ঔষধি গাছের নিধন নয়

ঔষধি গাছের নিধন নয়

নাজমুল হোসেন : ডযড় (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) দ্বারা প্রণয়ন করা হয়েছে, যেসব গাছের এক বা একাধিক অংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে দরকারি ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাকে ঔষধি গাছ বলে। আর এই সব উপকারী ঔষধি গুণসম্পন্ন গাছকে ছোটখাট হাসপাতালও বলা যায়। ঔষধি গাছ যে কোন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক সেবাদানে এই ঔষধি গাছ যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ঐতিহ্যগত এবং বর্তমানের আধুনিক চিকিৎসায় ঔষধি গাছ দেশে এবং বিদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যান্সার, কিডনি, হৃদরোগ ও লিভারের মত জটিল রোগের ঔষধ তৈরি হচ্ছে ঔষধি গাছ থেকে। তাছাড়া হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে নানা ঔষধি গাছের পাতা, শেকড়, ডাল, চাল ও রস ব্যবহার করে আসছে। তবে ভেষজ উদ্ভিদের ঔষধি গুণাগুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মাথা ব্যথা, জচিুল পড়া, টাক, অনিদ্রা বা বুদ্ধি বৃদ্ধিতেও এদের উপকারিতা অতুলনীয়। আমাদের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি প্রতিটি গাছ আমাদেরকে অক্সিজেন সরবরাহ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ কোন না কোনভাবে আমাদের উপকার করছে। পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজার উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচশো ঔষধি উদ্ভিদ প্রজাতির বা ভেষজ। ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা সারা বিশ্বের মত আমাদের দেশেও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ইউনানি, আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথিক ও হামদর্দের ঔষধের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিউটি পার্লার ও প্রসাধনীতে এখন প্রচুর ভেষজ উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে। ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে প্রচুর ফসফরাস, ফসফেট, লৌহ, কার্বো-হাইড্রেট ছাড়াও জীবাণুনাশক, অম্লরোগের প্রতিষেধক সহ আরও রয়েছে শক্তিশালী হরমোন ক্যান্সার প্রতিরোধক ক্যারোটিন। আগেকার দিনের মানুষ এই জাতীয় লতা-পাতা, গুল্ম ও গাছ-গাছড়া থেকে তৈরি ঔষধের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় বেশীদিন আরাম-আয়েশে বেঁচে দিন যাপন করতে পেরেছে। এই সব প্রাকৃতিক ঔষধের কার্যকর গুণ ও উপকারের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আমরা বর্তমানে এলোপ্যাথিক চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। ফলস্বরূপ বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্মুখীনও হচ্ছি। আর ইদানিং দিনের পর দিন নিরবে সেবাদানকারী ওই সব গাছের তুলনাহীন উপকারের কথা আমরা বেমালুম ভুলে গিয়ে নির্বিকারে তাদের উজাড় করে দিচ্ছি। পাহাড়ে-জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা গাছগুলোও এই অমানবিক অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছে না। অর্জুন, বাবলা, হরিতকী, নিম, আমলকি, বহেড়া ছাড়াও আরও নাম না জানা বহু গাছই এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। আর ছোট ছোট লতা-পাতা ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে তেলাকুচা, বাসক, আকন্দ, কালমেঘ, ভৃঙ্গরাজ, পুদিনা পাতা, ঘৃতকুমারী, লজ্জাবতী, থানকুনি, উলটকম¦ল, সোনাপাতা, বাসক, কালোজিরা, মেথি, শতমূলী, যষ্টিমধু, জিনসেং, লবঙ্গ, সর্পগন্ধা ইত্যাদি গাছগুলোও বিলুপ্ত প্রায়। অথচ চাইলেই স্বল্প সময়ে কম জমিতে অধিকহারে এসবের চাষ করে অধিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। তাই সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এখনই এই সব গাছ নিধন বন্ধ করতে হবে। সরকারিভাবেও আইনের মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পত্র-পত্রিকা মারফত মাঝে মাঝে দেখা যায় অনেকেই এই উপকারী গাছগুলোকেও বাণিজ্যিকভাবেও চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। দিন দিন যেহেতু এই সব গাছের ব্যবহার বহুমুখীকরণ ও বিস্তৃত পর্যায়ে তাই এখনই এই সব উদ্ভিদের প্রতি যতœশীল হতে হবে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র নেপাল, ভারতে এর বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এর চাষাবাদ হচ্ছে। আমাদের দেশ এখনও মোটা অংকের টাকা গচ্ছা দিয়ে বিভিন্ন ঔষধ তৈরির সিংভাগ কাঁচামাল ওই সব দেশ থেকেই আমদানি করছে। কারণ এই চাষাবাদে তাদের দেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। অথচ আমাদের সরকারও চাইলে এই ক্ষেত্রে উৎসাহীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দেয়াসহ সরকারি তত্ত্বাবধানে এর চাষাবাদে পদক্ষেপ নিতে পারে। ফলে আমাদের দেশে এই জাতীয় চিকিৎসার প্রসারের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঔষধ ও কাঁচামাল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব।
লেখক ঃ প্রকৌশলী-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৭২-৩৯১৪৯১