কৃষকের কান্না আর কতদিন?

কৃষকের কান্না আর কতদিন?

ওসমান গনি : মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য যে বাঁধ নির্মাণ করে সেই বাঁধই দেশের উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের জন্য কান্না ও দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে উঠেছে। একটু বৃষ্টিতেই ভাঙছে বাঁধ, প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। সেইসঙ্গে ক্ষেতের ফসল ও মাছের ঘের ভেসে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছেন এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষ। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাবে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় জেলাগুলোর ৩২ কিলোমিটার নদী সংরক্ষণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।এর রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও ফসল রক্ষাবাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের ৬টি হাওরে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে করে ওইসব হাওরের বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, ফণির প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঁধ উপচে পানি ঢুকেছে হাওরে। পাউবো মনে করছে, এতে কৃষকের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা কম। এর পেছনে সংস্থাটির যুক্তি, হাওরে বেশির ভাগ ধানই কেটে নিয়েছে কৃষকরা। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি আর অনিয়মই দেশে একের পর এক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ। পাউবো, ঠিকাদার ও স্থানীয় রাজনীতিকদের মিলিয়ে যে সিন্ডিকেট তারাই মূলত বছরের পর বছর ধরে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। সরকারি ও জাতীয় পর্যায়ে কোনো নজরদারি সংস্থা না থাকায় কেউই জবাবদিহির আওতায় নেই। ২০১৭ সালে হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হয়। সে সময় পাহাড়ি ঢলে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৪০টি হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যায়। প্রায় সাড়ে ৩ লাখ একর জমির ধান ডুবে যাওয়ায় দুই লাখ কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হন। সর্বস্বান্তও হন অনেকে। ওই ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে দুদক দেখতে পায় ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফসলরক্ষা বাঁধে সব টাকাই আত্মসাৎ হয়েছে। পাউবোর কর্মকর্তা ও স্থানীয় ঠিকাদাররা মিলেমিশে এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের ২৫ কোটি টাকার দুর্নীতির ফলে কয়েক হাজার কোটি টাকার ধান বিনষ্ট হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও টনক নড়েনি কারও। গত দুই বছরেও হাওরে নিম্নমানের বাঁধ নির্মাণ কিংবা ভালো বাঁধকে খারাপ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করাসহ নানা অনিয়মের খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৫৬৭টি প্রকল্প হাতে নেয় জেলা কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। নতুন নীতিমালায় শুধু কৃষক ও বাঁধ এলাকার জমির মালিকদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে (পিআইসি) রাখার কথা। গত বছর অক্টোবর-নভেম্বরে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে গণশুনানির মাধ্যমে পিআইসি করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এই নীতিমালা মানা হয়নি। ফলে পিআইসি গঠন থেকেই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি শুরু হয়েছে। আরো অভিযোগ, অপ্রয়োজনীয় বাঁধগুলো পুরনো আকৃতিতে থাকলেও এখন প্রলেপ দিয়ে নতুন দেখানো হচ্ছে।এ ছাড়া বেশির ভাগ বাঁধেই উচ্চতা, প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য অনুযায়ী মাটি ফেলা হয়নি। লাগানো হয়নি ঘাস। কমপ্যাকশন (মাটি পিটিয়ে শক্তকরা) করা হয়নি। হাওর রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অ্যাক্টিভিস্টদের অভিযোগ, এসব অনিয়ম বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই কানে নেয় না কেউ। বরং দায় এড়ানো ও অস্বীকারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সবখানে। শুধু হাওর নয়। উপকূলীয় ১৯ জেলা ও সারা দেশের নদী রক্ষা বাঁধের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের একই চিত্র। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার ধ্বংসযজ্ঞের পর ঝুঁকিপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার কয়েক কোটি মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যমান বাঁধগুলো উঁচু করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। এ জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী বাঁধগুলো কমপক্ষে ৫ মিটার উঁচু করার কথা থাকলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাঁধ উঁচু করা হয়নি। এ সব বাঁধ সর্বোচ্চ ৩ মিটার উঁচু করা হয়। কোথাও কোথাও উচ্চতা আরও কম।এরপর এ বাঁধগুলো বছরের পর বছর সংস্কার না করায় এতটাই ভগ্নদশায় এসে ঠেকেছে যে, স্বাভাবিক জোয়ারেই পানি উপচে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘূর্ণিঝড় ফণি বাংলাদেশে তেমন বড় শক্তি নিয়ে আঘাত না করলেও এর প্রভাবে সৃষ্ট স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি জোয়ারেই ৩২ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম।
ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষের রক্ষার জন্য ২০১০ সালে উপকূল অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যমান বাঁধ উঁচু করার জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী চড়া সুদে ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ দেয় তারা। শর্ত অনুযায়ী বাঁধগুলো কমপক্ষে ৫ মিটার উঁচু করার কথা ছিল। কিন্তু কোনো বাঁধই ৩ মিটারের বেশি উঁচু করা হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, ছাড় হয়েছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ হয়নি। পাউবো, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা মিলে এসব অনিয়ম ওদুর্নীতি করে আসছে। আর এসব দুর্নীতিবাজের কারণে জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই।
এসব বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে কমিউনিটির অংশগ্রহণ জরুরি। সেইসঙ্গে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জাতীয় পর্যায়ে তদারকি সংস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত মনিটরিংয়ের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
ganipress@yahoo.com
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