খুচরো কথা

খুচরো কথা

হাসনাত মোবারক : আজকের শিরোনামটি অভিভূত হওয়ার মতো নয়। ভালো শিরোনামের লেখাই এদেশের মানুষের মন পরিবর্তন করে দিতে পারে নাই। আর খুচরো কথা কতটুকু পরিবর্তন ঘটাবে! হা। তবে খুচরো কথা খেলো ব্যাপারও না? অনেক বড় বড় হিসাবের ক্ষেত্রেও খুচরো টাকার দরকার পড়ে। খুচরো  শব্দটাকে এর আগেও বিভিন্ন লেখায় ব্যবহার করেছি। আমরা প্রতিদিন  অনেকগুলো মানুষ ও  অনেক অনেক ঘটনার সম্মুখীন হই । এটাকে জীবন পথের খুচরো কথা বলা যায়। যদিও খুচরা খুচরোকলি দিয়ে এই দেশের মানুষের মন কতটুকু পরিবর্তন হবে ! এটা নিয়ে আমিও সংশয়! শুরু যাক। আমরা তখন দেশ বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি নিয়ে ব্যাপক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করি। কোনো এক পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। তখনো মফস্বল বা গ্রামের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মুরব্বি টাইপের মানুষজন আলোচনা করতেন। কেউ কেউ আমাদের মতো তরুণদের সাথেও পড়ালেখার বিষয়ে ডিসকাস করতেন। অনেক বছর হলো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তীতে গ্রামের মানুষের আলোচনা শোনা হয় না। যতটুকু ইনফরমেশন পাই মিডিয়া মারফত।
অনেক আগের একটা ঘটনা বলি। কোনো এক পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। এজন্য মিডিয়ার লোকজন ব্যতিব্যস্ত । মিডিয়ার লোকজন খুঁজে খুঁজে বের করছেন ব্যতিক্রম কোনো বিষয়। যেটাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই যেন সবাই বিদ্যামুখী বিশ্বের অভিমুখী হয়। আমরা ব্যতিক্রমধর্মী সংবাদের জন্য অপেক্ষা করি। চ্যানেলটির নাম স্মরণে আসছে না। এজন্য ক্ষমা চাচ্ছি। পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তীতে মিষ্টি বিক্রির খবর প্রচার করছে। পরীক্ষার ভালো ফলাফলের সাথে মিষ্টি ব্যবসায়ীদের একটা ব্যবসা জড়িত থাকে । সেটা আমরা জানি। যাইহোক সেদিনের মিষ্টি বিক্রির সংবাদ দেখতেছিলাম। সাথে ১০ বছরের একটা ছেলে। সে আমাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল। পরীক্ষার ফলাফলের সাথে মিষ্টির দোকানের সম্পর্ক কি!  অনেক সময় সহজ সহজ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
আমি অন্যান্য পেশার চেয়ে সাংবাদিকতা পেশাকে বেশি সম্মানের সাথে দেখি। বরং সাংবাদিকতা কোনো পেশা নয় বরং জীবনের মহান ব্রত। নিজেও একজীবনে সাংবাদিকই হতে চেয়েছিলাম। ফতেহ লোহানী, কামাল লোহানী, ফজলে লোহানী সিরাজগঞ্জের মানুষ। এ তথ্য জানার পর সাংবাদিক হওয়ার  আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়েছিল। যদিও পরোক্ষভাবে আমি মিডিয়াতেই কাজ করি।
সাংবাদিকরা একটি দেশের মানুষের রুচি ও আচারকে পরিবর্তন করে। মানুষের মনোভাব পরিবর্তন করে দিতে পারে। দেশের মানুষ কি পড়বে আর কি খাবে সেটাও মিডিয়া থেকে মানুষ শেখে। আজ থেকে বিশ বছর আগের কথা স্মরণ করুন। তখন বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা এখনকার মতো ছিল না। বাজার অর্থনীতি মিডিয়াকে ব্যবহার করে মানুষের চাহিদার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। হা। এ কথা স্বীকার করতে হয়, তখন বাংলাদেশে মানুষের বার্ষিক আয় এখনকার মতো এত ছিল না বটে। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য। আয় যে হারে বেড়েছে বাজার অর্থনীতি মানুষের চাহিদাকে তার দশগুণ করে ছাড়ছে। আলোচনা অন্যদিকে যাচ্ছে। তবুও এ আলোচনা ধান ভানতে শিবের গীত নয়।
