কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ

কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ

আব্দুল হাই রঞ্জু  : দেশে এখন ব্যাপকভাবে আলুর চাষাবাদ হচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের দো-আঁশ মাটিতে আলুর ফলন ভাল হওয়ায় আলু চাষের জমির পরিধিও বাড়ছে। ফলে দেশের চাহিদার ৬০/৬৫ লাখ মেট্রিক টনের বাইরে আরো ৩০-৩৫ লক্ষ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত আলুর ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আর বাড়তি ফলন হলেই আমাদের কৃষকের যে কপাল পোড়ে, যা কম-বেশি সবারই জানা আছে। আবার এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর বাম্পার ফলন হওয়ায় প্রায় ৯৫ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপন্ন হয়েছে। ফলে আলু চাষীদের মধ্যে মূল্য পতনের শংকা কাজ করছে। আশার আলো দেখিয়েছেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি। তিনি অতি সম্প্রতি বলেছেন, দেশের চাহিদার উদ্বৃত্ত আলু বিদেশে রফতানি করা হবে। বাস্তবেই যে পরিমাণ আলু এখন দেশে উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত আলু রফতানি করতে পারলে আলু চাষী ও হিমাগার মালিক সবার জন্যই এটা সুসংবাদ। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কি পরিমাণ এবং কোন দেশে আলু রফতানি হবে, তা এখনও অনেকটাই অনিশ্চিত। তবে, আগেও বিশ্বের নানা দেশে আমাদের আলু রফতানি হয়েছে। যদিও সে পরিমাণ আশাব্যঞ্জক ছিল না। কিন্তু এ বছর আমরা অনেকটাই আশাবাদি, যেহেতু বাণিজ্য মন্ত্রী নিজেই একজন হিমাগার মালিক, সেহেতু আলু উৎপাদন, আলু সংরক্ষণ, আলু বিপণন এবং আলু চাষী ও আলু ব্যবসায়ীদের দুঃখ কষ্টের অভিজ্ঞতা আমাদের চেয়েও ওঁনার বেশি আছে। আর এ কারণে বর্তমান বাণিজ্য মন্ত্রী আলু রফতানির বিষয়ে যে একটু বেশিই আন্তরিক হবেন, সেটা স্বাভাবিক।
তবে, কি পরিমাণ আলু রফতানি হবে, তা বাস্তবে দেখার জন্য আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। একসময় আলুর বড় ক্রেতা দেশ ছিল রাশিয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আলুর মধ্যে ভাইরাস পাওয়ায় রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে আলু আমাদনি বন্ধ করে দেয়। যেহেতু আমাদের দেশের কৃষি চাষাবাদে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা অনেকটাই দুঃসাধ্য, সেহেতু আলুতে ভাইরাসের দেখা মেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে রাশিয়াকে পুনরায় আলু আমদানিতে রাজি করিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে মান সম্মত আলু রফতানি করতে পারলে হয়ত রাশিয়ার বাজার খুলে যেতে পারে।
শুধু রাশিয়াই নয়, এর বাইরে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, জাপান, শীলংকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে আগে থেকেই কম-বেশি আলু রফতানি হচ্ছে। আলুর বিদেশি বাজারগুলো খুলতে পারলে এবং চাহিদার অতিরিক্ত ৩০-৩৫ লক্ষ মেট্রিক টন আলু রফতানি করা সম্ভব হলে, আলু চাষে দেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হতো। সম্ভাবনার এই চাষাবাদকে নির্বিঘœ করতে হলে নিরাপদ উৎপাদন কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা কৃষি বিভাগকে নিশ্চিত করতেই হবে। কারণ গোটা বিশ্বই এখন নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে অনেক বেশি সচেতন। সংগত কারণেই আলুর চাষাবাদে পরিমিত পর্যায়ে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে এনে পরিবেশ ও চাষাবাদবান্ধব জৈবসার ব্যবহারের দিকে নজর বাড়াতে হবে। তাহলে আলুতে যে ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হবে।
কৃষি অর্থনীতির বাংলাদেশে কৃষির সমৃদ্ধি ব্যতিত দেশের গোটা অর্থনীতিকে প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে না। বৃহৎজনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে মানুষ বাড়ছে হু হু করে। এসব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে কৃষি খাতে ভর্তুকী এবং বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এমনকি কৃষি উপকরণ, কৃষি গবেষণা, খাদ্য সংরক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ আরো বাড়াতে হবে। তাহলে কৃষির ওপর ভর করে কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভবপর হবে।
