ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

আব্দুল হাই রঞ্জু : জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য, এটাই চিরন্তন সত্য। তবে এমন কিছু মৃত্যু, যা সহসাই মেনে নেয়া যায় না। পরিনত বয়সে মৃত্যু আর কিশোর বয়সে মৃত্যুর মধ্যে অনেক তফাৎ। মাত্র ১১ বছর বয়সের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র তিতাস ঘোষ। বাড়ি নড়াইলের কালিয়া পৌর এলাকায়। ২৪ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুত্বর আহত তিতাসকে ভর্তি করা হয় খুলনা মেডিক্যাল কলেজে। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২৫ জুলাই তিতাসকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়।
আশংকাজনক অবস্থায় ২৫ জুলাই একটি অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নিতে রাত আটটায় কাঁঠালবাড়ী ১নং, ফেরিঘাটে পৌঁছে। তিতাসের ভাগ্য খারাপ, ওই সময়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মন্ডলের ফরমায়েশ পালন করতে ফেরি ছাড়তে তিন ঘন্টা বিলম্ব করে। তিতাসের মা ও বোনের শত কাকুতি মিনতির পরও ফেরি সংশ্লিষ্টদের ন্যুনতম সহানুভুতি পাওয়া যায়নি। ভিআইপির ফরমায়েশ বলে কথা! লংঘন করলে হয়ত চাকুরি চলে যাবে। এমন শংকা থেকে ফেরি ছাড়া হয়নি। টানা তিন ঘন্টা পর যুগ্ম-সচিবের আত্মিয়রা ফেরিতে ওঠার পর ফেরি চলতে শুরু করে। দুর্ভাগ্য- এরই মধ্যে তিতাসের মৃত্যু ঘন্টা বেজে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যে তিতাস মৃত্যুবরণ করে। কি নির্মমতা! শুধু যুগ্ম-সচিবের আত্মীয়দের ফেরিতে নিতে তিন ঘন্টা বিলম্ব। মনে হয়, এটা নজিরবিহীন ঘটনা। এ ঘটনার জন্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করে স্থানীয় মানুষ ও তিতাসের স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছে।
উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হলে ক্ষমতার অপব্যবহার করার ঘটনা হর-হামেশাই ঘটে। কারণ আমাদের দেশে ক্ষমতাধর আমলাদের বিচার সহসাই হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জবাবদিহিতা করতে হয় না। আর একজন রাজনীতিককে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। নির্বাচন এলেই ভোটের জন্য জনগণের দুয়ারে যেতে হয়। ফলে কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও একজন রাজনীতিকের জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে হয়। কিন্তু আমলাদের বেলায় আর পুলিশের ক্ষেত্রেতো যা ইচ্ছে তাই হচ্ছে। অতিসম্প্রতি খুলনায় এক গৃহবধূকে রাতভর পালাক্রমে ধর্ষণ করে থানার ওসিসহ ৫ জন। গৃহবধূ তিন সন্তানের জননী নিজের সম্ভ্রম রক্ষায় শত কাকুতি-মিনতি করলেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। গৃহবধুর কাকুতি-মিনতির জবাবে সিনেমার ভিলেনের ন্যায় অট্টহাসি দিয়ে বিবস্ত্র করে তার রুমেই ধর্ষণ করে। ওসি চলে যাওয়ার পর গৌতম দারোগা সহ চারজন রাতভর ধর্ষণ করে। পরে সকালে ফেনসিডিলের বোতল গুঁজে দিয়ে কোর্টে চালান করে।
আদালতে বিচারকের সামনে নেওয়ার পর ওই নারী জিআরপি থানায় তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরেন। এরপর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট খুলনার আদালতে ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় জিআরপি থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজড করা হয়েছে। অবশ্য তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি তদন্ত করার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে হয়ত বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত হতে পারে। আমাদের কথা হলো, একজন মহিলাকে পালাক্রমে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর ক্লোজড কেন, চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের দেশে বদলি, প্রত্যাহার এগুলোই যেন শাস্তি! আমরা চাই, ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণ প্রমাণিত হলে প্রকৃত অপরাধিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অপরাধিদের প্রকৃত শাস্তি না হলে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা রোধ করা কঠিন হবে।
