‘কাজ করলি ভাত জোটে, দিবস-টিবস বুঝিনি’

‘কাজ করলি ভাত জোটে, দিবস-টিবস বুঝিনি’

‘কাজ করলি পেটোত ভাত জোটে। না করলি না খায়ি থাকতি হয়। ওসব দিবস-টিবস বুঝিনি ভাই। বাঁচি থাকতি হবি। তাই ফজরের ওয়াক্তির পর ভাটায় নামি। সন্ধ্যা হলি কাজ ছাড়ি ওঠি। যা মুজরি পাই চাল-ডাল, সবজি লিয়ে বাড়ি যাই। দিবস লিয়ে ভাবলি চলবি?’


মাথার ওপর ইট সাজাতে সাজাতে কথাগুলো বলছিলেন, রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক জামাল উদ্দিন। কালের বিবর্তনে দেশ-দেশান্তরে আজ কত কী বদলে গেছে, বদলায়নি কেবল শ্রমিকের জন্ম-জন্মান্তরের শ্রমশোষণ। এভাবেই বছর ঘুরে আবারও এসেছে রক্ত ঘামিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের স্বপ্ন সার্থকতার দিন ‘মহান মে দিবস’। তাই আর পাঁচ-দশটা দিবসের মতো মে দিবসেও এ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই গ্রামের অতি সাধারণ জামাল উদ্দিনদের মনে।

মে দিবস কি আর শ্রম দিবস কাকে বলে তা বোঝেন না তারা। তারা বোঝেন একদিন কাজ না করলেই না খেয়ে থাকতে হবে। তাই কাকডাকা ভোর থেকে রোদ-তাপ মাথায় নিয়ে জীবন-জীবিকার টানে কেউ মাটি কাটছেন, কেউ ইটের খাঁচে মাটি ভরছেন, কেউ কাঁচা ইট পোড়াতে আগুনের সঙ্গে সংগ্রাম করছেন, কেউ আবার মাথায় করে টানছেন ইট। লক্ষ্য একটাই- সারা দিন রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা খাঁটুনির পর চাল-ডাল নিয়ে বাড়ি ফেরা। জীবন যন্ত্রণায় এভাবেই দিন-রাত কাটছে তাদের।

জীবন-জীবিকার তাগিদে বছরের অন্যান্য দিনের মতো আজও তারা কাজে বের হয়েছেন। কোনো সৌখিনতার জন্য নয়, নিদারুণ সংকটের কারণেই বাসি পানতা খেয়েই দিন শুরু হয়েছে তাদের। অর্ধেক পোশাকে ঘড়ি-ঘণ্টা না ধরেই খেটে চলেছেন। তাদের কোনো শ্রমঘণ্টা নেই! তারা জানেন না আট ঘণ্টার মে দিবস কি? মহাজনের ইচ্ছার ওপরই তাদের কর্মঘণ্টা চলে। তাই এখনও পুবের সূর্যোদয় আর পশ্চিমের সূর্যাস্ত দেখে শ্রম দেন জামাল উদ্দিনের মতো শ্রমিকরা। 

ইট টানতে টানতে দু’হাতে কড়া পড়ে গেছে ২৫ বছরের ভাটা শ্রমিক সেলিমের। তিনি বলেন, আগুনে পোড়ানো একেকটি ইটের ওজন আড়াই কেজির মতো। তারা একবারে ছয়টি করে সাজিয়ে লাগালাগি করে দু’পাশে মোট ১২টি ইট মাথায় নেন। দু’হাতে থাকে আর তিন-চারটি ইট। তার বয়সী শ্রমিকরা সারাদিনে প্রায় দুই হাজার ইট টানতে পারেন। প্রতি হাজার ইট টানার জন্য মজুরি পান ১শ’ টাকা। তাই বেশি উপার্জনের জন্য তাদের অনেককেই প্রতিযোগিতা করে ইট টানতে হয়।  

সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা মজুরি নিয়ে বাজার করে বাড়ি চলে যান। খেয়ে-দেয়ে উঠলেই রাজ্যের ঘুম যেন দু’চোখের পাতায় নেমে আসে তাদের। আরেকটি ভোরের অপেক্ষায় প্যাঁচপ্যাঁচে গরমের মধ্যে রাত পার হয় তাদের। তাই মে দিবসের ডাক কানে যায় না তাদের। বছরের এই বিশেষ দিনটিও তাদের সাদামাটাভাবেই কেটে যায়। তেমন বিশেষ কোনো তাৎপর্যই বহন করে না।

নবাব আলী নামের অপর শ্রমিক বলেন, ‘সবারই বেশি টাকা দরকার। কিন্তু সবাইতো আর বেশি কাজ করতে পারেন না। তবে ভাটায় যার শরীরে যত জোড় তার তত কদর। যে যতবেশি ইট টানতে পারবে সে তত বাহবা পাবে। তাই বেশি টাকা ও প্রশংসার আশায় এখানকরা শ্রমিকরা একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করেন। মাঝে তারা এক ঘণ্টা জিরিয়ে নেন। আর দুপুরে এক ঘণ্টা খাবারের জন্য বিরতি থাকে। এরপর যতক্ষণ দিনের আলো থাকে কাজ করে যেতে হয় তাদের’।  

এই দাবদাহের মধ্যেও তাদের কোনো নিস্তার নেই। একদিকে পানি খান। আর একদিকে কাজ করেন। শরীর দিয়ে সেই পানি ঘাম হয়ে বেরিয়ে যায়। রাতে শরীরে জ্বালা ধরে। কিন্তু কিছুই করার নেই! তারা শুনেছেন ১ মে সরকারি একটি ছুটির দিন। কিন্তু এদিনও তারা কোনো ছুটি পান না।

এদিকে, কেবল ইট ভাটাতেই নয় রাজশাহী শহর বা গ্রামের হোটেল-রেস্তোরাঁ, কল-কারখানা বা নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অসংখ্য শ্রমিক আজকের দিনেও অবিরাম কাজ করে চলেছেন। ফলে বৃহদাংশের কাছেই দিবসটি বিশেষ কোনো তাৎপর্য বয়ে আনতে পারেনি আজও। রুটি-রুজির জন্য সাতসকালেই সবাইকে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে ঘর থেকে। যেন শ্রমিকদের কোনো ছুটি নেই ! 

ছুটির দিনে কাজ করলেও মেলেনা কোনো বাড়তি অর্থ। বেশিরভাগ শ্রমিককেই আট ঘণ্টার পরিবর্তে কাজ করতে হয় গড়ে ১৪-১৫ ঘণ্টা। তাদের কেউ আবার মে দিবস কী তাই জানেন না।