সাম্প্রতিক বন্যায় রংপুর অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি

গঙ্গাচড়ায় বালুতে ঢেকে গেছে আমনক্ষেত

গঙ্গাচড়ায় বালুতে ঢেকে গেছে আমনক্ষেত

গঙ্গাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি : রংপুরের গঙ্গাচড়ার তিস্তাকুলবর্তী এলাকায় বালুর স্তরে ঢাকা পড়েছে আমনের ক্ষেত। গত ১১ সেপ্টেম্বর উজান থেকে ঢলের পানির সঙ্গে আসা বালুতে সদ্য রোপনকৃত আমনের চারা তলিয়ে গেছে। ফলে অনাবাদী পড়ে আছে নষ্ট হয়ে যাওয়া নদী তীরবর্তী এসব জমি।সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বিশেষ করে তিস্তার চরাঞ্চলে বন্যার পানি নেমে গেলেও রোপণকৃত ধানের চারা আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। কোনো কোনো এলাকায় বেশিদিন পানির নিচে থাকায় চারা পচে নষ্ট হয়ে গেছে। আবার শংকরদহসহ বেশকিছু এলাকায় বালুর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে আমনের ক্ষেত। কয়েকদিন আগের সবুজ তরতাজা আমন ক্ষেতগুলো বালুর নিচে তলিয়ে গেছে। নতুন করে চারা রোপণের সময় না থাকায় অনাবাদী পড়ে আছে এসব জমি। কৃষকরা জানান, উজান থেকে আসা ঢলের পানিতে গত সেপ্টেস্বর মাসের ১১ তারিখে সৃষ্ট বন্যায় গঙ্গাচড়ার তিস্তা ও ঘাঘট নদী সংলগ্ন এলাকায় আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জলাবদ্ধতার কারণে আমন ধান গাছ পচে যায়। এছাড়া বন্যার পানির স্রোতে আসা বালু আর পলি জমা হয় চরাঞ্চলের। এতে ঢাকা পড়ে যায় ধানের চারাগুলো। এসব জমিতে আর ধান হবে না উল্লেখ করে স্থানীয় কৃষকরা জানান, গত বছর এসব জমিতে আমন চাষ করে তারা বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২৫ মণ ধান পেয়েছিলেন। কিন্তু এবারে এক ছটাক ধানও ঘরে উঠবে না।

চর শংকরদহ গ্রামের কৃষক মোনাব্বর হোসেন বলেন, ‘বানে মোর ধান সউগ (সব) শ্যাষ করি দিছে বাহে, ধানবাড়ি (ধানক্ষেত) য্যান বালুবাড়ি হয়্যা গেইচে। এবারে কপালত (ভাগ্যে) যে কী হইবে আল্লায় জানে।’ নতুন করে এসব জমিতে আর চারা লাগানোর সুযোগ না থাকায় এলাকার কয়েকশ’ একর জমি অনাবাদী পড়ে আছে বলেও জানান তিনি। উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, সেপ্টেম্বর বন্যায় এক হাজার হেক্টর জমির আমন  ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। তবে প্রকৃত ক্ষতির হিসেব এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকই ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুনরায় চারা লাগিয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, যাদের সুযোগ হয়নি তারা ওইসব জমিতে আগাম রবি ফসল চাষ করবে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসের বন্যায় উজান থেকে আসা ঢলে রংপুর অঞ্চলে নদ-নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ৬ হাজার ৩৮৪ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে যায়। এরই মধ্যে পানি নামতে শুরু করলেও এসব জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কায় আছেন কৃষকরা। তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পানি দ্রুত নেমে গেলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বন্যায় এ অঞ্চলের দুধকুমার, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এবং তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিশেষ করে কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়। এতে দুই জেলার ৬ হাজার ৩৮৪ হেক্টর ফসলি     
গঙ্গাচড়ায় বালুতে ঢেকে

জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে ৬ হাজার ২৪২ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের চাষ করা হয়েছিল। বাকি জমিতে ছিল ডাল, চিনাবাদামসহ বিভিন্ন শাকসবজির আবাদ। গাইবান্ধায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা এবং ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। এসব এলাকায় তলিয়ে যাওয়া ফসলি জমির পরিমাণ এক হাজার ৭৬৮  হেক্টর। কুড়িগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদর, উলিপুর, চিলমারী, রাজীবপুর, রৌমারী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলায়।কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের গারুহারা গ্রামের কৃষক আব্দুল ওহাব বলেন, বন্যার পানিতে তলিয়ে তার ৬০ শতক জমির আমন ধানের চারা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। একই ইউনিয়নের মাঝের চর এলাকার কৃষক আলীমুদ্দিন জানান, এখনো তার প্রায় এক একর জমির ধান ও সবজি পানিতে তলিয়ে আছে। ওই ফসলের আর ভরসা নেই।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, পানিতে নিমজ্জিত সব ফসলই নষ্ট হবে না। তবে এটা নির্ভর করে পানি সরে যাওয়ার ওপর। এরই মধ্যে পানি নামতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট এলাকা ঘুরে কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফসল পুরোপুরি নষ্ট হলে সে জমিতে কৃষকদের ডাল জাতীয় ফসল আবাদ করতে বলা হচ্ছে।রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে কৃষি বিভাগের লোকজন নিয়মিত বিভিন্ন এলাকার খোঁজখবর রাখছেন। পানি যে হারে সরে যাচ্ছে, তাতে আশা করা যায় সব ফসল নষ্ট হবে না। নদ-নদী সংলগ্ন জমির ফসলই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে উল্লেখ করে তিনি জানান, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকদের ডাল জাতীয় শস্যসহ আগাম রবি মৌসুমের শাকসবজি আবাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।