কৃষিজমি রক্ষা করা হোক

কৃষিজমি রক্ষা করা হোক

 মো. ওসমান গনি: বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশে। এদেশের মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগ লোকের প্রধান পেশাই হলো কৃষিকাজ। কৃষি হলো আমাদের দেশের প্রাণ। এদেশের কৃষকরা কৃষিজমিতে কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর ফলে দেশ আজকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে চলছে। আমাদের কৃষি ও কৃষিজমি সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো বর্তমানে আমাদের দেশের সব অঞ্চলে এখন যেভাবে কৃষি জমির মাটি কাটা শুরু হয়েছে তা যদি আমরা এখন প্রতিরোধ করতে না পারি তাহলে একদিন আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হতে পারে। দেশে চরম আকারে দেখা দিবে খাদ্যের অভাব। বিশেষ করে কৃষি জমির উপরি ভাগের পলিমাটি সরিয়ে নেয়ার কারণে এখন জমিতে আগের মতো ফসল ফলানো যাচ্ছে না। দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অতিমাত্রায় ইটের ভাটা গড়ে ওঠার কারণে কৃষি জমির মাটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায় গণহারে কৃষি জমির মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে ইটের ভাটায়। দেশের এক শে্িরণর লোভী মানুষ ইট ভাটার মালিকদের কাছে সামান্য কিছু নগদ টাকা পেয়ে তাদের সোনা ফলানো জমির মাটি বিক্রি করছে। যে জমি হতে ইট ভাটার জন্য মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে সে জমিতে কোনভাবেই ফসল ফলানো যাচ্ছে না। অপরদিকে দেশের আরেক শ্রেণির লোক মৎস্য প্রকল্পের জন্য কৃষি জমি নষ্ট করে মৎস্য প্রজেক্ট তৈরি করছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণহারে মাছের প্রজেক্ট তৈরি করছে এক শ্রেণির মানুষ।

 তারা নিজের কৃষি জমিতো কেটে মাছের প্রজেক্ট তৈরি করছে সাথে সাথে অন্যান্য লোকজনদেরকে ভুল বুঝিয়ে তাদের কৃষি জমিও ২-৫ বছরের জন্য চুক্তি করে। জমির মালিকের সাথে বলা থাকে জমির মাটি ৩-৪ ফুট বা তার ও বেশি করে গর্ত করে দিতে হবে। এখানে জমির মালিককে দেয়া হয় নামমাত্র টাকা। আবার অনেক সময় মাছের প্রজেক্টের মালিকরা জমির মাটিসহ ৩-৫বছরের জন্য লিজ নিয়ে নেয়। পরে তারা তাদের ইচ্ছামতো মাটি কেটে গর্ত করে। এ খাতেও লাখ লাখ একর ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় দেখা গেছে সামান্য টাকার লোভে মাটি বিক্রি করে পরে এখানে বসত বাড়ি নির্মাণ করার জন্য যে পরিমাণ টাকায় মাটি বিক্রি করছিল তার দশগুণ বেশি টাকা লাগে সেটা ভরাট করে বসত বাড়ি নির্মাণ করতে। বর্তমানে দেশে যে হারে ফসলি জমি নষ্ট করে ইটভাটা ও মাছের প্রজেক্ট তৈরি করা হচ্ছে তা যদি প্রতিরোধ করা না যায় তাহলে এটা নিশ্চিত যে আমাদের দেশে আবার একদিন খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিবে। তখন হয়ত আমরা আর আমাদের পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে পারব না।

 তাই বর্তমানে দেশের খাদ্যের স্বয়ংসম্পুর্ণতা ধরে রাখার জন্য এখনই আমাদের দেশের কৃষিজমি রক্ষার জন্য সরকারি ভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের কৃষিজমি রক্ষা করার জন্য সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইন প্রণয়ন করা বর্তমান  সময়ের প্রেক্ষাপটে জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষিজমিতে গড়ে উঠছে বিভিন্ন স্থাপনা। কৃষি জমিতে স্থাপন করা হচ্ছে নানা ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে ইটের ভাটায়, ইট তৈরিতে ব্যবহার করার জন্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমির অনেক মালিক-বাসিন্দা ভিন্ন দেশে অভিবাসী হয়ে এদেশে তার বাস গুটিয়ে নিচ্ছে। তারা ভিটেমাটি বিক্রি করে দিচ্ছে এমন সব লোকের কাছে তারা ধানি জমির কোনো মর্ম বুঝে না। আর, সেগুলো অনায়াসে অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়ে আমাদের কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থার বর্তমান স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে চলেছে। তাই, এখনই দরকার ধানি জমি ও অন্যান্য কৃষিজ পণ্য উৎপাদনকারী জমিগুলোকে রক্ষার জন্য আইন করে তার বাস্তবায়ন ঘটানো। নতুবা এদেশ যে খাদ্যের উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে তা বিনষ্ট হয়ে যাবে।

ফলনশীল কৃষিজমি বিনষ্ট করে তাতে বাড়ি কিংবা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। বলা হয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আবাসন চাহিদার কারণে কৃষি জমি লোপাট হচ্ছে। আমরা মনে করি আবাসন চাহিদা মেটাতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে কৃষিজমির উপর চাপ কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাই, বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পরিকল্পিত গ্রাম-নগরায়ণ ও গৃহায়ণ-প্রযুক্তির সাহায্যে কৃষিজমিকে রক্ষা করা যায়। তাতে, কৃষিজমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনই আমাদের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তাও সংরক্ষিত থাকবে। দেশের কৃষিজমি রক্ষার জন্য আমাদের নিজেদেরকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশের কৃষিজমি বাঁচলে বাঁচবে দেশ ও জাতি। আমাদের এই ছোট আয়তনের দেশে লোকসংখ্যা অধিক। এসব লোকদের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হলে আমাদের প্রচুর পরিমাণ ফলন ফলাতে হবে। যদি আমরা আমাদের উৎপাদিত খাদ্য দ্বারা নিজের চাহিদা মেটাতে না পারি তাহলে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে বিশাল জনগোষ্ঠির খাদ্যের চাহিদা মেটানো কষ্টকর হয়ে পড়বে। অপর দিকে বিদেশ থেকে যে সমস্ত খাদ্য আমদানি করা হবে সে খাদ্যের বেশির ভাগেরই থাকে মাননিয়ন্ত্রিত।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