কথাসাহিত্যিক শওকত আলীকে শেষ শ্রদ্ধা

কথাসাহিত্যিক শওকত আলীকে শেষ শ্রদ্ধা

স্টাফ রিপোর্টার: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শওকত আলীকে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গুণী এ কথাসাহিত্যিক। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি তিন ছেলসহ বহু আত্মীয়-স্বজন ও ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ শওকত আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।  

শওকত আলীর মৃত্যুর খবরে দেশের শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।  লেখক খালেকুজ্জামান ইলিয়াস, নাট্যকার মঈন উদ্দিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মির্জা হারুন-উর-রশীদ, জাতীয় গণফ্রন্টের নেতা রজত হুদা, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা, শওকত আলীর শ্রুতিলেখক আব্দুস সাত্তারসহ বন্ধু ও স্বজনরা ছুটে আসেন হাসপাতালে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খান ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে শওকত আলীর কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। হাসপাতাল থেকে শওকত আলীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার টিকাটিুলির বাসায়। পরে দুপুরে টিকাটুলি বড় মসজিদে জানাজার পর বিকেল ৩টায় কফিন নেওয়া হয় শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ তার কফিনে শেষশ্রদ্ধা জানান। গত ৬ জানুয়ারি তার বাবাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শওকত আলী ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।

 তিনি সরকারি সঙ্গীত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নেন। এরপর থেকে রাজধানীর হাটখোলায় নিজ বাসভবনে নিভৃত জীবনযাপন করছিলেন এই গুণী কথাসাহিত্যিক। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে দিনাজপুরে চলে আসেন শওকত আলী। তার লেখা প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘নতুন সাহিত্য' নামে একটি পত্রিকায়। এরপর দৈনিক মিল্লাত, মাসিক সমকাল ও ইত্তেফাক পত্রিকায় তার গল্প, কবিতা এবং শিশুতোষ লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ছাত্রাবস্থায় সাংবাদিকতাও করেছেন শওকত আলী। কাজ করেছেন মিল্লাত, মাসিক সমকাল ও সাপ্তাহিক মিঠেকড়ায়। তার লেখা উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম- প্রদোষে প্রাকৃতজন, ওয়ারিশ, অপেক্ষা, গন্তব্যে অতঃপর, পিঙ্গল আকাশ, উত্তরের খেপ, অবশেষে প্রপাত, জননী ও জাতিকা, জোড়-বিজোড় ইত্যাদি। দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত এবং পূর্বরাত্রি পূর্বদিন- ত্রয়ী উপন্যাসের জন্য তিনি ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার পান।

 কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদক। এছাড়া বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, অজিত গুহ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, লেখিকা সংঘ, স্বদেশ চিন্তা সংঘসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। কলেজের ছাত্র জীবনেই তিনি  কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।  এর কিছুদিন পরেই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাকে বন্দি করে জেলে পাঠায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। পরে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও কিছুদিন পরে শিক্ষকতায় যোগ দেন তিনি। বামপন্থিদের ‘নতুন সাহিত্য’ পত্রিকায় তিনি লেখালেখি করেছেন।

 দৈনিক মিল্লাত, মাসিক সমকাল, ইত্তেফাকে তার অনেক গল্প, কবিতা ও শিশুতোষ লেখা প্রকাশিত হয়েছে। শওকত আলী তার ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসনামল, দেশভাগ আর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মর্মন্তুদ ছবি তিনি এঁকেছেন। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে তিনি নিম্নবর্গের মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে এনেছেন, পাশাপাশি ফুটিয়ে তুলেছেন শোষকের করাল গ্রাসের বিপরীতে অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের বিপ্লব-বিদ্রোহের চিত্র। শওকত আলীর বড় ছেলে ডা. আরিফ শওকত থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। মেজো ছেলে আসিফ শওকত কল্লোল সাংবাদিক। আর ছোট ছেলে  কালিফ শওকত একজন ব্যাংকার, সিলেটে থাকেন।