‘কৌশলী’ সভাপতির একটি, সম্পাদকের খুচরা বিনিয়োগ

‘কৌশলী’ সভাপতির একটি, সম্পাদকের খুচরা বিনিয়োগ

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ। শেয়ারবাজারে ২০১০ সালের মহাধসের পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে এই সংগঠনটি। সভাপতি এ কে এম মিজানুর রশীদ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে এখনও বেশ সক্রিয় সংগঠনটি। তবে অভিযোগ উঠেছে, শেয়ারবাজারে এই দুই বিনিয়োগকারী নেতার বিনিয়োগ চিত্র অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ।

সভাপতি এ কে এম মিজানুর রশীদ চৌধুরীর বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবে মাত্র একটি কোম্পানির ২০০ শেয়ার আছে। আর সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাকের বিও হিসাবে ১৫৮ কোম্পানির এক হাজার ৭০৫টি শেয়ার আছে। অর্থাৎ গড়ে একটি কোম্পানির ১১টি করে শেয়ার আছে রাজ্জাকের বিও হিসাবে।
 
অভিযোগ উঠেছে, শেয়ারবাজারে নামমাত্র বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকরী ঐক্য পরিষদের শীর্ষ দুই নেতা অনৈতিক সুবিধা দেয়ার পাঁয়তারা চালান। এজিএম পার্টির সদস্য হিসেবেও কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে একটি বিশেষ চক্র সহায়তাও করে থাকে।

তবে মিজানুর রশীদ চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা নেননি। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিজানুর রশীদ চৌধুরীর বর্তমানে তিনটি বিও হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে আজম সিকিউরিটিজে দুটি। অপরটি হাবিবুর সিকিউরিটিজে। হাবিবুর সিকিউরিটিজ এবং আজম সিকিউরিটিজের একটি বিও হিসাবে কোনো শেয়ার নেই। তবে আজম সিকিউরিটিজে তার ১২০৩০৬০০২৭৩১৩২৫৬ নম্বরের বিও হিসাবে ২০০টি বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার কেনা রয়েছে।

আজম সিকিউরিটিজের দুটি বিও হিসাবের মধ্যে একটিতে নাম দিয়েছেন A.K.M MIIZAN-UR RASHID CHOWDHURY এবং অপরটিতে AKM MIZAN UR RASHID CHOWDHURY। নিজের নামের পাশাপাশি এই দুই বিও হিসাবে বাবা-মায়ের নামও কিছুটা পরিবর্তন আছে।

একটিতে বাবার নাম হিসেবে ALHAZ LAKIUT ULLAH CHY এবং অপরটিতে AL-HAJ LAKI UTULLAH ব্যবহার করা হয়েছে। আর মায়ের নামের ক্ষেত্রে HAJRA KHATUN CHOWDHURY এবং HAZRA BEGUM CHOWDHURY ব্যবহার করা হয়েছে।

বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পদ কাজী আব্দুর রাজ্জাকেরও বর্তমানে তিনটি বিও হিসাব রয়েছে। ইবিএল সিকিউরিটিজ, হাবিবুর সিকিউরিটিজ এবং বানকো সিকিউরিটিজে তিনি এই তিনটি বিও হিসাব খুলেছেন। এর সবগুলোতেই কোনো না কোনো কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি তালিকাভুক্ত ৩১৯টি কোম্পানির মধ্যে ১৫৮টিরই শেয়ারের মালিক।

তালিকাভুক্ত অর্ধেক কোম্পানিতে শেয়ার থাকলেও রাজ্জাকের সম্মিলিত শেয়ার ধারণের পরিমাণ বেশ কম। প্রত্যেকটি কোম্পানিতে গড়ে ১১টি করে ১৫৮টি কোম্পানিতে এক হাজার ৭০৫টি শেয়ার রয়েছে তার।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আব্দুর রাজ্জাকের হাবিবুর রহমান সিকিউরিটিজে ১২০২০৮০০৫৮১৪৭৮১৫ নম্বরের বিওতে ২৫টি কোম্পানির ১৮৫টি শেয়ার কেনা আছে। বানকো সিকিউরিটিজে ১২০২১৫০০১৬০৪১৬২৭ নম্বরের বিও হিসাবে দুটি কোম্পানির ৬৩টি শেয়ার এবং ইবিএল সিকিউরিটিজে ১২০১৯৫০০৬২৫৬৫৯৫৭ নম্বরের বিওতে ১৩১টি কোম্পানির এক হাজার ৫০২টি শেয়ার আছে।

