গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ঐক্যের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ঐক্যের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও আইনের শাসন অব্যাহত রাখতে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সবার ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।


বৃহস্পতিবার (০৯ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদের নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এ আহ্বান জানান।

এসময় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, শত প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি ও বৈরিতার মধ্যেও দেশে সুশাসন সুসংহতকরণ এবং গণতন্ত্র চর্চা ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে ইংরেজি বছরের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। এরই অংশ হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদের শীতকালীন অর্থাৎ বছরের প্রথম অধিবেশনে সরকারের এক বছরের কার্যক্রম ও সফলতা তুলে ধরে মূল্যবান ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি।

এ সময় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

রাষ্ট্রপতি সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সময় বিউগলে আগমনী বার্তা ও জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে। এরপর তিনি নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেন।

ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থসামাজিক উন্নয়নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সবার ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য আমি উদাত্ত আহ্বান জানাই। এছাড়া স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার সফল বাস্তবায়নে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। আমি সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রতিষ্ঠান মহান জাতীয় সংসদে যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাই।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সমুন্নত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুজ্জ্বল রাখতে দেশ থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণরূপে নির্মূলের মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে বাঙালি জাতিকে আরও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একাত্তরের শহীদের কাছে আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ রয়েছে। আসুন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এবং দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা তার ১৬৩ পৃষ্ঠার লিখিত ভাষণে বিগত দিনে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন পদক্ষেপ এবং তা বস্তবায়নের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। সর্বক্ষেত্রে সরকারের সার্বিক উন্নয়ন চিত্র রাষ্ট্রপতির ভাষণে ওঠে আসে। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মাসেতু, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতিও তিনি তুলে ধরেন।

দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ প্রতিহত করতে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে আইনের শাসন সুসংহত ও সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় কার্যকর করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও হত্যা মামলা এবং বিডিআর হত্যাকাণ্ড মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে। আদালত দোষীদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছেন। এছাড়া হলি আর্টিজান হামলা মামলা, নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায়ও দেওয়া হয়েছে।

‘দুর্নীতি, জুয়া, মাদক, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে এবং জনজীবনে স্বস্তি সৃষ্টি করেছে।’

নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনসহ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে সক্ষম হওয়ার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যে পথে আমরা হাঁটছি, সে পথেই বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে যেতে হবে। এ বছর আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবো। আমাদের দৃষ্টি ২০২১ সাল ছাড়িয়ে আরও সামনের দিকে, ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে- এটাই জাতির প্রত্যাশা। আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন এবং সমাজের সব স্তরে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা সরকার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনসহ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হবো।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ পেতে পারে না।

জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় প্রধান নিবাচন কমিশনার, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।