খালি হাতে ফিরছে প্রবাসীরা

খালি হাতে ফিরছে প্রবাসীরা

আব্দুল হাই রঞ্জু : দেশে রফতানি আয়ের প্রধানখাত পোশাকশিল্প। পরের খাতটি ধরে রেখেছে প্রবাসী আয়। মূলত খাত দু’টির আয়ের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়ছে তরতর করে। তবে দেশের দ্বিতীয় খাতটি বিকশিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও কাক্সিক্ষত পরিমাণ আয় যে হচ্ছে না, যা স্পষ্ট। প্রতিবছরই প্রায় ২০লাখ কর্মক্ষম মানুষ আমাদের দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও সবার কর্মসংস্থানের তেমন কোন সুযোগ নেই। ফলে বেকারত্ব এখন দেশের জন্য একটি বড় অভিশাপ। এ অভিশাপ মোচনে দেশীয়ভাবে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতিও ভাল না। ফলে শিক্ষিত-আধাশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে।এমনিতেই বিদেশে গমনেচ্ছুক কর্মিদের সংখ্যা যেহারে প্রতিনিয়তই বাড়ছে, সেহারে বিদেশে পাড়ি দিতে পারছে না। এর উপর আবার সাম্প্রতিক সময় বিদেশ থেকে কর্মী ফেরৎ আসার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুত্র মতে, চলতি বছরের নয়মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মি ফেরৎ এসেছেন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকে ফেরৎ এসেছেন ১৬ হাজার কর্মি। সর্বশেষ গতমাসের প্রথম সপ্তাহে ২৫০জন বাংলাদেশিকে ফেরৎ পাঠিয়েছেন সৌদিআরব কর্তৃপক্ষ। শুধু সৌদি আরবই নয়, পূর্বাফ্রিকার দেশ মরিশাস থেকেও বাংলাদেশী কর্মিদের ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে।
একদিকে বিদেশে শ্রমশক্তি রফতানির প্রক্রিয়া প্রায় সংকোচিত। এর উপর যেভাবে কারণে-অকারণে বাংলাদেশী কর্মিদের ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে, যা উদ্বেগের। এমনিতেই মালয়েশিয়াও আরব আমিরাতের বাজার বন্ধ। সৌদিআরব ছিল বাংলাদেশী কর্মিদের কাজের বড়ক্ষেত্র। যেখানেও বিপত্তি! বৈধ অনুমতি থাকার পরও সৌদিআরব থেকে কর্মিদের ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে। অবশ্য বৈধ অনুমতি থাকার পরও কেন সৌদিআরব থেকে কর্মিদের ধরে ধরে দেশে পাঠানো হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। সাথে সাথে সৌদি সরকারের সঙ্গে কুটনৈতিকভাবে এ সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে উদ্বেগ নেয়াও জরুরি বলে আমরা মনে করি। এ প্রসঙ্গে ব্রাকমাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলামও বলেন, ফেরৎ আসা শ্রমিকদের অনেকের কাছেই বৈধকাগজপত্র রয়েছে। এরপরও কেন তাদের দেশে ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের শ্রমবাজার বিরুপ পরস্থিতিতে প্রায় থমকে আছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমবাজার খোলা নিয়ে তেমন কোন উদ্যোগও নেই জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার। অবশ্য বায়রার যুগ্ম সম্পাদক তাজুল ইসলাম বলেন, বায়রার পক্ষ থেকে বন্ধ শ্রমবাজারগুলো ফের চালু করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যেই আমরা সৌদি আরবে বৈঠক করেছি, দ্রুত মালয়োশিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবো। বায়রার আরেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, আসলে বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খোলার যোগ্যতা বায়রার নেই। তবে শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ যেভাবে নেয়া দরকার, আমরা সেভাবেই নিচ্ছি। তবে তিনি এও বলেন, বর্তমানে বিশ্বের শ্রমবাজার এখন দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা অনেক বেশি।
