গণপরিবহনের নৈরাজ্যের বহিঃপ্রকাশ ছাত্র আন্দোলন

গণপরিবহনের নৈরাজ্যের বহিঃপ্রকাশ ছাত্র আন্দোলন

রায়হান আহমেদ তপাদার :বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ৬৪ জন মানুষ মারা যায়, পঙ্গু হয় ১৫০ জন। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করা মানুষের মধ্যে ৯০ শতাংশই ঘটে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। যারা মারা যায় তাদের অর্ধেকের বয়স ১৫ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ বিশাল এক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যুর কারণে তাদের পরিবারগুলো পথে বসে। সড়ক দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বাংলাদেশের মোট জিডিপি’র শতকরা এক দশমিক ৬ ভাগ। এ ক্ষতির দায় পরিবহন খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিতে হবে। সারা দেশে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৩টি। অথচ এসব যানবাহন চালানোর জন্য বিআরটিএ’র লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক রয়েছে মাত্র ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৮১৬ জন। তাহলে বাকি প্রায় ২৪ লাখ যানবাহন চালায় ভুয়া, লাইসেন্সবিহীন, অদক্ষ চালক বা  হেলপার। এরা বাস থেকে শুরু করে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানসহ ভারি যানবাহন চালায়। মোট দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশই ঘটে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। রাস্তা একটু ফাঁকা পেলেই গতিসীমা যায় ছাড়িয়ে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা, যাত্রী  বা পথচারীর মৃত্যু অনিবার্য। এছাড়া ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিং, ফিটনেসবিহীন ও তিন চাকার যানবাহনের অবাধ চলাচল, অদক্ষ গাড়িচালক এবং তাদের দীর্ঘক্ষণ বিরামহীন গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। বাসচালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে বাস চাপা পড়ে প্রতিনিয়ত হতাহতের ঘটনা ঘটছে। গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় দুটি বাসের রেষারেষিতে হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ চৌদ্দ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মারা যান রাজীব।

অন্যদিকে ৫ এপ্রিল বাসের চাপায় পা পিষ্ট হলে আয়েশা খাতুন ২৮ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। গত ২ জুলাই সোমবার রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা সড়কে সৈয়দ মাসুদ রানা বাস চাপায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পহেলা জুলাই ক্যান্টনমেন্টের কালশি ফ্লাইওভারে মোটরসাইকেল আরোহী সৌরভ বাস চাপায় মৃত্যুবরণ করেন। এমন অনভিপ্রেত মৃত্যুর কোন কূলকিনারা নেই। রাজধানীতে গণপরিবহনের বেপরোয়া চালক ও হেলপারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে অসহায় যাত্রীরা। নির্দিষ্ট স্থানে স্টপেজ না থাকায় চালক যেখানে খুশি গাড়ি পার্কিং করে। গণপরিবহনগুলো যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো-নামানোর ফলে দুর্ঘটনার শিকার হন যাত্রীরা। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও শিশু যাত্রীরা তাড়াহুড়া করে বাস থেকে নামতে গিয়ে প্রায়ই আহত হন। বাস মালিকরা বেতনে চালক নিয়োগ করে না। নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে বাস ভাড়া দেয়। তাই যত বেশি ট্রিপ ততো বেশি টাকা। ওভারটেকে মারে, মানুষকে পিষে মেরে যত তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছানো যায় ততো আগে ফিরতি ট্রিপের সিরিয়াল মেলে। টাকার টার্গেট মিটাতে বেশি ট্রিপ দিয়ে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে হয়। মালিকের অধিক মুনাফা লাভের আশা পূরণ করতে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছুতে হয়। ফলে মহাসড়কে ওভারটেকিংয়ের অশুভ প্রতিযোগিতায় বাড়ে সড়ক দুর্ঘটনা। এখন পর্যন্ত যা প্রকাশিত তাতে মনে করার কারণ আছে যে, এটা কেবল ১৬-১৭ বছরের তরুণদের আন্দোলনের পাশাপাশি তাদের মা-বাবারও সম্মতির আন্দোলন। বিশেষ করে মায়েরাই মূলত সন্তানদের স্কুল-কলেজে পৌঁছে দিতে আসে। এর একটা বড় কারণ সড়ক ও যানবাহনের অনিরাপত্তা। তাই এই মায়েদের পূর্ণ সম্মতি আছে পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রতি।