আগেই বলেছি, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মুন্সীগঞ্জ, উত্তারাঞ্চলের রাজশাহী সহ রংপুর বিভাগে ব্যাপক আলুর ফলন হয়েছে। ইতিমধ্যেই আলু সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগারগুলোতে কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। এখন আলু চাষীরা হিমাগারের পাশাপাশি বাড়ীতেও বিশেষ পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণ করছে। বাড়ীতে আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলে হয়ত আলু চাষীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। এখনতো প্রকৃত অর্থে আলুচাষীদের বড় অংশ বাণিজ্যিকভাবে আলুর চাষ করে। যারা আলু চাষ করে সে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করে। আবার দাম বাড়লে হিমাগার থেকে আলু বের করে বাজারে বিক্রি করে। মূলত বাণিজ্যিকভাবে আলুর চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতটি দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আলু রফতানির যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটিকে বাস্তবে রুপ দিতে পারলে আলু চাষী এবং আলু ব্যবসায়ীরা লাভবান হতে পারবেন। তাহলে আগামী মৌসুমে আলুর চাষাবাদ আরো বৃদ্ধি পাবে। আর যদি আলু রফতানির স্বপ্ন বাস্তবে রূপ না নেয়, তাহলে আলু চাষে সে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, অনেকাংশেই তাতে ভাটা পড়বে। বিশেষ করে যে সব জমিতে আলু চাষ করা হয়, সেসব জমিতে প্রচুর পরিমাণ জৈবসার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়। আলু তোলার পর এসব জমিতে অন্য ফসলের চাষাবাদ করায় তেমন একটা সার প্রয়োগ করতে হয় না। ফলে উৎপাদন খরচ কমে আসে এবং চাষীরা লাভবান হন। মূলত এসব কারণে এখন আলুর চাষাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা আশা করছি, যেভাবে আলুর চাষাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেভাবে উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে চরাঞ্চলের দোঁআশ মাটি আশির্বাদ হতে পারে।
আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রীর জন্মস্থান আলু উৎপাদন খ্যাত উত্তারাঞ্চলে। এই উত্তারাঞ্চলে ভারি কিম্বা মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান সেভাবে স্থাপিত হয়নি। এ অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক হলো কৃষি। এ অঞ্চলের চাষীরা কৃষিতে ব্যাপক সফলতা এনেছে। ফলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ এখন পূরণ করে উত্তরাঞ্চলের চাষীরা। শুধু বাণিজ্যমন্ত্রীই নয়, খাদ্য মন্ত্রীর জন্মস্থানও উত্তারাঞ্চলে। এবার উত্তরাঞ্চল থেকে বেশ ক’জনকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। খাদ্য এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যদি উত্তরাঞ্চলের কৃষি চাষাবাদকে নির্বিঘœ করতে আলু রফতানি এবং ধান চালের ন্যায় অভ্যন্তরীণভাবে ভুট্টা সংগ্রহের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা হাসকিং মিলগুলোকে পুনর্জীবিত করেন, তাহলে ধান বেচাকেনায় আগের দিনের মত প্রতিযোগিতা ফিরে আসবে। ফলে ধান চাষীদের ধানের ন্যায্যমূল্যও অনেকাংশেই নিশ্চিত হবে।
উপসংহারে শুধু এটুকুই বলতে চাই, আলু রফতানি এবং উত্তরাঞ্চলে গড়ে ওঠা হাসকিং মিল শিল্পকে রক্ষায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয় যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে খাদ্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের কৃষক মেরুদন্ড সোজা করে ‘দাঁড়াতে পাড়বে। আর কৃষক মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারলে দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ডও আরো মজবুত হবে, যা নিশ্চিত করেই বলা সম্ভব।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