কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা বেঁচে থাকবেন লড়াই-সংগ্রামের মাঝে

কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা বেঁচে থাকবেন  লড়াই-সংগ্রামের মাঝে

বীর মুক্তিযোদ্ধা জিন্নাতুল ইসলাম: প্রয়াত আব্দুস সাত্তার তারা একজন সাচ্চা বিপ্লবী, খাঁটি দেশপ্রেমিক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা ছিলেন। বগুড়ায় তারা “সেক্রেটারী” নামে তিনি সর্বমহলে পরিচিত। বেঁটে ধরনের ফর্সা একজন সুন্দর মানুষ ছিলেন। সব সময় সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী এবং জুতা ব্যবহার করতেন। পান, সিগারেট খেতেন না। ৭৫ বছর বয়সে ও অদম্য পরিশ্রমী একজন রাজনীতিবিদ ও শ্রমিক নেতা ছিলেন। বয়স তাকে পরাস্ত করতে পারে নাই বরং তিনি বার্ধক্যকে পরাস্ত করেছেন। মৃত্যুর আধা ঘন্টা আগেও বগুড়া মুদ্রণ শিল্প শ্রমিক ইউনিয়নের আহবায়ক শ্রমিক নেতা আফজলের সঙ্গে মোবাইলে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। কথায় ছিল না কোন অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা, ক্লান্তি ও উত্তেজনা। কে জানত, মানুষটি মোবাইলে কথা বলার মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যে না ফেরার দেশে চলে যাবেন। মৃত্যু কি অবস্থায় কার জীবনে কোন মুহূর্তে আসবে তা বলা সত্যি মুস্কিল। প্রয়াত কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা গত ২৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় মৃত্যুবরণ করেন। প্রয়াত কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার চিতুলিয়া সরকারপাড়া গ্রামে ১১ সেপ্টেম্বর-১৯৪৫ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বাবা-মার প্রথম সন্তান।  

১৯৬০ সালে তিনি ধুনট থেকে বগুড়া শহরে আসেন এবং বগুড়া কটন মিলে একজন সাধারণ শ্রমিক হিসাবে কাজে যোগদান করেন। অল্পদিনের মধ্যে তার পরিচয় ঘটে বগুড়ার শীর্ষ কমিউনিস্ট এবং শ্রমিকনেতা কমরেড মোখলেসুর রহমান, কমরেড সুবোধ লাহিড়ি, কমরেড আব্দুল কাদের চৌধুরী, কমরেড আব্দুল লতিফ, শ্রমিকনেতা গাজীউল হক, শ্রমিকনেতা মোশারফ হোসেন মন্ডল প্রমুখের সঙ্গে। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। তার স্মরণশক্তি ছিল তীক্ষè। সন, তারিখ ধরে তিনি অনর্গল কথা বলতে এবং বক্তৃতা করতে পারতেন। বক্তা হিসাবে সুবক্তা ছিলেন।  আব্দুস সাত্তার তারাকে বাদ দিয়ে বগুড়ার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস লেখার কোন সুযোগ নেই।

শ্রমিকনেতা হিসাবে আব্দুস সাত্তার তারা দল মত নির্বিশেষে সকলের কাছে সুপরিচিত। তিনি উত্তর চেলোপাড়ায় বসবাস করতেন। তার মহল্লায় তাকে সকলেই সম্মান করতো, শ্রদ্ধা করতো। এলাকায় সালিশ বিচারে সকল মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো যে, তারা সেক্রেটারী কি বলেন। কোন বিতর্ক ছাড়াই তার সিদ্ধান্ত সকলেই মেনে নিত। মানুষের আপদ-বিপদে তিনি পাশে দাঁড়াতেন এবং নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন। আতি-পাতি শ্রমিকনেতাদেরও গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স আর কত কি আছে। প্রয়াত আব্দুস সাত্তার তারা বিশাল বড় মাপের নেতা হয়েও অসচ্ছল একজন মানুষ ছিলেন। কোনভাবে তার দিন কেটে যেত। প্রয়াত আব্দুস সাত্তার তারা বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি) বগুড়া জেলা কমিটির সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, বগুড়া উপজেলা কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি, বগুড়া কটন মিল সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক, উত্তর চেলোপাড়া মসজিদ কমিটির সভাপতি, বগুড়া খাদ্য গুদাম কুলি শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি, বগুড়া মূদ্রণ শিল্প শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টাসহ বহু বেসিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা ছিলেন।

 তিনি ছিলেন শ্রম আদালতের জুরি। ১৯৭৩ সালে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে তিনি পূর্বজার্মান সফর করেন। প্রয়াত আব্দুস সাত্তার তারা একজন অসাম্প্রদায়িক মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠী বুর্জোয়াদের অর্থাৎ ধনিক  শ্রেণীর স্বার্থরক্ষা করে, প্রতিনিধিত্ব করে। ধনিক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র নির্মাণ সম্ভব নয় । সম্ভব নয় গরিব মেহনতী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। কমিউনিস্ট এবং বামপন্থিদের উত্থান আজ সময়ের দাবি। গ্রাম শহরের গরিব মানুষদের শ্রেণী চেতনায় সংগঠিত করতে হবে। বামপন্থিদের নেতৃত্বে একটি বড় লড়াই করতে হবে। সমাজবদলের লড়াই। এক বুর্জোয়াদলকে হটিয়ে জামাত-বিএনপিকে নয়। বামপন্থীদেরকে ক্ষমতায় আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত করতে হবে। নির্মাণ করতে হব্ েসমাজতন্ত্র সাম্যবাদ। পুঁজিবাদী সমাজের পরবর্তী সমাজটাই হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সমাজ। ইতিহাসের আগের প্রত্যেকটি সমাজের যেভাবে জন্মের পর মৃত্যুও হয়েছে পুঁজিবাদী সমাজও ঠিক একইভাবে বিকাশের একটি পর্যায়ের পর মৃত্যু ঘটবে। আর পুঁজিবাদী সমাজকে ধ্বংস করেই জন্ম নিবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা জেল খেটেছেন, আত্মগোপনে থেকেছেন। তবুও আদর্শচ্যুত হোন নাই, আপোষ করেন নাই, আত্মসমর্পণ করেন নাই। আমৃত্যু লড়াই করেছেন, গরিব মেহনতী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তির লক্ষ্যে।
কমরেড আবদুস সাত্তার তারার ত্যাগ, কর্মউদ্যোম আমাদের প্রেরণা এবং সাহস যোগাবে। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা আর আমাদের মাঝে নেই । তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তিনি একজন সাচ্চা বিপ্লবী ছিলেন। বিপ্লবীরা বেঁচে থাকে আদর্শে এবং লড়াই সংগ্রামে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চারকন্যা, আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। প্রয়াত নেতার রেখে যাওয়া আদর্শ হৃদয়ে ধারন করে হাতুড়ি কাস্তে খচিত রক্ত রাঙ্গা লাল পতাকা শক্ত হাতে ধরে বীরদর্পে সামনের দিকে আমরা এগিয়ে যাব। এই ঘুনে ধরা সমাজ ভাঙবোই। গড়বো নতুন সমাজ, নতুন সভ্যতা। শ্রেণীহীন-শোষণহীন সমাজব্যবস্থা। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ।
প্রয়াত কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা লাল সালাম। জয়-সমাজতন্ত্র, বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক
লেখক ঃ সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বগুড়া জেলা শাখা। ০১৭৩৬-৮৬৬৮৬৯