ক্ষুধা, দরিদ্রতা এবং খাদ্যের অসম বন্টন

ক্ষুধা, দরিদ্রতা এবং খাদ্যের অসম বন্টন

  অলোক আচার্য : পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রতিটি জীবেরই রয়েছে ক্ষুধার অনুভূতি। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ প্রাণী ছুটেছে ক্ষুধা মেটানোর উদ্দেশ্যে। কেউ নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাদ্য নিয়ে উচ্ছিষ্ট ফেলে দেয় আবার সেই উচ্ছিষ্ট খেয়েই দিন কাটিয়ে দিচ্ছে অনেকে। কেউ আবার আধপেটা বা একবেলা খাওয়ার জন্য হাড়ক্ষয় করে। কি বিচিত্র এই পৃথিবী! একদিকে ক্ষুধার্ত বুভুক্ষু মানুষের চিৎকার অন্যদিকে আধুনিক সভ্যতার আনন্দ। সেই যান্ত্রিকতা আনন্দে চাপা পড়ছে বুভুক্ষ মানুষের কষ্ট, আর্তনাদ। পরস্পর বিপরীতধর্মী হলেও এটাই আজ পৃথিবীর নিয়ম। এই নিয়মেই চলছে সবাই। আমরা মেনেই নিয়েছি কেউ না খেয়ে থাকবে আর অতিরিক্ত খাদ্য ডাষ্টবিনে ফেলা হবে। তারপর সেই ডাস্টবিন থেকে কুকুর, বিড়ালের সাথে অখাদ্য খুঁটে খুঁটে খাবে এই পৃথিবীতে জন্ম নেয়া কিছু ভাগ্যহীন মানুষ। খাদ্যের অসম বন্টন এবং অর্থনীতির ধনতান্ত্রিক গতি-প্রকৃতি এর জন্য দায়ী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতো অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলোর দেয়া এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছর বিশ^জুড়ে ক্ষুধায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৮২ কোটি ১০ লাখ। পরপর তিন বছরই ক্ষুধায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ বিগ্রহ, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ২০১৫ সাল থেকে এ সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। জাতিসংঘের ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বিশ^কে ক্ষুধামুক্ত করা। ২০১৭ সালে যেখানে ৮১ কোটি ১০ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত খেতে পারতো না সেখানে বর্তমানে সেই সংখ্যাটি ৮২ কোটি ১০ লাখ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে ২০০ কোটির বেশি মানুষ, যার আট শতাংশ উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ। তারা পর্যাপ্ত পুষ্টি ও নিরাপদ খাবার পায় না। সেই সাথে প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রায় দ্ইু কোটির বেশি মানুষ ভালোভাবে খেতে পায় না বলে বলা হয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে অন্তত ১০ লাখ। ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়া এবং প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা উন্নত দেশ গড়ার একটি চ্যালেঞ্জ।

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি- কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা এই কবিতা থেকে ক্ষুধার যন্ত্রণা সম্পর্কে কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। আবার প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন, রুচির রহস্য ক্ষুধায়। যেখানে ক্ষুধা নেই সেখানে রুচিও নেই। অনেকের কাছে দুমুঠো ভাত যেন অমৃত। বিপরীতে অনেকের কাছে ভালো ভালো সুখাদ্যও অরুচিকর। ক্ষুধা প্রাণীর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। মানুষ বাঁচার জন্য খায় নাকি খাওয়ার জন্য বাঁচে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সে প্রশ্ন অর্থহীন। প্রকৃতপক্ষে ক্ষুধা এমন একটি কষ্ট যা ক্ষুধার কষ্টে না থাকা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি অনুভব করতে পারে না। তা সম্ভবও নয়। ব্যথিতের বেদন কেবল একজন ব্যথিত হৃদয়ই বুঝতে পারে। বর্তমান পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে। ঠিক সেই সময়ে প্রচুর খাবার নষ্ট হয়। ভারসাম্যহীন এই অবস্থার জন্য আমাদের দায় রয়েছে। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের যন্ত্রণার আওয়াজ অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার মারণাস্ত্রের বিকট শব্দ। কত কত আধুনিক অস্ত্রের সাজে সজ্জিত এই ধরণী। সেসব অস্ত্র কিনতে বা তৈরি করতে কত শত কোটি টাকা খরচ করছে বিশ^! এটাই সবথেকে আশ্চর্যের যে মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা অন্য মানুষের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য এসব অস্ত্র কিনছে। সেসব অস্ত্র বানাতেও কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে।

যারা যুদ্ধ বোঝে না, যারা অস্ত্র বোঝে না যারা দুমুঠো খাবার চেনে। অস্ত্র সেখানে নিরর্থক। যুদ্ধ মানেই অশান্তি, খাদ্যাভাব, পীড়িত মানুষের আর্তনাদ, গৃহহীন হওয়া, আত্মীয় স্বজনের জন্য চোখের জল ফেলা। উত্তেজনার বশে ক্ষমতার মোহে করা যুদ্ধে এর থেকে বেশি পাওনা আর কি আছে।ক্ষুধা এবং দারিদ্রই একটি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। এর পেছনের কারণগুলো সমাধান করা তাই জরুরি। ২০১৫ সালে এন এজেন্ডা ফর দ্য গ্লোবাল ফুড সিসটেম শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এশিয়া বা আফ্রিকাসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষুধা ও দরিদ্র্যতার বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই ক্ষুধা ও দরিদ্র্যতামুক্ত বিশ্ব গড়ার এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে গোটা বিশ্ব থেকে দরিদ্র্যতা দূর করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্বে প্রতিরাতে কমপক্ষে ৮০ কোটি মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়। বিভিন্ন দেশ এ থেকে উত্তরণের জন্য একটি ভালো খাদ্য ব্যবস্থা গড়তে গ্রামাঞ্চলে উন্নত কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু আয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র নির্দেশ করে। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন তখন সম্ভব হবে যখন দরিদ্রতার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সক্ষম হবো। এটা একটা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে সারা বিশ্বের সামনে নিজের উন্নয়ন একটি মডেল। তবে এসডিজি অর্জন করতে হলে অবশ্যই দরিদ্রতার হার একেবারে কমিয়ে আনতে হবে। সোনার বাংলা গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি হাতের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে প্রতিটি পরিবারেই ফিরবে আর্থিক সামর্থ্য। খাদ্য বন্টনে ভারসাম্য আনাও জরুরি।
লেখক ঃ সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