রাজ্জাকের বিও হিসাবের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এবং রূপালী ব্যাংকের একটি করে শেয়ারের মালিক এই বিনিয়োগকারী নেতা।
 
আরএকে সিরামিকস, এসিআই ফরমুলেশন্স, এসিআই লিমিটেড, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, ন্যাশনাল টি, নাভানা সিএনজি এবং রহিম টেক্সটাইলের দুটি করে শেয়ার আছে তার বিও হিসাবে। এছাড়া ফারইস্ট নিটিং, ইনট্রেকো রিফুয়েলিং ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের তিনটি করে এবং পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও ন্যাশনাল ব্যাংকের চারটি করে শেয়ারে বিনিয়োগ আছে রাজ্জাকের। তার বিও হিসাবে পাঁচটি করে শেয়ার আছে ৫৩টি কোম্পানির।

 

এই বিনিয়োগকারী নেতার বিও হিসাবে সব থেকে বেশি কেনা হয়েছে ইভিন্স টেক্সটাইলের শেয়ার। কোম্পানিটির ১৫০টি শেয়ার কিনেছেন তিনি। এছাড়া পিপলস লিজিংয়ের ৬০টি, আরগন ডেনিমসের ৫০টি, বিআইএফসির ৪০টি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৩৪টি, বেক্সিমকো লিমিটেডের ৩৫টি, আফতাব অটোমোবাইলসের ২৮টি এবং ঢাকা ব্যাংকের ২৭টি শেয়ার আছে তার বিও হিসাবে।

রাজ্জাকের বিও হিসাবে ২০টির বেশি শেয়ার থাকা কোম্পানির মধ্যে ইসলামী ব্যাংক ও ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্সের ২৫টি, ব্যাংক এশিয়া ও আইএফআইসি ব্যাংকের ২৩টি, ফ্যাস ফাইন্যান্সের ২২টি, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স ও ডরিন পাওয়ারের ২১টি, ইসলামী ফাইন্যান্স, যমুনা ব্যাংক ও আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের ২০টি করে শেয়ার আছে।

শেয়ারবাজারে নামমাত্র বিনিয়োগের বিষয়ে এ কে এম মিজানুর রশীদ চৌধুরী  বলেন, ‘একটি মানুষ কি শুধু ২০০ শেয়ারের জন্য আন্দোলন করে? আন্দোলন করতে গেলে ডেইলি ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। তাহলে কি আমি আমার তিন হাজার টাকার জন্য আন্দোলন করি? না কি আমি কোনো এজিএমে যায়, এমন কোনো রেকর্ড আছে? এটা হলো আমার একটি কৌশলগত দিক। আমি যখন দেখলাম মাল (শেয়ার) কিনলেই পরিকল্পনা করে ফেলে (দাম কমে যাওয়া) দেয়, তখন আমি বুঝলাম এরা তো আমার পেছনে লেগেছে। তখন কৌশলে আমি আমার শেয়ারগুলো সরিয়ে ফেলি।’

শেয়ার কোথায় সরিয়েছেন? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকোর ২০০ শেয়ার রেখে বাকি শেয়ার আমি বিক্রি করে দিয়েছি। তাছাড়া আপনি যানেন, একজন বিনিয়োগকারীর দুটি, তিনটি, পাঁচটি বিও হিসাবও আছে। আমার বিও হিসাবে কত শেয়ার আছে, এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অথচ কত মানুষ আত্মহত্যা করল, কত বিও হিসাব মাইনাস (ঋণাত্মক) হলো এগুলো কেন আপনারা লেখেন না? আমার কাছে একটি শেয়ার হলেও আছে।’

সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার দুটি মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়।