কোটি টাকার লোকসানে ফুল চাষীরা

কোটি টাকার লোকসানে ফুল চাষীরা

আব্দুল হাই রঞ্জু :মূলত উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পণ্য আমদানি কিম্বা রফতানির অনুমোদন দিয়ে থাকে সরকার। যখন কোন পণ্য দেশীয় চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত হয়, তখন সরকার উৎপাদকের স্বার্থে পণ্য রফতানির অনুমোদন দেয়। যদি কোন কারণে আমদানি কিম্বা রফতানির আদেশের সময় সরকার উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ  বিবেচনায় না নিয়ে কোন পণ্য আমদানির অনুমোদন যদি সরকার দেয়, তাহলে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও পণ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, এটাই স্বাভাবিক।আমাদের দেশটি মুলত কৃষি নির্ভর। এ দেশের চাষীরা বৈচিত্রে ভরা নানা পণ্য উৎপাদনে সফলতার নজির স্থাপন করেছে। বিশেষ করে বৃহৎজনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধানের উৎপাদন বাড়িয়েছে চার গুণেরও বেশি। ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এর পাশাপাশি সবজি উৎপাদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন অনেক উর্দ্ধে। ধান, গম, ভুট্টার চাষাবাদে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সবজি এখন বিদেশে দেদার রফতানি হচ্ছে। খাদ্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবির সবজি চাষীরা কচুর লতা উৎপাদন করে ভাগ্যদুয়ার খুলতে সক্ষম হয়েছে। এখন স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে পাঁচবিবির কচুর লতা কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, কানাডা, জার্মানি, ডেনমার্কসহ বিশে^র প্রায় ২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাঁচবিবি উপজেলার ১ হাজার হেক্টর জমিতে কচুর লতা চাষাবাদ হচ্ছে। শুধু কচুর লতায় নয়, দেশের উৎপাদিত নানা জাতের সবজি এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে সমানেই বিদেশে রফতানি হচ্ছে। অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। লাভবান হচ্ছে চাষী এবং দেশ। সম্ভাবনাময় এমনি আর একটি কৃষি পণ্য ফুল। ফুলকে ঘিরেই আজকের লেখার অবতারণা।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত ফুলের ফসল নামক কবিতায় কবি ফুলের কদর তুলে ধরেছেন এভাবে-  ‘জোটে যদি মোটে দুইটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী’। জঠর জ¦ালা মেটানোর পর বাকী পয়সায় ফুল কেনার কথা কবি বলেছেন অবলিলায়। কিছুদিন আগেও চিন্তার অনেক বাইরে ছিল ফুলের সৌরভ নেয়ার নুন্যতম সুযোগ। যখন মানুষের ক্ষুধা নিবারণের মতো খাদ্যের যথেষ্ট যোগান ছিল না, তখন ফুলের কদর ছিল মানুষের চিন্তার অনেক বাইরে। আজ সে দিনের বদল হয়েছে, মানুষ এখন আর আগের অবস্থায় নেই। জঠর জ¦ালা নিবারণে খাবার জোটেনা এমন মানুষের সংখ্যা থাকলেও শ্রম বিক্রির মতো যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যাদের জন্য খাদ্য সংকট এখনও তীব্র, তাদের জন্য সরকার সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। যদিও গত এক বছর ধরে সরকারি খাদ্য মজুদ সংকটের কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। যা আবার শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। বলতে গেলে এখন না খেয়ে মরার অবস্থা আগের মতো আর নেই। তবে পুষ্টিহীনতা এখন একটি জাতীয় সমস্যা। কারণ মানুষ খাবার পেলেও পুষ্টির অভাব এখন অনেক বেশি। যা মোকাবেলা করতে বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় সরকার পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করছে। যদিও সার্বিক অর্থে পুষ্টির অভাব পূরণ করতে হলে সরকারি কিম্বা দাতা দেশ কিম্বা সংস্থার কৃপার বদলে মানুষের পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সকলের কাজের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে, যার কোন বিকল্প নেই।