সম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, পূর্ব আফ্রিকার-মরিশাস পোশাক কারখানায় আন্দোলন ও ভাঙচুর করার জের  ধরে ৮০জন বাংলাদেশী কর্মিকে পাঠাচ্ছে দেশটি। এদের মধ্যে ৩অক্টোবর ১৫জনকে ফেরৎ পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, পর্যায়ক্রমে বাকিদেরও পাঠানো হবে। উল্লেখ্য মরিশাসের সাইফেলিক্স নামক দ্বীপে ফায়ারমা উন্টটেক্সটাইল লিমিটেড বেতন-ভাতা সহ বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে বাংলাদেশী কর্মীরা আন্দোলন করেন। আন্দোলনরত কর্মীদের ছয় দফা দাবী নিয়ে ৩০সেপ্টেম্বর থেকে কর্মবিরতিতে যান বাংলাদেশী নারী ও পুরুষ কর্মিরা। আটহাজার ৫৪০ রুপি বেতন, থাকা খাওয়ার খরচ কোম্পানি কর্তৃক বহন, চুক্তি শেষের আগে কাউকে দেশে ফেরত না পাঠানো, ব্যক্তিগতভাবে রান্না করে খাওয়ার সুবিধা দেয়াসহ বিভিন্ন দাবীতে তারা আন্দোলনে যান। বিদেশের মাটিতে আন্দোলন করে দাবি আদায় করা অবশ্যই কঠিন। বাস্তব এ অবস্থার নিরিখে দাবি আদায় করাতো সম্ভব হয়নি; উল্টো কর্মক্ষেত্র থেকে দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, শ্রমবাজারে অস্থির সংকটের কারণে ২০১৮ সালে জনশক্তি রফতানি কমেছে ২৭ শতাংশ। এবছরের প্রথম তিনমাসেও নিম্নমুখী ধারায় আছে শ্রমরফতানি। একারণে বিদেশে শ্রমবাজার খোঁজা সম্ভব না হলে নিকট ভবিষ্যতে জনশক্তি রফতানির ধারা আরো কমে আসবে। এজন্য নতুন বাজার খোঁজার বিকল্প নেই। কিন্তু সেখানেও কার্যকর কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সুত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৮১জন কর্মি কাজ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। আগের বছর এটি ছিল ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন। যা গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে জনশক্তি রফতানি হয়েছিল ২লাখ ৪হাজার ২০১জন। এবছরতা ১৯শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ জনে।
সুত্র মতে, দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানিতে আস্থার প্রতীক ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা জটিলতা, কুটনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানা প্রতিকুলতায় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছে শ্রমবাজার। ফলে প্রতিবছর সৌদিআরবে জনশক্তি রফতানির হার কমে আসছে। জানা গেছে, সৌদিআরব এখন বাংলাদেশী কর্মির চেয়ে পাকিস্তানী কর্মি নেয়ার কোটা বাড়িয়ে দিয়েছে। পক্ষান্তরে নানা কারণে চলতি বছরের নয়মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৫হাজার বাংলাদেশি কর্মি ফেরত এসেছেন। যা আগেই বলেছি।  ব্রাকমাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১২হাজার বাংলাদেশী সৌদি আরব থেকে ফেরত এসেছেন। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সাড়ে চারহাজার, ওমান থেকে প্রায় তিনহাজার, মালয়েশিয়া থেকে আড়াইহাজার, কাতার থেকে দেড়হাজার ও মালদ্বীপ থেকে ফিরেছেন একহাজার বাংলাদেশী। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ১৬২টি দেশে জনশক্তি রফতানি করছে। এর মধ্যে কোন কোন দেশ থেকে কর্মিদের দেশে ফেরৎ আসতে হচ্ছে। সংগত কারণে নতুন করে শ্রমবাজার খুঁজতে হবে। যেন আমাদের বিপুল পরিমাণ মানবসম্পদ বিদেশে রফতানি করা যায়। তাহলে সম্ভাবনার বিপুল পরিমাণ মানবসম্পদ আমাদের অর্থনীতির জন্য আশির্বাদ হতে পারে। যেহেতু আমাদের অর্থনীতির ভালমন্দ প্রবাসী রেমিটেন্সের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল, সেহেতু শ্রমশক্তি রফতানির ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করতে না পারলে প্রতিবছরই যে বিপুল পরিমাণ মানুষ কর্মক্ষম হয়ে উঠেছে, তাদের কর্মসংস্থানকে নিশ্চিত করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক
-০১৯২২৬৯৮৮২৮