কোচিং-কিন্ডারগার্টেন-টাস্কফোর্স প্রসঙ্গে

কোচিং-কিন্ডারগার্টেন-টাস্কফোর্স প্রসঙ্গে

হাবিবুর রহমান স্বপন :কোচিং এর পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেনও বন্ধ করার জন্য দেশের সব জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সে মোতাবেক সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজও শুরু করে। দেশের অলিতে-গলিতে, যত্রতত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কোচিং সেন্টার আর কিন্ডারগার্টেন স্কুল। যত্রতত্র অনুমোদনহীনভাবে গড়ে ওঠা এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুল (কেজি) বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত  নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এসব স্কুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সমন্বয়ে ৫শ’ ৫৯টি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। জেলায় জেলায়  গড়ে ওঠা অবৈধ কেজি স্কুলের তথ্য সংগ্রহে গত এক বছর আগে এসব টিম গঠন হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২২টি প্রতিবেদন জমা পড়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে বারবার মিটিং হয়েছে। চলতি মাসে ফের বৈঠকে বসবেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কেজি স্কুলের বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে বলে রাজশাহী, রংপুর, পাবনা, দিনাজপুর, কুিষ্টয়া, নোয়াখালি জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা  গেছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি প্রাথমিক (বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম) বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন যাচাই-বাছাই ও করণীয় বিষয়ে গত বছরের ১৬ আগস্ট একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এক মাসের মধ্যে মাঠ প্রশাসনকে এ বিষয়ে সুপারিশ পাঠানোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু একজন জেলা প্রশাসক ছাড়া কেউ কোনো তথ্য দেননি। পরবর্তীতে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিতে বলা হয়। নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জানুয়ারি চিঠি দেয়া হয়। চিঠির পর ২২ জেলার ডিসি প্রতিবেদন জমা দেন। স্কুলে কী ধরনের পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হয়, কারা স্কুল পরিচালনা করছেন, অর্থের উৎস কী, আদায়কৃত অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, ব্যয়ের  ক্ষেত্রে সরকারি বিধি-বিধান মানা হয় কিনা-এসব বিষয়ে জানতে চাইলেও প্রতিবেদনে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি জানা গেছে।

সঠিক প্রতিবেদন পেতে ৪শ’ ৮৭ উপজেলায় একটি, ৬৪ জেলায় একটি এবং আট বিভাগে একটি করে মোট ৫শ’ ৫৯টি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। প্রতিটি টাস্কফোর্সের সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে টাস্কফোর্স কমিটি উপজেলার কেজি স্কুল নিয়ে কাজ করবে। জেলা প্রশাসক জেলা শহরের ভেতর বা উপজেলার বাইরে থাকা স্কুল এবং বিভাগীয় কমিশনাররা মহানগর বা মেট্রোপলিটন শহরের স্কুলের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন বলে সরকারি নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।
সীমাহীন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৯৬২ সালের স্কুল নিবন্ধন আইনের আলোকে ২০১১ সালে একটি বিধিমালা করে। কথা ছিল, কেজি স্কুলগুলো ওই বিধিমালার অধীনে নিবন্ধন করবে। কিন্তু মাত্র ৬শ’ ১৬টি স্কুল নিবন্ধন করে। আরো ৭শ’৫১টি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অথচ কেজি স্কুলের বিভিন্ন সমিতির তথ্য মতে, সারাদেশে এ ধরনের অন্তত ৫০ হাজার স্কুল রয়েছে। মাঠ প্রশাসনের অবহেলার কারণে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান শুমারির পাশাপাশি কেজি স্কুলগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ থমকে গেছে।

কোচিং সেন্টার বন্ধের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। মাঝে মধ্যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সভা সমাবেশে এবং সাংবাদিকদের কাছে বলে থাকেন সরকার কোচিং সেন্টার বন্ধের ব্যাপারে খুব শিঘ্রই ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীও এরকম কথা বলেছেন। তিনি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য কোচিং সেন্টারের প্রসঙ্গে বলেন। কোচিং এর নামে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে কোচিং সেন্টার সমূহ। এমন অভিযোগও উঠেছে কোচিং সেন্টারগুলোর সাথে সংশ্লিষ্টরাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এর আগে এমন অভিযোগে বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে মামলাও হয়।

