গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা ও আমাদের নিষ্ক্রিয়তা

গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা ও আমাদের নিষ্ক্রিয়তা

রিপন আহসান ঋতু : গুজবের পিঠে চড়ে বাংলাদেশে ইদানীং গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার ঘটনা বেড়ে গিয়েছে উদ্বেগজনক হারে। দেশ এখন অনেকটাই নানা গুজবের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। কেন এত গুজব? কেউ হয়তো গুজব তৈরি করছেন বিশেষ উদ্দেশ্যে। কেউবা গুজব ছড়াচ্ছেন অজ্ঞতাবশত। আঙ্গুর গাছের লতায় পাতায় কোনটা আগা কোনটা মাথা সেটা যেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। গুজবও ঠিক এভাবেই ছড়ায়। যার উৎপত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। এই যে ছেলাধরা গুজবে গত কয়েকদিনে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, গাজীপুরের চান্দনা, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডু এবং ময়মনসিংহের ভালুকা, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে শুধু মাত্র ছেলেধরার সন্দেহে গণপিটুনিতে বেশ কয়েকজনের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে চোর সন্দেহে নোয়াখালী ও ঝালকাঠিতে গণপিটুনিতে প্রাণ গেছে আরো দুজনের। অন্য দিকে নেত্রকোনায় একজনকে বাচ্চার কাটা মাথাসহ ধরার পরে তাকেও গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। গত শনিবার রাজধানীর বাড্ডায় নিজের চার বছরের সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য স্কুলে খোঁজ নিতে গিয়ে স্কুল গেটে গণপিটুনিতে মারা গেছেন আরেক নিরাপরাধ নারী। অথচ আপনি নিজেও খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের মধ্যে অনেকেই অচেনা জায়গায় গিয়ে ভালবেসে-সস্নেহে বাচ্চাদের সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলে, মাথায় হাত দিয়ে আদর করে আবার অনেকে অনেক সময় বাচ্চাদের মধ্যে চকোলেটও বিলিয়ে দেয়। কেউ কেউ আবার নতুন জায়গায় গিয়ে ঘুরে বেড়ায় নিজের মতো করে, নিজের ভাল লাগা ভালবাসা নিয়ে। এখন দেখছি সেই ভালবাসার পরিণতি হিসেবে অনেককে প্রাণও দিতে হচ্ছে। কেননা তাদের নামের সঙ্গে জুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা কটূ কথা। কখনও ছেলেধরা তো কখনো বা শিশু পাচারকারী বা গরুচোর। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই বিশেষণগুলো জুড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের উৎসুক জনতা যা অনেকটাই সন্দেহের বশে। ‘ছেলেধরা’, এ শব্দটির সঙ্গে আমাদের সকলেরই প্রায় ছোটোবেলায় পরিচয় ঘটেছে। দুপুরে ঘুমোনোর জন্য যখন মা-চাচিরা পীড়াপীড়ি করতেন, তখন আমাদের চোখের পাতা বন্ধ না হলে অনেকসময়ই এই ‘ছেলেধরা’ নামক অদৃশ্য চরিত্রের ভয় দেখাতেন তাঁরা। শৈশবের সেই ছেলেধরা শব্দে আজ হয়তো সবাই ভীত হয়ে পড়েছেন। তাই তো ছেলেধরা গুজবে কান না দিতে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশবাসীকে গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করতে বাধ্য হয়েছেন।