অন্তত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, আশির দশকেও কোনো অভিভাবককে পাওয়া যেত না যে সন্তানের আন্দোলনে অংশ নেয়ায় সম্মতি দেবে। কিন্তু এখনকার পড়ুয়াদের আন্দোলনে অভিভাবকদের পূর্ণ সম্মতি আছে, এর বড় প্রমাণ হলো গত চার দিনে তারা লাগাতার মাঠে উপস্থিত থাকছে; বাসায় বাধা তেমন পায়নি শুধু না মায়েরা পরের দিনও ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনছে বা তাদের আসতে দিচ্ছে। সম্ভাব্য এর মূল কারণ হলো, চরম অনিরাপদ বেপরোয়া যানবাহন আর এই নৈরাজ্যকে সম্মতি দেয়া পাবলিক জবাবদিহিতাহীন সরকার ও এর ক্ষমতা- এসবের প্রতি অনাস্থা। বেপরোয়া এই ব্যবস্থা রাজীব ও মিমকে হত্যা আর সাথে আরো দশজনকে মারাত্মকভাবে পিষে মেরে ফেলার অবস্থায় আহত করেছে। কিন্তু এই বীভৎসতার অভিজ্ঞতা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, এটা কেবল রাজীব বা মিমেরও নয়, রাজীব অথবা মিমের ভেতর আসলে প্রতিটি শিক্ষার্থী ও তাদের সড়ক নিরাপত্তা দিতে আসা মায়েরা প্রত্যেকে নিজেকেই দেখতে পেয়েছেন। ঘাতক বেপরোয়া পরিবহনের সরাসরি শিকার হলো মা এবং সন্তানেরা। তাদের সাথে রাজীব-মিমের ফারাক হলো যে, এরা দু’জন পরিবহন নৈরাজ্যে হত্যার শিকার হয়েছে আর এই মা-সন্তানেরা এক্সিডেন্টলি মারা যায়নি, তাই বেঁচে আছে। ফলে চরম নৈরাজ্যের বিপরীতে একটা সুস্থ সিস্টেমের এক নির্বাহী সরকার পরিচালনার অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার জন্য মা বা সন্তান কাউকেই দাওয়াত দিতে হয়নি। এটি ভুক্তভোগীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের প্রকাশ। এ কারণে সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা গেছে অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে মাঠে আইডেন্টিফাই করে বাহবা দিতে। অর্থাৎ পড়ুয়া সন্তানের সাথে সমান সরাসরি ভুক্তভোগী বলে অভিভাবকেরা এই আন্দোলনে সম্মতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে।