ছোট-বড় সকল শহরে শত শত কোচিং সেন্টার। এসব কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অবাধে। ভর্তি সংক্রান্ত নোটিশ প্রচারে শহর থেকে গ্রামে চলে প্রচার। দিন-রাত চলে মাইকিং। সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। শব্দ দূষণ প্রতিরোধে কোন বিধি-নিষেধের বালাই নেই। এ ব্যাপারে প্রশাসনও নীরব। স্কুল, কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য জেলা-উপজেলায় খোলা হয়েছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার! কিছু কোচিং সেন্টার এর পক্ষ থেকে বছরের শুরুতে সুন্দর ক্যালেন্ডার, ডায়েরি, কলম, প্যাড ইত্যাদি তৈরি করা হয়। জেলা ও উপজেলার উপর মহলের কর্মকর্তাদের এসব উপঢৌকন হিসাবে দেয়া হয়। নির্বিঘেœ কোচিং বাণিজ্য পরিচালনার জন্য কিছু কোচিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ ক্ষমতাসীন দলের নেতা এবং জেলা উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে রাখে। তাদের উপদেষ্টা কিংবা পরিচালক পদে রাখা হয়।

এদিকে সারা দেশে যত্রতত্র গড়ে উঠছে কিন্ডারগার্টেন। জেলা উপজেলা সদর ছাড়াও বর্ধিষ্ণু গ্রাম সমূহে নতুন নতুন কিন্ডারগার্টেন স্থাপিত হচ্ছে। সরকার প্রায় প্রতিটি গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করলেও কোচিং সেন্টার ও কিন্ডারগার্টেন স্থাপন অব্যাহত আছে। উপজেলা পর্যায়ে এমন স্কুলও রয়েছে সেগুলোতে শিক্ষার্থী নেই অথচ পার্শ¦বর্তী কিন্ডারগার্টেনে অনেক শিক্ষার্থী। এর কারণ অনুসন্ধান করতে যেয়ে পেয়েছি নতুন নতুন তথ্য। সরকারি স্কুলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। নেই আধুনিক  সুযোগ সুবিধা। যেমন গরমের দিনে ফ্যান নেই। পানীয় জল নেই। নেই ল্যাট্রিন ও শিশুদের চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা। গ্রাম পর্যায়ে  এমন কিন্ডারগার্টেনও আছে যেখানে  শিশুদের  জন্য খেলার ব্যবস্থা  রয়েছে। শিশুকাল থেকে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা  শিক্ষা দেয়া  হয়ে থাকে স্কুলে। কিন্তু অনেক সরকারি স্কুলেই শৃঙ্খলা শিক্ষা দেয়া হয় না। এসব কারণেই অভিভাবকগণ বাধ্য হয়েই তাদের সন্তানদের কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করছে।

আশির দশকে জামায়াতে ইসলামী প্রতিটি উপজেলা সদরে কমপক্ষে একটি করে কিন্ডারগার্টেন স্থাপন করে। এরপর তারা প্রতিটি জেলা শহরে স্কুলের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। এসব স্কুল কলেজ ও কিন্ডারগার্টেন স্থাপন করা হয় বিদেশী সাহয্যে গঠিত বিভিন্ন  ট্রাস্ট’এর অর্থে। এসব ট্রাস্টের পরিচালক পদে অবশ্যই জামায়াত নেতারা ছিল। এমনই পাবনার ইমাম গাজ্জালী ট্রাস্ট, ইমাম হোসেন ট্রাস্ট। এসব ট্রাস্টের অর্থের যোগান দেয় মধ্যপ্রাচ্যের কিছু প্রতিষ্ঠান। লিবিয়া, কুয়েত, কাতার ভিত্তিক এসব দাতা সংস্থা যে অর্থ প্রদান করেছে তা  ব্যবহার  হয়েছে  স্বাধীনতা  বিরোধী জামায়াত-শিবিরের উদ্দেশ্যমূলক সাংগঠনিক কাজে। এই সাংগঠনিক কাজেরই অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা করা।

জামায়াত পরিচালিত বা ট্রাস্ট পরিচালিত এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষকই জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় সদস্য। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বই-পুস্তক ছাড়াও অন্য বই পড়ানো হয়। এখনও এই সব ট্রাস্ট পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে চলে জামায়াত-শিবিরের নেতাদের দ্বারা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকেরই ধারণা ছিল এসব  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদে পরিবর্তন হবে। না তা হয়নি!