 তারপরেও গতকয়েক মাসে যে কয়েকটা গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তার অনেকটাই হয়েছে এই ছেলেধরার গুজবের জন্য। অজানা-অচেনা কোনও ব্যক্তি একজন বাচ্চার সাথে কথা বললেন, বা চকোলেট দিলেন মানেই এ সমাজ তার নিজের মতো করে বুঝে নিচ্ছে যে, ওই ব্যক্তি চকোলেটের প্রলোভন দেখিয়ে বাচ্চাটিকে ‘কিডন্যাপ’ করতে চান। আর এই ভুল বোঝাবুঝির জেরেই চকোলেটের আদর নিমেষে ঘৃণায় বদলে যায়, যা এখন প্রাণও কেড়ে নিচ্ছে। পত্রিকার মাধ্যমে যেসব গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে, সেখানে আমরা দেখছি তাতে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে মানুষ মানুষকে খুন করেছে। রাজধানী বাড্ডায় গত শনিবার সকালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে যিনি নিহত হলেন তাঁর পরিচয় পাওয়া গেছে ঘটনার কিছু সময় পরেই, নিহত ব্যক্তির নাম তাসলিমা বেগম রেনু (৪০), ৫ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে রেনু ছিলেন সবার ছোট। ঢাকা ভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করা রেনু নিজের চার বছরের সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য স্কুলে খোঁজ নিতে গিয়ে গণপিটুনিতে প্রাণ দিতে হলো তাকে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা! একই ভাবে সিদ্ধিরগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত যুবকের পরিচয়ও পাওয়া যায়। তার নাম ছিল মো. সিরাজ, সে বোবা ও বধির ছিল। অন্য গ্রামে নিজের মেয়েকে দেখতে গিয়ে তাকে মরতে হলো গণপিটুনিতে। লক্ষ্য করলে দেখবেন গণপিটুনি ও সামাজিক সহিংসতার জন্য মানুষের নির্বিকার হিংস্র মনোভঙ্গি এবং অপরাপর মানুষের নিস্ক্রিয়তায় বিশেষ দায়ী। রাষ্ট্র কখনোই এই গণপিটুনির দায় এড়াতে পারে না। কেননা সহিংসতার আড়ালে আমাদের সমাজে যে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে এবং যে আকারে তা ব্যাপ্ত, তাতে সমাজ যাত্রা করেছে দীর্ঘমেয়াদি ভয়ের সংস্কৃতির পথে। সমাজে সহিংসতা ঘটছে। যার ফলে ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ১৯৯৪ সালের সমাজ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মার্কিন-বাঙালি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ তাঁর ‘বাংলাদেশে আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বইতে লিখেছিলেন, ‘ভয়ের সংস্কৃতি সম্মিলিত উদ্যোগের ধারণা লুপ্ত করে দেয়। এই প্রক্রিয়ার প্রভাব সুদূরপ্রসারী, মানুষকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে রূপান্তরিত করা হয়। একই সাথে আতঙ্ক এবং সন্ত্রাস মানুষের প্রতিরোধের শক্তি চূর্ণ করে দেয়।’ সম্প্রতি বরগুনায় এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এবং আদালতের মধ্যে আসামীর হাতে আসামীর খুন হওয়া সেটাই প্রমাণ করে। এখন আসি এই গণপিটুনি শব্দটার আসলে অর্থ কি দাঁড়ায়, ইংরেজি ‘মব’ মানে উত্তেজিত জনতা। চলতি বাংলায় অনেক সময় বলা হয় ‘হুজুগে পাবলিক’। লিঞ্চিং অর্থ জনতার দ্বারা আইনবহির্ভূত হত্যা। মব-লিঞ্চিংয়ের আভিধানিক বাংলা গণপ্রহার; প্রচলিত অর্থে গণধোলাই বা গণপিটুনি। তবে লিঞ্চিং মানে শুধু মারধর বোঝায় না বরং উত্তেজিত জনতার দ্বারা কোনো একক ব্যক্তিকে বা এক দলকে পেটানো, কোপানো, পোড়ানোকেও বোঝায়। বাংলাদেশের পটভূমিতে বলা যায়, সমাজে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে।

 তবে এই উত্তেজিত জনতার আচরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সমাজ-মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বোঁ বলেন, ‘জনতার ভিড়ে ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তার বিলুপ্তি ঘটে এবং প্রতিজন ব্যক্তি মিলে উত্তেজিত জনতার সমষ্টি তৈরি হয়। জনতার সম্মিলিত মন তখন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেয়।’ আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান গণপিটুনি নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। গণপিটুনির পাশাপাশি প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এবং এসব ঘটনায় জনতার প্রতিরোধহীনতা তথা নিষ্ক্রিয়তা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। সচেতন জনপরিসরে এ উদ্বেগ নিশ্চয় লক্ষণীয়। আমাদের মানবাধিকার কর্মী ও গবেষকরা বারবার বলে আসছেন, সামাজিক অসহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশ, সরকারের সমালোচনা এবং ধর্মীয় সমালোচনা এসব বিষয় এখন সবার জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গণপিটুনিতে মৃত্যুর যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা অনেকটাই আইনি শাসনের প্রতি জনগণের অনাস্থা থাকার কারণে। একই সাথে বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা ও বিচার পেতে নানা ঝক্কি-ঝামেলার কারণে দেশে সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। এমনকি গ্রাম-গঞ্জে আগে যে একপ্রকার সালিশী ব্যবস্থা ছিল, তাতেও আজ ঘুণ ধরেছে। অন্যায়-অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতির কারণে সেই ব্যবস্থাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে আইন সম্পর্কে সার্বিকভাবে আমাদের জনগণ সচেতন নয়। আইনের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা তেমন একটা নাই বললেই চলে। ফলে অপরাধের পরিণাম-পরিণতির ব্যাপারেও মানুষ অসচেতন। এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ও গুণগত পরিবর্তন সাধিত হওয়া চাই। আমরা চাই, যে কোন গণপিটুনির ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে যথাসম্ভব দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হউক। নিরপরাধ কিংবা অপরাধী যেই হউক না কেন, তাকে পিটিয়ে মারার এখতিয়ার কারও নাই। অনেক সময় প্রকৃত ঘটনা না জানিয়া এবং অপরাধীকে না চিনিয়াও অনেকে গণপিটুনিতে অংশ নেয় যা আরও বিপজ্জনক। বস্তুত গণপিটুনি নামক বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড সর্ববিচারেই বন্ধ হওয়া দরকার। কেননা নিরীহ লোকেরা এর নির্মম শিকার হয়ে থাকে। এইরূপ হত্যাকান্ড এককথায় সভ্যতা ও মানবতা বিবর্জিত। গণতান্ত্রিক দেশে এটা মোটেও কাম্য নয়। তাই অপরাধীদের যথোচিত শাস্তি হওয়া দরকার। শাস্তি হলে কেবল এই প্রবণতা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদেরকেও এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সচেতন এবং প্রতিরোধে সক্রিয় হতে হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