কৃষক বাঁচুক দেশের উন্নয়ন হোক

কৃষক বাঁচুক দেশের উন্নয়ন হোক

এম. এ. বাসেত : মহাজোট সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা.ক্যাপ্টেন মুজিবুর রহমান ফকির বলেছিলেন ‘‘দেশে শায়েস্তা খাঁর আমল চলে এসেছে”। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার (জাহাংগীরনগর, বর্তমান ঢাকা) এর সুবেদার হিসাবে শায়েস্তা খানকে ১৬৬৪ সালের ৮ মার্চ নিযুক্ত করেন। সুবেদার হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি শক্ত হস্তে মগ-ফিরিঙ্গি জল দস্যুদের দমন করে জনজীবনে নিরাপত্তা ফিরায়ে আনেন। তিনি কঠোর হস্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। শাসক হিসাবে তিনি উদার ও ন্যায় পরায়ণ ছিলেন। ঐতিহাসিক ও পর্যটকদের মতে, তিনি ছিলেন প্রজাহিতৈষী। তিনি গরীব দুঃখীদের মধ্যে প্রাত্যহিক খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করতেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁর শাসনামল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার সময়ে দেশে কৃষি অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে। তখন এক টাকায় ৮ মণ চাউল পাওয়া যেত। এছাড়া চা-চিনি, লবণ, তেল সহ অন্যান্য পণ্য দ্রব্যের দাম খুব কম ছিল। বৃদ্ধ বয়সে সুবেদার হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর তাঁর দক্ষতা ও কল্যাণকামিতা সুদীর্ঘ ২২ বছরের সুবেদার আমল বাংলার ইতিহাসে এক গৌরব উজ্জ্বল অধ্যায়।  

বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘‘এবছর ধানের উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। ফলে ধানের মূল্য একটু কমেছে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ক্ষেত্রে ময়শ্চারাইজ প্রধান সমস্যা। এ সমস্যা দূর করার জন্য ৩ হাজার পিচ আর্দ্রতা পরিমাপ করার মিটার কেনার অর্ডার দেয়া হয়েছে। এ সমস্ত মিটার ইউনিয়ন পর্যায়ে বিতরণ করা হবে। যাতে করে কৃষকরা তাদের ধানের আর্দ্রতা নিজ গ্রামেই পরিমাপ করতে পারে। গত ২৫ এপ্রিল ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে এবং ৩১ আগস্ট ২০১৯ শেষ হবে। ২৬ টাকা দরে চলমান বোরো মৌসুমে সাড়ে ১২ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া চলমান বোরো মৌসূমে ৩৬ টাকা দরে ১০ লক্ষ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৫ টাকা দরে দেড় লক্ষ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আরও ২ লক্ষ ৫০ হাজার মে.টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।”
বিবিএস ও ডিএই তথ্যানুযায়ী দেশে মোট জমি ১৪৪.২২ লক্ষ হেক্টর। তদ্মধ্যে কৃষি উৎপাদনের জন্য ফসলি জমি ৮০.৩০ লক্ষ হেক্টর। এছাড়া নদী এলাকা ৮.২৩৬ বর্গ কিলোমিটার ও বনাঞ্চলের আয়তন ১৯.৭১০ বর্গ কিলোমিটার। কৃষি খাতে ২ কোটি ২৯ লক্ষ ৩১ হাজার জনশক্তি নিয়োজিত। দেশে খাদ্য শস্যের চাহিদা ২৪৫.২০ লাখ মে.টন (প্রতিদিন জন প্রতি ৪৫৩.৫৩ গ্রাম হিসাবে)। কৃষি খাত হতে জিডিপি’র অবদান মোট ২১.১০%। তদ্মধ্যে ফসলি খাত হতে ১১.৭২% ।

 সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২ কোটি ৫ হাজার কার্ডধারী কৃষক আছে। তাদের মধ্যে ১ কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। কৃষকদের সাহায্য করার জন্য সরকার কৃষকদের কাছে থেকে ধান কেনার যে নীতিমালা করেছে সেটিও কিন্তু কৃষকবান্ধব নয়। কারণ ধান কেনার সময় শর্তের মধ্যে রয়েছে– ধানের আর্দ্রতা হতে হবে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ। এছাড়াও ধানে বিজাতীয় পদার্থ থাকবে দশমিক পাঁচ ভাগ, ভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ সর্বোচ্চ ৮ ভাগ, অপুষ্ট ও বিনষ্ট দানা ২ ভাগ ও চিটা ধান দশমিক ৫ ভাগ। কৃষকরা বাড়িতে ধান শুকিয়ে খাদ্য গুদামে সরবরাহ করতে গেলে বেশির ভাগ সময় তা ফেরৎ দেওয়া হয়। কারণ ধান যথেষ্ট শুকনো নয়। কারণ কৃষকেরা বাড়ির মাটির উঠানে ধান শুকালে তার আর্দ্রতা ১৫ বা ১৬ শতাংশের নিচে সাধারণত নামে না। ধানের আর্দ্রতা ১৫ এর নিচে নামাতে গেলে সে ধান শুকাতে হবে চাতালে অথবা যে কোনো কংক্রিটের চত্বরে। এই সত্য জানা থাকার পরেও, খাদ্য শস্য সংগ্রহ নীতিমালায় এই শর্ত কীভাবে ঠাই পায়? অথচ  প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের সময় আর্দ্রতার পরিমাপ করা হয় না। গুদামজাত করার আগে সরকার নিজ দায়িত্বে ধান শুকিয়ে নেয়। পশ্চিমবঙ্গে ২৫ শতাংশ ধান সরকার সংগ্রহ করে। অথচ আমাদের দেশে সংগ্রহ করা হয় মাত্র ৫ শতাংশ।প্রান্তিক কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যদি ‘কৃষক তালিকা’ রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হয়ও, তবুও আমাদের খাদ্যশস্য সংগ্রহের নির্দেশনায় যেসব শর্ত রয়েছে সেগুলো প্রান্তিক কৃষকরা পূরণ করতে পারেন না। নেতা ধরেও কৃষক সরকারি গুদামে ধান দিতে পারছেন না। শুধু সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতারাই ধান সরবরাহ করতে পারছেন। ধান বেচার স্লিপও থাকছে তাদের হাতে। ওই সব নেতা রাতারাতি হয়ে উঠেছেন কৃষক। তারা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে সরকারি গুদামে বেশি দামে বিক্রি করছেন। তাই সরকারের ধান কেনায় কৃষক নয়, নেতারাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। ধান-চাল সংগ্রহ নীতিমালা পরিবর্তন না হলে সরকারের এ সহায়তা কৃষকের কাছে পৌঁছাবে না।

কৃষকের ঘাম ছরা ফসল ধান, ভুট্টা, গম, পাট সহ উৎপাদিত শাক-সবজি¦র বাজারে দাম নাই।  বাজারে এক মণ ধান বিক্রি করে কৃষকের একটি কামলার দাম হয় না। একমণ ধান বিক্রি করে কৃষক এক কেজি গরু/খাসির মাংস খেতে পারে না। সার, বীজ, কীটনাশকের দাম বাজারে কমতি নাই। ব্যাংকের কৃষিঋণ পরিশোধে ব্যর্থ কৃষকদের জমিও নিলামে উঠে তবু ঋণের সুদ মওকুফ নাই। কৃষিতে উৎপাদন ব্যয়ের সংগে বাজারে পণ্যের দাম ও শ্রম বাজারের কোন সমতা নাই। এ বছর এক বিঘা বোরো জমি চাষ করতে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। ধান উৎপাদন হয়েছে প্রতি বিঘায় ১৫ মণের মতো। হাটে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা ধরে ধান বিক্রি করতে পারছেন কৃষক। প্রতি বিঘায় কৃষকের লোকসান সাড়ে ৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া একজন কৃষি শ্রমিকের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতিদিন ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। কৃষকরা ঋণ করে ধান উৎপাদন করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। সার ও কীটনাশকের মূল্যের তারতম্য অনেক বেশি। দেশের প্রান্তিক চাষীরা সরকারি খাদ্য গুদামে সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি দিতে পারছে না। এক শ্রেণীর দাদন ফঁড়িয়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান, গম কিনে মজুদ করা হচ্ছে। খাদ্য গুদাম থেকে এই মজুদকৃত গম, চাল, ফ্রি সেল, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, ভিজিডি কার্ড উপকারভোগীদের কাছে বিতরণ করা হলেও তারা সেই গম, চাল খেতে পারেন না। সেগুলো হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগলের খাবারে পরিণত করা হয়। কিন্তু খাদ্য গুদামে খাদ্য শস্য মজুদ করার অন্যতম লক্ষ্য উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ সহ নানামুখী সমস্যায় দেশের খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করা।