সরকারের আদেশ-নির্দেশ মানেন না সরকারি কর্মকর্তারা? এ প্রশ্ন করা যায় এই টাস্ক ফোর্সের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে। কারণ, সরকার উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অবহিত হতে চায় দেশে কতটি কোচিং সেন্টার এবং কতটি কিন্ডারগার্টেন? কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় গত হওয়ার পরও জানা গেল না এসবের সংখ্যা কত।শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য! প্রশ্নপত্র ফাঁস! বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজকতা। নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, ভিসি নেই। এর পরেও সেগুলো চলছে! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (সরকারি) শিক্ষক-কর্মচারি নিয়োগে দুর্নীতি! শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও ভূক্তকরণে এবং সরকারিকরণে অরাজকতা-দুর্নীতি! শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলছেন, সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ গ্রহণ করতে! এ কারণেই কি টাস্কফোর্সের  রিপোর্ট  মিলছে না এক বছরেও! এক্ষেত্রেও টাস্কফোর্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করছেন না? না-কি তারা সহনীয় পর্যায়ে ...... রিপোর্ট প্রদানে গড়িমসি করছেন?

আমরা কি হতাশায় নিমজ্জিত হবো? না-কি আশায় বুক বাঁধবো? আমরা ক্রমান্বয়ে কি উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছি? না-কি গোল্লায় যাওয়ার সকল পথ উন্মুক্ত হচ্ছে?
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজাতে হবে। অন্যথায় আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে। আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করে। শিক্ষকদের মর্যাদা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের, পাশাপাশি শিক্ষকদেরও নিজ নিজ কর্তব্য কাজে নিষ্ঠাবান হতে হবে। এর জন্য দরকার সমন্বয়, মনিটরিং।

এই লেখাটি যখন শেষ করতে যাচ্ছি তখনই সহযোগী একটি পত্রিকায় পড়লাম, আঞ্চলিক ও জেলা শিক্ষা অফিসে অনিয়মের খবর। এই অফিসের উপ পরিচালক থেকে শুরু করে শিক্ষা অফিসার, অফিস সহকারি, স্টেনোটাইপিস্ট এমনকি  নৈশ প্রহরীও শিক্ষকদের এমপিওভূক্তিসহ নানা কাজে হয়রানি করছে শিক্ষক-কর্মচারীদের। এসব দপ্তরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়মরে সঙ্গে জড়িত। ওই খবরে আরও জানা গেল একটি দায়িত্বশীল তদন্তকারী সংস্থা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে লিখিতভাবে অভিযোগও করেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজনকে বদলী করা হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি যে তিমিরে সেখানেই আছে। উন্নতির লক্ষণ নেই বললেই চলে।

বদলি চাকরির একটি অংশ। অভিযুক্ত কর্মচারি-কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা এবং অভিযোগ গুরুতর হলে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা আইনে থাকেলেও সে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যারা এমন ব্যবস্থা (বরখাস্ত, চাকরিচ্যুতির) নেবেন তারাও কেন যথাযথ শাস্তি দিচ্ছেন না? শ্রম, অর্থ ও সময় বাঁচানোর পাশাপাশি দুর্নীতি কমানোর লক্ষ্যে বিকেন্দ্রীকরণ করে অনলাইনে বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারিদের এমপিওভূক্তির কার্যক্রম শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু ভালো এই উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে। এই অরাজক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার কঠিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। অন্যথায় মানুষ গড়ার কারখানা শিক্ষা ক্ষেত্র নিয়ে আমাদের নিমজ্জিত হতে হবে গভীর অন্ধকারে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৭১০৮৬৪৭৩৩