জাতির কাছে অনেক প্রশ্ন জমা হয় রোজ। একটি দেশের মিডিয়া যখন একজন রাজনীতিবিদের  লাইভে এসে সিগারেট খাওয়ার দৃশ্য প্রচার করে। নাথিং। এটা আমার কাছে আহামরি কিছু মনে হয় নাই । একজন মানুষ সিগারেট খেতেই পারে। সিগারেট প্রকাশ্যে খাওয়াটাকে ভেরিফাই করে সোশাল মিডিয়া তথা সকল যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম।
দেশে হাজার হাজার দুর্নীতি ঘুষ আর রাহাজানি হচ্ছে সেসব নিয়েও মানুষকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখেছি। বাট যতটুকু সোচ্চার সেটুকুর আয়ুষ্কাল খুব কম। এমন কিছু লোককে দেখেছি ইস্যু নিয়ে কথা বলতে। মূল বিষয়টি পর্যবেক্ষণ না করে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছে। অর্থাৎ সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহর কথাকে ধার করে বলতে হয়, হুজুগে বাঙালি।’ কানে হাত না দিয়েই চিলের পিছে ছুটেছে।
যে বিষয়টি নিয়ে গল্প বলবো। সেটা হলো মিডিয়ার প্রধানতম কাজ হলো মানুষকে সচেতন করে গড়ে তোলা। শিক্ষনীয় বিষয়ে নাটক, গান, কবিতা, সিনেমা, পথনাটক প্রচার করে গড়ে তোলা। বিগত কয়েক বছর হলো টিভি নাটকসহ অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো মানুষকে টানতে পারছে না। একটি দেশের কালচারাল ভিত মজবুত না হলে সেই জাতি সঠিক  চিন্তা করতে পারবে না। শুধু দালান কোঠা বিদেশি আসবাবপত্র ও খাবারের মান উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে উন্নত বলা যাবে না। আমরা দেখেছি এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন বি এ পাশ মানুষকেও ঝাড় ফুঁকের বিশ্বাসে অটুট করে রেখেছে। এটা কোনো শিক্ষা হতে পারে না। একজন শিক্ষক যেমন কুসংস্কার দূরে ঠেলে আলোর পথ দেখান। তেমনি তিনি ব্যক্তিজীবনেও কোনো মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। যে শিক্ষক নিজে মিথ্যা বলেন তিনি জাতিকে পথ দেখাবেন কেমনে!
আমার মনে পড়ছে একটা টিভি নাটকের কাহিনি। সেই নাটকের নামটি এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। ওই সময় ভাবি নাই। এই নাটকের কাহিনীকে উদাহরণ হিসেবে টানতে হবে। যাইহোক নাটকের থিমটা ছিল। একটা  ছেলে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। পিছিয়ে পড়া এলাকা থেকে উঠে আসা এক যুবক। তার প্রতি এলাকার মানুষের একটা দাবি আছে। পড়ালেখায় শেষ করে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াবে। বাট নগরের উচ্চাশা আর আকাক্সক্ষার সাথে তাল মিলাতে গিয়ে তিনি  হিমিশিম খায়। প্রেমিকের সাথে মিথ্যা বলতে বলতে ভাড়ায় থাকা বাড়িটিকেও নিজের বাড়ি হিসেবে উপস্থাপন করেন। শত শত মিথ্যা দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যায়ে সত্য প্রকাশ পায়। তখন মিথ্যাচারের জন্য তিনি  অপমানিত হয়ে গ্রামে ফেরেন। গ্রামে এসে এক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। আমরা দেখি এরপর তিনি শিক্ষক হিসেবে কোনো শিক্ষার্থীর মিথ্যাকে মেনে নিতে পারেন না। মিথ্যাচারের জন্য তার জীবনের যে অপমান গ্লানি ও ব্যর্থতার বোধ কুঁরে কুঁরে খায়। তাকে বার বার মনে করিয়ে দেয় তার কোনো ছাত্র যেন কখনো মিথ্যা শিখতে না পারে। একজন শিক্ষককে ব্যক্তিজীবনে সৎ ও আদর্শের  হতে হয়। সত্য ও আদর্শবান হওয়াটাই শিক্ষার মূল বিষয়।  
লেখক ঃ কবি ও প্রাবন্ধিক
০১৭৫০৯৩৬৯১৯