তরুণ বয়সে আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করতে ২/৪টি ফুল দেবদারু গাছের পাতায় সাজানো বেদিতে ভরিয়ে খালি পায়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতাম। ফুল বলতে তখন অনেকের সখের বাগানের ফুলই ছিল একমাত্র অবলম্বন। হয়ত রাজধানী কিম্বা নগর মহানগরে দু’চারটি ফুলের দোকান চোখে পড়লেও ছিলনা ব্যবসার ব্যাপ্তি। এখন আর সেদিন নেই। বদলে গেছে ফুলের সরবরাহ। রাজধানীতে এখন ফুলের জমজমাট ব্যবসা হচ্ছে। সারা বছরই দেশজুড়ে শত শত কোটি টাকার ফুলের বাণিজ্য হচ্ছে। সে ফুল যে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হতে পারে, যা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। এখন গোটা দেশেই কম বেশি ফুলের চাষাবাদ হয়। ফুল চাষীরা সে ফুল বিক্রি করে সংসার চালায়। যা আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও দেদার রফতানি হচ্ছে। অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। যা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়াতেও ভুমিকা রাখছে। বাংলাদেশর কাঁচা ফুল এখন মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ব্রিটেন, পাকিস্তান, ভারত, ইতালি, কানাডা, চীন, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও ফ্রান্সে রফতানি হচ্ছে। সূত্র মতে, গত ১৯৯১-৯২ সাল থেকে ফুল রফতানির উদ্যোগ নেয়া হয়। আজ যা মহিরুহে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি টাকার ফুল রফতানি হচ্ছে। অতিব সম্ভাবনার এ ভাগ্য দুয়ার খুলেছে যশোরের ঝিকরগাছা ও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফুল চাষীরা।

 অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ফুল আমদানির অনুমোদন দেয়ায় চীন ও থাইল্যান্ডের প্লাস্টিকের কৃত্রিম ফুলে ভরে গেছে দেশের বাজার। ফলে দেশের কাঁচা ফুলের বাজার এখন অনেকটাই মন্দা। দামে কম হওয়ায় এখন কাঁচা ফুলের বদলে প্লাস্টিকের কৃত্রিম ফুলই মানুষ কিনছে। বাংলাদেশ ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নাছের গনি এ প্রসঙ্গে বলেন, মাত্র ২ বছর আগে বিশ^ ভালবাসা দিবসে এক দিনে ফুল বিক্রি হয়েছিল ৩ কোটি টাকা। আর ২১ ফেব্রুয়ারি, বসন্ত বরণসহ তিন দিবসে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে ফুল ব্যবসায়ীরা। অথচ প্লাস্টিকের কৃত্রিম ফুল আমদানির অনুমতি দেওয়ায় এবারের বসন্ত বরণে আশানুরূপ ফুল বিক্রি হয়নি। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ফুলের বিক্রি কমে যাওয়ায় এখন ফুল চাষীদের মাথায় হাত পড়েছে। অবশ্য এ ঘটনার সূত্রপাত আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ফলে যশোরের ঝিকরগাছা ও কক্সবাজারের চকরিয়ার ফুলচাষীরা ইতিমধ্যেই ফুলের চাষাবাদ কমিয়ে দিয়েছে।

 জানা গেছে, ২০১৬ সালে দেশের ২৫ জেলায় প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়। দেশে ফুলচাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। মাত্র তিন বছর আগেও চকরিয়ায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গ্লান্ডিওলাস চাষ হতো। আর বাকি ৩০০ একর জমিতে গাঁদা, জিনিয়া, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধাসহ অন্যান্য ফুলের চাষ হতো। কিন্তু গত বছর থেকে লোকসানের কারণে ফুল চাষীরা ফুলের চাষাবাদ কমিয়ে এনেছে। একই অবস্থা যশোরের ঝিকরগাছায়ও। এখানেও ফুল চাষ আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। অথচ ফুল চাষে সমূহ সম্ভাবনা থাকার পরও শুধুমাত্র প্লাস্টিকের কৃত্রিম ফুল আমদানির অনুমতি দিয়ে ফুলের চাষাবাদকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। অবশ্য পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থায় এটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর স্বার্থ রক্ষায় শ্রেণী স্বার্থে ক্ষমতাসীনরা গুটিকতক মানুষের জন্য সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করে থাকে।

 যারা বিদেশ থেকে কৃত্রিম ফুল আমদানি করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা করার সুযোগ পাচ্ছে। পক্ষান্তরে ফুলচাষীরা ফুলচাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থা কৃষি অর্থনীতির দেশের জন্য অশনিসংকেত। শুধু যে ফুল চাষের ক্ষেত্রে এমনটি হয়, তা নয়। দেখা যায়, যখনই কোন পণ্য দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়ে দেশের চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হয়, তখনই সে পণ্য গুটিকতক ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষায় আমদানির অনুমোদন দিয়ে উৎপাদনের ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে। অবশ্যই এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকান্ড থেকে প্রভাবশালীদের বিরত থাকতে হবে। তা না হলে উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।মোদ্দাকথা, অমিত সম্ভাবনার ফুলচাষকে উৎসাহিত করতে প্লাস্টিকের কৃত্রিম ফুল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা অতিব জরুরি। অর্থাৎ গুটিকতক ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষার বদলে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে লাখ লাখ ফুল চাষী ও ফুল ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তাহলে হয়ত আগামী বসন্ত বরনের মত অনুষ্ঠানের দিনে ফুল চাষী ও ফুল ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার লোকসান গুণতে হবে না।
 লেখক: প্রাবন্ধিক   
০১৯২২-৬৯৮৮২৮