ভিআইপি বলেই কথা! এ দেশে তো ভিআইপির অভাব নেই। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, বিত্তশালী, শিল্পপতি সবাই নিজেকে ভিআইপি মনে করে আচরণ করেন। যদিও তিতাস হত্যার অনাকাংখিত ঘটনার পর মানবাধিকার সংগঠন লিগ্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড পিপলস্ রাইটসের চেয়ারম্যানের পক্ষে জনস্বার্থে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সিনিয়র আইনজীবি জহির উদ্দিন মিলন একটি রিট করেন। রিটে নৌ-মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, কথিত ভিআইপি যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মন্ডলসহ কয়েকজনকে বিবাদি করা হয়েছে। উক্ত রিটে স্কুল ছাত্র তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যুগ্ম-সচিব ও ফেরির ম্যানেজারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রিটে তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন, তিতাসের পরিবারকে তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
অবশ্য ঘটনার পরপরই দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে নৌ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও রয়েছেন। এ ধরনের ন্যক্কারজনক অপরাধে জড়িত ক্ষমতার অপব্যবহারকারী উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত ছিল বলে আমরা মনে করি। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দেশে কোন ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও প্রকৃত অর্থে অপরাধিদের শাস্তি নিশ্চিত হয় না। এমনকি ঘটনার শেষ অবস্থাও জনগণের জানার বাইরেই থেকে যায়। তিতাসের মতো একজন আহত স্কুলছাত্রকে বহনকারী জরুরি পরিবহণে নিয়োজিত অ্যাম্বুলেন্সকে তিন ঘন্টা ফেরি আটকে রেখে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারি যুগ্ম-সচিবের নির্দেশে জনগণের জন্য নিয়োজিত ফেরি আটকিয়ে যে অপরাধ করেছেন, তার উপযুক্ত শাস্তি না হলে আগামী দিনে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা আরো ঘটার সম্ভাবনা থাকবে।
যদিও রিটের জবাবে হাইকোর্ট মন্তব্য করেছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া দেশে কোন ভিআইপি নেই। বাকীরা সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি মর্মেও আদালতে মন্তব্য করা হয়। নৌ-মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব আবদুস সবুর মন্ডলের ফোনের কারণে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে  তিন ঘন্টা দেরিতে ফেরি ছাড়ায় এসব মন্তব্য করেন, হাইকোর্টের বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। আমরা আশাবাদি, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট যুক্তিযুক্তভাবেই উপস্থাপন হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হবে।
পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনস্বার্থ ক্ষুন্ন কিংবা জনসেবার নামে ঘুষ দূর্নীতির ঘটনা আমাদের দেশে নতুন কোন বিষয় নয়। অতিসম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে নিজ বাসায় রাখা ৮০ লাখ নগদ টাকাসহ আটক হন সিলেটের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিক। যদিও আদালতে তার আইনজীবি রহমান হাওলাদার, মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার, খোরশেদ আলম, গাজী শাহ আলম ও ফারুক আহমেদ দাবি করেন, ৮০ লাখ টাকা তার বৈধ আয় থেকে অর্জিত। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকা শাশুড়ি দিয়েছেন এবং বাকী ৫০ লাখ টাকা তার স্ত্রী ডাঃ রুনার আয়ের ও তার সারা জীবনের জমানো অর্থ। আদালতে দুদকের আইনজীবি জামিনের বিরোধীতা করে বলেন, যেহেতু তিনি সরকারি চাকুরজীবি, তার বাসায় এত টাকা কোথা থেকে এসেছে তা জানার প্রয়োজন আছে। বিজ্ঞ আদালত তার জামিন না দিয়ে কারাগার পাঠাবার নির্দেশ দেন। এমনি ছোট বড় ঘটনা প্রায়শই ঘটে। ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধ করা প্রয়োজন। তাহলে স্বপ্নের সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা কঠিন হবে না। প্রকৃত অর্থে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে সকলকেই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আর তা করতে না পারলে জনস্বার্থের কথা বলতে বলতে হয়ত মুখে ফেনা তোলা সম্ভব হবে কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক
ahairanju@gmail.com
০১৯২২-৬৯৮৮২৮