কৃষকদের এ অবস্থা উত্তরণে বর্তমান কৃষিমন্ত্রী কৃষকদের সহায়তার জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টন চাল রপ্তানি, কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়াসহ নানা পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে রপ্তানির ওপর ৩০ ভাগ হারে ভর্তুকিও দেওয়া হবে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ প্রান্তিক কৃষককে কতোটুকু সাহায্য করবে? বেসরকারি খাতে চাল রপ্তানি করা হলে, চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকেরা তাদের মজুদ খালি করতে পারবে, তারা উপকৃত হবে। তাতে করে অবশ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে ধানের চাহিদা বাড়বে, দামও বাড়বে। কিন্তু যেসব প্রান্তিক কৃষক ইতোমধ্যে তার উৎপাদিত ধান কম দামে বিক্রি করেছেন তারা কীভাবে উপকৃত হবেন? বর্তমান সরকার কৃষি বান্ধব সরকার। কৃষকদের মূল্যায়ন করবে এটাই স্বাভাবিক। আর কৃষকদের উৎপাদন সহযোগিতা করছে সার, বীজ হাতের নাগালে পৌছে দিয়ে। সরকারের সহযোগিতার পরও দেশের প্রান্তিক চাষীর মুখে এমন হতাশা। কারণ দেশের প্রান্তিক কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল সরকারি খাদ্যগুদামে সহজ ভাবে বিক্রি/সরবরাহ করতে পারছে না। উৎপাদিত ফসল বাজারে নিলে সঠিক দাম পায় না। বাজারে এক শ্রেণির মধ্যসত্ত্বভোগী ও বাজারের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী চক্রের অভাবে দাম পায় না। কিছু রাজনৈতিক নেতার কারণে অনেক এলাকার কৃষকরা সরাসরি খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করতে পারে না।

দেশ স্বাধীনের পর  অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বুয়েট স্ট্যাডি রির্পোর্ট/২০০৮ তথ্য মতে; কৃষি থেকে ২২% জিডিপি এবং ৬০% মানুষের জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশের গ্রাম অঞ্চলে জনসংখ্যার ৮৪% কৃষির উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে কৃষি থেকে আমাদের জিডিপি ৩২%। তদ্মধ্যে ফসলাদি থেকে অর্জন ২৩%। এছাড়া শতকরা ৬৩% লোক কৃষি শ্রমের সংগে কোন ভাবে সম্পৃক্ত আছে। এরমধ্যে ৫৭% চাকুরীজীবি যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ একটি  কৃষি নির্ভরশীল উন্নয়নশীল দেশ। ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে ২০০০-২০০১ অর্থ বছর থেকে খাদ্য শস্যে আমরা কিছুটা স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়েছি। জনসংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে (!)। ফলে আবাসন সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। প্রতি বছর বাংলাদেশে মোট কৃষি আবাদ যোগ্য জমির শতকরা ১% হারে হ্রাস পাচ্ছে। এ মুহূর্তে কৃষি জমি ও কৃষককে বাঁচাতে না পারলে কৃষি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে অদূর ভবিষ্যতে দেখা দিবে তীব্র খাদ্য সংকট। কৃষি নির্ভরশীল বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই তথ্য ভবিষ্যতের জন্য স্বস্তির নয়। ভাল ফলন পেয়েও বাজারে দাম না পেয়ে চাষীদের মুখে হাসি নাই। দেশের প্রান্তিক চাষীদের ভাগ্য উন্নয়নে যতসব কথার ফুলঝুরি শোনা গেলেও বাস্তবে কোন প্রতিফলন হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ, বিদ্যূৎ বিভাগ, নিত্য দিনের ভোগ্যপণ্য চা-চিনি, তেল, লবণ, মাছ-মাংস, পোশাক-আশাক ইত্যাদি ক্ষেত্রে গড়মিল আছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা দিন দিন চরম অবনতি দিকে ধাপিত, দিন দুপুরে খুন, গুম, হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ ইত্যাদি সমস্যা বিদ্যমান। এই সরকারের আমলে তথ্যপ্রযুক্তি যেভাবে অগ্রসর তাতে জনগণের চোখ ফাঁকি দেবার সুযোগ নাই। মহাজোট সরকার জনবান্ধব ও কৃষি বান্ধব তা কাজে প্রমাণ করতে হবে।
লেখক ঃ কবি-সাংবাদিক
bcetetulia @gamil.com
০১৭১৮-২৮১৩৬৭