এই আন্দোলনকারী কারা? অনেকে এদেরকে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা ছেলে বলে সম্বোধন করছেন। এটা সম্ভবত অসতর্কতা অথবা আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি বোঝাতে ‘বাচ্চা ছেলে’ কথা যতটা না তাদের বয়স বোঝানোর শব্দ, এর চেয়ে বেশি তাদের প্রতি সহানুভূতিসূচক শব্দ। তবুও সেটি যাই হোক, বয়সের বিচারে এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৬-১৭ বছর। অর্থাৎ টিনএজের শেষার্ধে। এই বয়সের মূল বৈশিষ্ট্য হলো পরিবার ও সমাজকে এটি জানান দেয়া যে, আমি এখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারি, চিন্তা করার ক্ষমতা বিকশিত হয়েছে ও ন্যূনতম পরিপক্বতা এসেছে। ফলে প্রতিটি বিষয় আমি কিভাবে চাই অথবা দেখি তা আমাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে আর অন্যদের তা আমল করতে হবে। এসব কারণে তাদের দাবি খুবই চিন্তা করে বলা যার মূল সুর হলো অনিরাপদ সড়ক, সড়ক নিরাপত্তা তাদের মূল ইস্যু। দানব ক্ষমতার নৈরাজ্যের প্রকাশ পরিবহন নৈরাজ্য- এটা তাদের সব ক্ষোভের কেন্দ্র। পরিবহন মালিক-শ্রমিক আজ সড়কে আহত নিজের কোনো বাসযাত্রীকে চিকিৎসা দেয়ার ঝামেলা এড়াতে নদীতে ছুড়ে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে- পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ এই অবিশ্বাস্য জায়গায় চলে গেছে। কেউ আর মানুষের গুণ স্বভাবে নেই। এমনকি এ ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সরকার-মালিক-শ্রমিক নেতা কারো দিক থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। নতুন করে আবার দায় এড়ানোর বুদ্ধি আঁটছে তারা। এক কথায় বললে ১৯৮৩ সালে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের সময় থেকেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা চেয়েছে লাইসেন্স-অনুমোদন কিনে নিতে। পয়সা দিয়ে কিনে নেয়ার এই ব্যবস্থায় তারা সরকারকে শামিল করে নিয়েছে। সেটাই এখন মহীরুহ হয়েছে।

উল্লেখ্য, গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্স দিতে হবে-এটা মন্ত্রী প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন। অথচ মূল ব্যাপারটি হলো লাইসেন্স বা অনুমোদন যদি কিনেই নেয়া যায়, এরপর তা কি আর ‘লাইসেন্স’ বলে বিবেচ্য হতে পারে। সেটি তো তখন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষালব্ধ দলিল নয়, এক টুকরো কাগজ মাত্র। এটা চিন্তা করা অবস্থায় সরকার-মালিক-শ্রমিকেরা কেউ নেই। একটা ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়ের ওপর পুলিশ লাঠি তুলছে, পেটাচ্ছে বা ভয় দেখাচ্ছে- এমন অনেক ছবি মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু সব ছবিতেই দেখবেন কোনো ভয় পাওয়ার চিহ্ন নেই, সটান দাঁড়িয়ে আছে, একটুও হেলেনি, মার থেকে বাঁচার চেষ্টা নেই। কেউ একজন ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়ে- এরই হুবহু প্রতীক হলো এ ছবিগুলো। সে বলতে চায়, সে স্বাধীন চিন্তা করতে সক্ষম। ফলে তাকেও আমল দিতে হবে। তার কথা শুনতে হবে। তাছাড়া সিটিং সার্ভিসের নামে ৯৬ শতাংশ বাস চলছে দরজা বন্ধ করে। আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে।অথচ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত। আর ৬২ শতাংশ যাত্রী বাস চলা অবস্থায় ওঠানামা করতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া মিটারের বদলে ৯৪ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলছে চুক্তির মাধ্যমে।

প্রতিদিন যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। যাত্রীদের ভোগান্তি নিরসনে মালিক সমিতি বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর তৎপরতা নেই। গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত কিংবা পুলিশের বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে মোটরযান আইন প্রয়োগ করা হয়, তখন বাস মালিকরা বাস চালানো বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে থাকে। বাস মালিকরা জানায়, প্রতিটা বাস ২০ শতাংশ আসন খালি নিয়ে চলবে, এমনটা ধরেই ভাড়া ঠিক করা হয়েছে। তাহলে আলাদা করে সিটিং সার্ভিস চালু রাখা বা আলাদা ভাড়া নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করার ফলে দ্রুত প্রাইভেট কার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু যানজটমুক্ত মহানগরীর জন্য গণপরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য দূর করা সময়ের দাবি। রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন ধরনের নৈরাজ্য বন্ধে বিআরটিএ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিলে গণপরিবহনে দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে করি।
লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]