭টি এবং খুলনায় ৩১টি ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি গঠন করবে বিএনপি। প্রতিটি ওয়ার্ডে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে একটি করে কমিটি করা হবে। শিগগিরই ভোটকেন্দ্রভিত্তিক আলাদা কমিটিও গঠন করা হবে। এছাড়া দুই সিটিতে নির্বাচনী প্রচারণায় দুই-একদিনের মধ্যে ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও জোটের দলগুলোকে নিয়ে আলাদা দুটি টিম গঠন করা হবে।

প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে বিএনপি ও জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামবেন। জানা গেছে, দুই সিটিতে ভোটারদের মন জয় করতে নির্বাচনী প্রচারণায় খালেদা জিয়ার কারাবন্দি ইস্যুসহ জাতীয় ও স্থানীয় নানা ইস্যু কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে বিএনপি। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের সাবেক দুই মেয়রকে বারবার গ্রেফতার, দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা-মামলা-গ্রেফতারের চিত্র তুলে ধরবে বিএনপির নেতারা। জানতে চাইলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটা বিরাট পরীক্ষা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কী ধরণের হবে, সেটা এই দুটি সিটির নির্বাচন থেকে প্রমাণিত হবে। এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে দুই সিটিতেই বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হবে বলে দাবি করেন তিনি। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দেশের মানুষ সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের জবাব দেওয়ার জন্য ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিতে মুখিয়ে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, দুই সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থীকেও স্থানীয় নেতা-কর্মীসহ ভোটাররা গ্রহণ করে নিয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে বিএনপির মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জামায়াত তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবে বলে জানান বিএনপির এই দুই শীর্ষ নেতা। এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও জোট নেতাদের সাথে আলোচনা করে শিগগিরই নির্বাচন পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হবে। দুই সিটিতেই জোটের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ২০ দলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে বলেও জানান জোটের এই শীর্ষ নেতা।